
গোয়েন্দা ব্যর্থতা নাকি পরিকল্পিত ক্যু? যেভাবে গোয়েন্দা ব্যর্থতা ও চক্রান্তে পতন হলো আওয়ামী লীগ সরকারের!
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভয়াবহ অক্ষমতা আর একাংশের পরিকল্পিত বিশ্বাসঘাতকতা মিলে এক অবিশ্বাস্য ষড়যন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল, যে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আস্তে আস্তে সেই হৃদয়বিদারক সত্যকেই উন্মোচিত হচ্ছে, যা অনেকেই এতদিন ধরে আঁচ করতে পারছিলেন। পরিতাপের বিষয়, সেই চরম ব্যর্থতার পরিণতিতে আজ দেশ এক অন্ধকার সুড়ঙ্গে প্রবেশ করেছে, যেখানে গণতন্ত্র আর জনগণের ভোটের মূল্য শূন্যের কোঠায় নেমে গেছে।
প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণাদি পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে দিচ্ছে যে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে আগাম সংকেত ছিল। তারা জেনেছিল, ছাত্রদের কোটা আন্দোলনের মুখোশের আড়ালে নিকৃষ্ট এক ক্ষমতা দখলের ছক কষা হচ্ছে। তারা বুঝতে পেরেছিল পরিস্থিতি ক্রমশ একটি পরিকল্পিত ক্যুয়ে রূপ নিচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক এবং অপরাধীসুলভ আচরণ ছিল তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের। প্রধানমন্ত্রীকে নিরাপত্তার নিছক অভয় দিয়ে তিনি যে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিলেন, তা নিছক দায়িত্বে অবহেলা নয়, বরং সচেতন ষড়যন্ত্রের সামিল। ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান যখন বারবার সতর্ক করলেন, যখন বললেন দেশি বিদেশি চক্রান্তকারীরা পরিস্থিতি ঘোলাটে করছে, তখন আইজিপির মতো একজন ব্যক্তি নিজের কর্তৃত্ব খাটিয়ে সেই সতর্কবার্তা চেপে গেলেন। এটা রাষ্ট্রদ্রোহিতা ছাড়া আর কিছু নয়। অথচ সেই আইজিপিই পরবর্তী সময়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী হয়ে নিজের অপরাধ হালকা করে নেন, যা বিচার ব্যবস্থার জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকাও এখানে চরম প্রশ্নবিদ্ধ। একজন পুলিশ কর্মকর্তা যখন গভীর উদ্বেগ নিয়ে ছুটে গেলেন, তখন তাকে উপহাস করার অর্থ হচ্ছে নিজের অহমিকায় পুরো সরকারকে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া। এই দম্ভই কাল হয়েছিল। শেখ হাসিনা নিজের এবং দলের সুরক্ষায় যে আস্থা রেখেছিলেন এই মানুষগুলোর ওপর, তারা সেই আস্থার মর্যাদা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সেইসঙ্গে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের ভূমিকা ছিল আরও রহস্যজনক এবং সন্দেহজনক। একজন সাবেক প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাইফুল আবেদীন অবসরের পর হঠাৎ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ঢাকায় ফিরে আসবেন, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন, সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উৎসাহ দেবেন আর পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে গেলে আবার বিদেশে পাড়ি জমাবেন, এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা হতে পারে না।
জুলাই মাসের সেই দাঙ্গার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে যেভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা হয়েছিল, তা এক সুগভীর চক্রান্তেরই বহিঃপ্রকাশ। সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের সেই দরবারের বক্তব্য যেখানে তিনি বলেছিলেন সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার হতে পারে না, সেটি ছিল একদিকে সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধা, কিন্তু অন্যদিকে নির্বাচিত বেসামরিক সরকারের প্রতি সেই কঠিন সময়ে চূড়ান্ত অসহযোগিতার শামিল। এই পরিস্থিতিতে সুদী মহাজন ইউনূসের নেতৃত্বাধীন চক্রটি ইসলামি জঙ্গি সংগঠন জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন শিবিরকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর চড়াও হয়। বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট হয়ে তারা যে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বাঁধিয়েছিল, সেটিকে 'গণঅভ্যুত্থান' হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে দেশে ও বিদেশে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট আরও বিভীষিকাময়। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বিএনপি ক্ষমতায়, অথচ এই সরকারের জন্ম কোনো ভোটের মাধ্যমে নয়, বরং একটি ক্যু ও ষড়যন্ত্রের পথ বেয়ে। একটি অবৈধ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা দখলের পর সুদী মহাজন ইউনূসের পৃষ্ঠপোষকতায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া এখন থমকে গেছে, বরং তারাই উঠে এসেছে রাজনীতির মূল মঞ্চে। জামায়াত ইসলামী ও বিএনপির এই অসুস্থ জোট দেশের অর্থনীতিকে চরম সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা নেই, আর সুদের কারবারিরা ফুলেফেঁপে উঠছে। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি আর জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বেড়ে গেছে, আর প্রকাশ্যে কথিত 'গণতন্ত্র' ও 'মানবাধিকার' রক্ষাকারী ইউনূস সরকার সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। তারা জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করেছে এবং দেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব আয়োজন চূড়ান্ত করেছে।
এটি একটি জাতীয় বিপর্যয়। ২০২৪ সালের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের শিক্ষা হলো, নিজেদের গাফিলতি আর ব্যক্তির স্বার্থসিদ্ধির লোভে আমরা একটি পুরো জাতির ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে ফেলেছি। অথচ আজ যারা ক্ষমতায়, তারা জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী নয়। প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব এখন ইতিহাসকে জানা এবং নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে সোচ্চার হওয়া। যে সকল গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও রাজনীতিক এই পতন ত্বরান্বিত করেছিলেন, তাদের প্রতি ইতিহাস চরম নিকৃতি দেবে। আর যে বিদেশি চক্র দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলায় মেতে আছে, তাদের প্রতিও ধিক্কার। বাংলাদেশের মাটিতে ফ্যাসিবাদের যে তাণ্ডব চলছে, তার নীরব দর্শক হয়ে থাকার দিন শেষ। এখনই সময় নিজেদের ভুল বোঝার এবং প্রকৃত সত্যকে সামনে আনার।