
নিজস্ব প্রতিবেদক
গণতন্ত্রিক রাষ্ট্রে যদি গণভোট হয় তাহলে গণভোটের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ ভূমিকা। রাষ্ট্র আয়োজন করে, ভোটের পরিবেশ নিশ্চিত করে , ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, ভোটারদের স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ তৈরি করে কিন্তু রাষ্ট্র কখনো কোনো ফলাফলের পক্ষে দাঁড়ায় না।
বর্তমান বাংলাদেশে আমরা দেখছি এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতা বাংলাদেশ বিরোধীদের সমর্থনে একটি অবৈধ ও সাংবিধানিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ রাষ্ট্র দখলকারী ইউনুস সরকার, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতাকে নিজের রাজনৈতিক স্বার্থের হাতিয়ার বানাচ্ছে। তারা সরকারি সম্পদ, প্রশাসনিক কাঠামো, মিডিয়া ও পদমর্যাদা ব্যবহার করে গণভোটে হ্যাঁ পক্ষের সক্রিয় প্রচারণায় নামেছে, যা সংবিধান লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ চূড়ান্ত উদাহরণ।
বাংলাদেশের সংবিধান স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার বাধ্যবাধকতা স্থাপন করেছেন।
অনুচ্ছেদ ৭(১): “প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ…”
গণভোটে এই ক্ষমতা জনগণের হাতে থাকে। রাষ্ট্র যদি নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে, তবে জনগণের এই সার্বভৌম ক্ষমতা হরণ করা হয়।
অনুচ্ছেদ ১১: “প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র… জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হইবে।”
“কার্যকর অংশগ্রহণ” মানে সমান সুযোগ, অবাধ মতপ্রকাশ এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা। কিন্তু বর্তমান ইউনুস সরকার এই নীতির ওপরে নির্বাহী হস্তক্ষেপ করছে। প্রশাসনকে ব্যবহার করছে, সরকারি অর্থকে রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার বানাচ্ছে, মিডিয়াকে একপক্ষীয় প্রচারণার প্ল্যাটফর্মে রূপান্তরিত করছে।
অনুচ্ছেদ ২১(১) “প্রজাতন্ত্রের সকল কর্মে নিয়োজিত প্রত্যেক ব্যক্তি সংবিধান ও আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করিবেন।”
তারা আইন ও সংবিধানের আনুগত্যকে উপেক্ষা করে নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে প্রশাসনকে ব্যবহার করছে। এটি কেবল সংবিধান লঙ্ঘন নয়; এটি গণতন্ত্রের শিরদাঁড়া নষ্ট করার চক্রান্ত।
গণভোট পরিচালনার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও রাষ্ট্রীয় পক্ষপাতের বিরোধী:
অনুচ্ছেদ ১১৮(১): “একটি নির্বাচন কমিশন থাকিবে…”
অনুচ্ছেদ ১২৬: “নির্বাহী কর্তৃপক্ষ নির্বাচন কমিশনকে তাহার দায়িত্ব পালনে সহায়তা করিবে।”
“সহায়তা” মানে প্রশাসনিক ভোট আয়োজন ভোটারদের নিরাপত্তা কেন্দ্রের নিরাপত্তা ইত্যাদি কোনো ফলাফলের পক্ষে সক্রিয় প্রচারণা নয়। কিন্তু বর্তমান সরকার নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা উপেক্ষা করে নির্ভীকভাবে হ্যাঁ পক্ষের প্রচারণায় নামছে, যা গণতন্ত্রের কফিনে পেরেক মারার সমতুল্য।
Referendum Ordinance, 1978 নির্বাচন কমিশনকে একমাত্র কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। Representation of the People Order (RPO), 1972 স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের রাজনৈতিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে।
বাংলাদেশ বিরোধীদের নিয়ন্ত্রিত ইউনুস সরকার এই নীতিগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে। সাদা চোখে দেখলে এটাকে কেবল আইন লঙ্ঘন মনে হবে । বাস্তবে এটি একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, যা দেশের সংবিধান ও জনগণের অধিকারকে অবমূল্যায়ন করে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো বিচার বিভাগের ভূমিকা। সংবিধান আদালতকে সংবিধানের রক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে:
অনুচ্ছেদ ১০২: হাইকোর্ট বিভাগ সংবিধান ও আইনের পরিপন্থী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে প্রতিকার দিতে পারিবে।
কিন্তু যখন আইনজীবী রিট দাখিল করে এবং উচ্চ আদালত তা খারিজ করে দেয়, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতাও এই সরকারের হাত ধরে প্রশ্নবিদ্ধ। বিচার বিভাগ যদি সরকারী প্রভাব থেকে মুক্ত না থাকে, তবে গণতন্ত্রের শেষ ভরসাও ধ্বংস হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক উদাহরণে অনেক দেশে সরকার গণভোটে অংশ নিলেও সেখানে স্পষ্ট campaign rules, হ্যাঁ না দুই পক্ষকে সমান অর্থায়ন, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছ কাঠামো থাকে। বাংলাদেশে এ ধরনের কাঠামো অনুপস্থিত। এখানে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ গণভোটকে পক্ষপাতদুষ্ট করেছে, আইনের শাসনকে অবমূল্যায়ন করেছে, এবং জনগণের আস্থা ধ্বংস করেছে।
এখন স্পষ্ট যে বর্তমান রাষ্ট্র ধ্বংসকারী ইউনুস সরকার গণতন্ত্র ও সংবিধানের ওপর সরাসরি আক্রমণ চালাচ্ছে এবং রাষ্ট্রকে অকার্যকর করার পায়তারা করছে ।তারা সরকারি সম্পদ, প্রশাসন ও মিডিয়া ব্যবহার করে গণভোটকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে পরিণত করেছে। বিচার বিভাগের নীরবতা এই ষড়যন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করেছে। এবং এটাকে আর ছেলে খেলা মনে করার কোন সুযোগ নাই।
এটি কেবল একটি নির্বাচন বা গণভোট নয়; এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত এবং রাষ্ট্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করার নীল নকশা।
গণতন্ত্র টিকে থাকে আস্থা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার ওপর। গণভোটের প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই বজায় থাকে, যখন রাষ্ট্র সরে দাঁড়ায়, জনগণ সামনে আসে এবং বিচার বিভাগ তার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে। বর্তমান অবৈধ ও সাংবিধানিক ইউনুস সরকার এই মৌলিক নীতিকে সম্পূর্ণ উল্টে দিয়েছে, যা দেশের জনগণ ও সংবিধানকে এক ধ্বংসাত্মক চ্যালেঞ্জে ফেলে।
জনগণের কণ্ঠস্বর চেপে রাখা, রাষ্ট্রীয় সম্পদকে পক্ষপাতমূলক প্রচারণার জন্য ব্যবহার করা, এবং বিচার ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবের হাতে ধসানো এই সবই গণতন্ত্রের শিরদাঁড়াকে ভেঙে ফেলার সমতুল্য।
আপনাকে আওয়ামী লীগ হতে হবে না। কিন্তু যদি আপনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও অস্তিত্বকে সম্মান করেন, তবে এই প্রহসনের নির্বাচন এবং নাটকীয় গণভোটকে প্রত্যাখ্যান করুন। এতে অংশ নেওয়া মানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা। এটি আর ভোট নয়, এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র।