
বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অসংখ্য গণহত্যার ঘটনা আজও জাতিকে শোকাহত করে। সেই ভয়াল ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞগুলোর মধ্যে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার ডাকরা গণহত্যা অন্যতম। ১৯৭১ সালের ২১ মে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডে রাজাকার বাহিনীর হাতে কয়েক শত নিরস্ত্র মানুষ প্রাণ হারান বলে বিভিন্ন গবেষণা ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
ডাকরা ছিল রামপাল উপজেলার পেড়িখালী ইউনিয়নের একটি জনপদ, যেখানে অবস্থিত ছিল ঐতিহ্যবাহী ডাকরা কালী মন্দির। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগী রাজাকারদের নির্যাতন থেকে বাঁচতে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু হিন্দু পরিবার এই মন্দির এলাকায়আশ্রয় নেয়।
স্থানীয়দের বর্ণনা ও মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গবেষণা অনুযায়ী, ২১ মে হাজারো মানুষ সুন্দরবন হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর আগেই বিষয়টি রাজাকার বাহিনীর কাছে পৌঁছে যায়। পরে রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী ফকিরের নেতৃত্বে সশস্ত্র রাজাকাররা ডাকরা এলাকায় হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, দুপুরের দিকে নৌকাযোগে এলাকায় প্রবেশ করে রাজাকাররা নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে। আতঙ্কিত মানুষ চারদিকে ছুটে পালানোর চেষ্টা করলে তাদের ঘিরে ফেলা হয়। অনেককে ঘটনাস্থলেই গুলি করে হত্যা করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বহু মানুষকে ডাকরা কালী মন্দিরের সামনে এনে নির্মমভাবে জবাই করা হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধ গবেষক বিষ্ণুপদ বাগচীর গবেষণা এবং বিভিন্ন সাক্ষ্য অনুযায়ী, এই হত্যাযজ্ঞে নিহতের সংখ্যা কয়েকশ’ ছাড়িয়ে যায়। স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করে, অন্তত ৪৬৪টি মরদেহ গণনা করা হয়েছিল। তবে অনেক লাশ নদীর স্রোতে ভেসে যাওয়ায় প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
গণহত্যার পর ডাকরা ও আশপাশের বহু হিন্দু বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এছাড়া কয়েকজন নারীকে অপহরণের অভিযোগও বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
বর্তমানে ঐতিহাসিক সেই ডাকরা কালী মন্দির নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ডাকরা গণহত্যা আজও এক বিভীষিকাময় স্মৃতি হয়ে আছে।
ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, এ ধরনের গণহত্যার সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণ এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তা তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি। তাদের ভাষায়, ডাকরা গণহত্যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সংঘটিত অন্যতম নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।