নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক আর নিরাপত্তা ঘেরাটোপ। ভোটকে সামনে রেখে ক্যাম্পাস পরিণত হয়েছে একপ্রকার “সামরিক নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলে। সেখানে চেকপোস্ট, নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারি এবং উন্মুক্ত প্রচারণায় নানা বিধিনিষেধে রয়েছেন শিক্ষার্থী।
ডাকসু নির্বাচনে হওয়ার কথা ছিল বিতর্ক ও গণতান্ত্রিক চর্চা। এটি শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব তৈরির একটি মঞ্চ। কিন্তু এখন এই নির্বাচনকে ঘিরে দেখা যাচ্ছে গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ, চরমপন্থার বিস্তার এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি (ডিসইনফরমেশন) প্রসার।
যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিবেশে ডাকসু
ডাকসু নির্বাচন দেখিয়েছে কীভাবে সেনাবাহিনী শিক্ষার্থীদের রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসের অনেক অংশ যেন তারা “অবরুদ্ধ” হয়ে পড়েছে। , নিরাপত্তা বাহিনী তাদের চলাফেরা পর্যবেক্ষণ করছে এবং জমায়ে সীমিত করা হয়েছে। যদিও কর্তৃপক্ষ বলেছে, এই ব্যবস্থা শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য নেওয়া হয়েছে। সমালোচকরা মনে করেন এগুলো মুক্ত অংশগ্রহণকে দমন করছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ হয়ে উঠেছে একপ্রকার দখলীকৃত অঞ্চলের মতো।
এই কঠোর নিয়ন্ত্রণমূলক পরিবেশ জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোকেও সুযোগ করে দিয়েছে। তারা দুর্বল হয়ে পড়া গণতান্ত্রিক পরিসরে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
শিবিরের সক্রিয়তা ও প্রচারযুদ্ধ
জামায়াতে ইসলামী-সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির বহুদিন ধরেই ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও ভীতিপ্রদর্শনের অভিযোগে আলোচনায় রয়েছে। প্রকাশ্যে শান্তিপূর্ণ সংগঠনের দাবি করলেও, শিবির এখনও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা এবং উগ্রবাদী মতাদর্শ প্রচারের অভিযোগে অভিযুক্ত।
আসন্ন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) নির্বাচন ঘিরেও উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিচ্ছেন যে, প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষ এবং শিবিরের প্রভাব এই নির্বাচনগুলোতে আরও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
শুধু মাঠে নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় শিবির-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্ক। অভিযোগ রয়েছে, ভুয়া ও বট-নিয়ন্ত্রিত আইডি ব্যবহার করে তারা নারী নেত্রীদের নিয়ে কুৎসা রটাচ্ছে এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কন্টেন্ট ছড়াচ্ছে।
একজন ছাত্রনেতা বলেন, রাকসু ও জাকসু নির্বাচন এখন রাজনৈতিক প্রচারণার এআই ল্যাবে পরিণত হয়েছে। ভুয়া আইডি ব্যবহার করে নারীদের হেয় করা হচ্ছে এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়েই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিবেশের প্রতিফলন। শিক্ষার্থী নির্বাচন পুনরায় গণতান্ত্রিক চর্চা ও মুক্ত বিতর্কের ধারা ফিরিয়ে আনার কথা থাকলেও, বাস্তবে তা পরিণত হচ্ছে সামরিকীকরণ, চরমপন্থার বিস্তার এবং ডিজিটাল অপপ্রচারের মঞ্চে।
তাদের আশঙ্কা, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে কেবল উচ্চশিক্ষা নয়, বরং জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে এবং উগ্রপন্থী মতাদর্শ আরও জায়গা করে নেবে।
মন্তব্য করুন