
করোনাকালে মানুষের জীবন বাঁচাতে আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে দেশের ৪৮ জেলার সরকারি হাসপাতালে স্থাপন করা হয়েছিল অত্যাধুনিক আইসিইউ ইউনিট। কিন্তু জনবল সংকট ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার কারণে বর্তমানে অন্তত ১৪টি সরকারি হাসপাতালের আইসিইউ সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে। এতে প্রতিদিন হাজার হাজার মুমূর্ষু রোগী জরুরি চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টে ভোগা এক রোগীকে সম্প্রতি আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও সেবা না থাকায় সাধারণ ওয়ার্ডেই চিকিৎসা চালাতে হয়েছে। হাসপাতাল সূত্র বলছে, প্রতিদিন অন্তত ৫০ জন রোগীর আইসিইউ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সেখানে কোনো সেবা চালু নেই।
হাসপাতাল পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমান জানান, চার মাস ধরে আইসিইউ বন্ধ রয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
২০২০ সালে ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি)’ প্রকল্পের আওতায় আওয়ামী লীগ সরকার ৪৮ জেলায় ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করে। এই প্রকল্পে ব্যয় হয় প্রায় ৫১২ কোটি টাকা। প্রতিটি ইউনিটে গড়ে ব্যয় হয় ১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার বেশি।
প্রকল্পের আওতায় অস্থায়ী ভিত্তিতে ১ হাজার ৪ জন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে চাকরি হারান তারা। এরপর একে একে বন্ধ হয়ে যেতে থাকে আইসিইউ সেবা।
বর্তমানে বন্ধ থাকা যন্ত্রপাতির মূল্য প্রায় ১৪৯ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় অনেক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
সমালোচকরা বলছেন, ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এই সংকট সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। বরং সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি সমালোচনার মুখে পড়েন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. শেখ ছাইদুল হক জানান, অস্থায়ী জনবলকে রাজস্ব খাতে নেওয়ার প্রস্তাব মন্ত্রণালয় বাতিল করেছে। নতুন প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
যেসব হাসপাতালে আইসিইউ সেবা বন্ধ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল, শেরপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল, বাগেরহাট জেলা সদর হাসপাতাল, মাদারীপুর সদর হাসপাতাল এবং মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল।
জেলা হাসপাতালগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। নারায়ণগঞ্জে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন রোগীকে ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে। বাগেরহাটে মাসে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগীকে খুলনা বা ঢাকায় স্থানান্তর করা হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্র বলছে, পথেই অনেক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে দুই বছর আগে আইসিইউ স্থাপন করা হলেও আজ পর্যন্ত সেটি চালু করা যায়নি। মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটও দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ।
মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অযত্নে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, লোকবল না থাকায় আইসিইউ চালু করা সম্ভব হচ্ছে না।
জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, এসব আইসিইউ সচল থাকলে অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো। কিন্তু অব্যবস্থাপনা ও জনবল সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘদিন ব্যবহার না হলে আইসিইউর সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুত উচ্চ পর্যায়ের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
৫১২ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা জীবনরক্ষাকারী এই অবকাঠামো আজ তালাবদ্ধ। আর আইসিইউ সেবার অভাবে প্রতিদিন ঝুঁকির মুখে পড়ছেন অসংখ্য রোগী।