
বাংলাদেশের মানুষ এখনো ভুলতে পারেনি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল। সেই পাঁচ বছর ছিল বিএনপি-জামায়াত জোটের অপশাসনের এক জীবন্ত আতঙ্ক। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট, দুর্নীতির মহোৎসব আর সন্ত্রাসের রাজত্ব তখন ছিল নিত্যদিনের খবর। মানুষ ভেবেছিল, সেই ভয়ংকর দিন বুঝি আর ফিরবে না। কিন্তু বাস্তবতা আজ ভিন্ন কথা বলছে। ২০২৬ সালে এসে আবারো সেই একই চিত্র। একই চরিত্র। একই দল। একই নীলনকশা।
বনের মন্ত্রী নিজেই যখন বনখেকো, তখন বন বাঁচাবে কে? ময়মনসিংহের ভালুকার সংরক্ষিত বনভূমির এই করুণ দশা যেন এক বিশাল রাষ্ট্রীয় ধর্ষণেরই প্রতিচ্ছবি। যে ব্যক্তি সংবিধানের শপথ নিয়ে বন রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন, সেই বনমন্ত্রী আবদুল আওয়াল মিন্টুই হয়েছেন বন ধ্বংসের কারিগর। লাল তীর কোম্পানির গবেষণা কেন্দ্রের নামে ১৩১ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখলের এই ঘটনা শুধু আইন লঙ্ঘন নয়। এটা জাতির সঙ্গে সুস্পষ্ট বিশ্বাসঘাতকতা। খোদ মন্ত্রীর নেতৃত্বে বিএনপির এই দুঃশাসন প্রমাণ করে, তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় সম্পদ মানে নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তি।
স্থানীয় বাসিন্দা আর বন বিভাগের সাবেক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য কাগজপত্রের হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে। তারা স্পষ্ট বলছেন, দখলের পরিমাণ আরো বেশি। একশো একরের বেশি বনভূমি এখন মন্ত্রীর একক নিয়ন্ত্রণে। সেই জমি চারপাশে বাউন্ডারি দিয়ে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে কলাবাগান আর নানা স্থাপনা। পাঁচশো কোটি টাকারও বেশি মূল্যের এই জমি কীভাবে বেসরকারি দখলে গেল, তার কোনো আইনসঙ্গত উত্তর আজো মেলেনি। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শুরু হয় এই লুটপাটের পালা। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনের নীরবতা আর বন বিভাগের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি দুর্নীতিবাজ চক্র মিলে এই দখল ব্যবসাকে বৈধতা দিয়েছে। বাউন্ডারি শহীদ আর জঙ্গল মনিরের মতো দালালরা মাঠ পর্যায়ে এই সিন্ডিকেটের হাতিয়ার হয়ে কাজ করেছে।
বন আইনের ২৬ ও ৬৩ ধারায় উচ্ছেদের স্পষ্ট বিধান থাকার পরও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। কারণ বিচারিক আদালতে মামলার নামে জটিলতা সৃষ্টি করে প্রকৃত বিচারকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। ময়মনসিংহ দেওয়ানি আদালত থেকে শুরু করে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মামলা ঝুলে আছে। এই কৌশল পুরোনো। একই পথে হেঁটেছিল ২০০১-০৬ সালের বিএনপি সরকার। আইনি জটিলতার দোহাই দিয়ে লুটপাটের নিরাপদ আবহ তৈরি করাই ছিল তাদের রাজনৈতিক কৌশল।
বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা কাজী নুরুল করিম বলেছেন, দখল উচ্ছেদে জেলা প্রশাসনের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অথচ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমানের দাবি, এমন কোনো প্রস্তাবই তাদের কাছে পৌঁছায়নি। কে মিথ্যা বলছে, কে সত্য গোপন করছে, সেই প্রশ্নও এখন জাতির কাছে বিব্রতকর এক হাসির গল্প। অন্যদিকে প্রধান বন সংরক্ষক মোঃ আমির হোসাইন চৌধুরী বলছেন, আদালতে মামলা থাকায় সরকার কিছু করতে পারছে না। যেন পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রই অসহায় হয়ে পড়েছে একজন মন্ত্রীর অবৈধ দখলের কাছে!
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের আলমগীর কবির এই ঘটনাকে বলেছেন পরিবেশগত অপরাধ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট আর পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ। টিআইবির ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, মন্ত্রী-এমপিরা নিজেরাই বন দখলের সুযোগ তৈরি না করলে সাধারণ দখলদাররা কখনোই আইনের এত ওপরে উঠতে পারত না। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সরকার চাইলে দখল উচ্ছেদ করে বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যে সরকারের মন্ত্রীই যখন দখলে জড়িত, সেই সরকার কাকে উচ্ছেদ করবে? উচ্ছেদ হবে তো জনগণের বিবেকের, পরিবেশের স্বার্থের, আইনের শাসনের।
মন্ত্রীর দপ্তর থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেওয়া যায়নি। ফোনে কথা বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেওয়া হয়। লিখিত আবেদন জমা দিয়েও সাড়া মেলেনি। এই গা-ঢাকা দেওয়ার সংস্কৃতি বিএনপির রাজনৈতিক চরিত্রেরই অংশ। দায় এড়ানো, প্রশ্নের মুখে চুপ থাকা আর মিডিয়াকে ব্যস্ততার দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া তাদের পুরোনো অভ্যাস।
দেশের মানুষ এখন ভালো করেই জানে, এই তথাকথিত গণতন্ত্র কাদের জন্য। বনভূমি দখল, নদী দখল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে তোলা টাকা দিয়ে নির্বাচন করা আর ক্ষমতায় বসে একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করাই বিএনপির রাজনীতির ভিত্তি। ২০০১-০৬ সালের সেই অন্ধকার সময়ের পুনরাবৃত্তি এবার আরো ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তখনো বন-জমি লুট হয়েছে, এখনো হচ্ছে। তখনো দুর্নীতি ছিল, এখনো আছে। কিন্তু এখন পরিস্থিতি আরো শোচনীয়। কারণ আজকের প্রশাসন আরো বেশি অসহায়, আইন আরো বেশি পঙ্গু এবং দুর্নীতির সিন্ডিকেট আরো বেশি সুসংগঠিত।
এটা শুধু ভালুকার বনের গল্প নয়। এটা পুরো বাংলাদেশের সম্পদ রক্ষার সংগ্রামের গল্প। এটা সেই লড়াই যেখানে সাধারণ নাগরিককে বুঝতে হবে, চুপ থাকা মানে অপরাধকে বৈধতা দেওয়া। বন বাঁচাতে গেলে আগে বনখেকো রাজনীতিকে নির্মূল করতে হবে। আর সেটা কখনোই বিএনপির পক্ষে সম্ভব নয়।
সূত্র: https://sokalersomoy.online/news/153448