
জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার সীমান্তবর্তী যমুনার চরাঞ্চলে গরু-মহিষ চরাতেও দিতে হচ্ছে চাঁদা। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত টাকা না দিলে রাখালদের মারধর, অপহরণ, গরু-মহিষ লুট কিংবা চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে। চরাঞ্চলের তৃণভূমির দখল ঘিরে কয়েকটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার করছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিবছর মাদারগঞ্জসহ আশপাশের এলাকা থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার গরু-মহিষ যমুনার বিভিন্ন চরে নেওয়া হয়। এসব বাথানে শত শত রাখাল অবস্থান করেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চরাঞ্চলের কাশবন ও তৃণভূমি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজি বেড়েছে।
রবিন মিয়া নামে এক রাখাল জানান, চরাঞ্চলে মহিষ চরাতে বিঘাপ্রতি প্রায় দেড় হাজার থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। টাকা না দিলে মহিষ চুরি কিংবা রাখাল অপহরণের ভয় থাকে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আরেক রাখাল জানান, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, সারিয়াকান্দি এবং সিরাজগঞ্জের কাজীপুর সীমান্তবর্তী চরগুলোতে কয়েকটি চক্র বাথানমালিকদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা আদায় করছে। সম্প্রতি চর ঘাঘুয়া এলাকা থেকে চার রাখালকে অপহরণ করা হয়েছিল বলেও তিনি দাবি করেন। পরে চার লাখ টাকা মুক্তিপণের বিনিময়ে পাবনার রূপপুর এলাকা থেকে তাদের ছাড়া হয়।
এক বাথানমালিক জানান, তাঁর বাবা-দাদারাও একই চরাঞ্চলে মহিষ চরাতেন, কিন্তু তখন কোনো চাঁদা দিতে হতো না। তাঁর অভিযোগ, গত দুই বছরে কয়েকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়েছে এবং এসব চক্রে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোকজনই রয়েছে।
সম্প্রতি সারিয়াকান্দির পাকুরিয়া চরে কাশবনের দখলকে কেন্দ্র করে মুসলেম উদ্দীন নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠার পর চরাঞ্চলের দখল ও চাঁদাবাজির বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মুসলেম উদ্দীনের নেতৃত্বাধীন একটি পক্ষ এবং গিয়াস খান ও হায়দার খানের নেতৃত্বাধীন আরেকটি পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্ব রয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ মুসলেম উদ্দীনের পক্ষকে ‘আওয়ামী লীগের সিন্ডিকেট’ এবং গিয়াস-হায়দারের পক্ষকে ‘বিএনপির সিন্ডিকেট’ নামে অভিহিত করেন। তবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মাদারগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মঞ্জুর কাদের বাবুল খান জানিয়েছেন, তাঁর চাচাতো ভাইদের চাঁদাবাজি চক্রের সঙ্গে জড়ানোর অভিযোগ সঠিক নয় এবং তাদের ফাঁসানো হয়েছে।
চরাঞ্চলের বিরোধ ও চাঁদাবাজি বন্ধে কাজলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম রফিকুল ইসলামের উদ্যোগে সম্প্রতি একটি বৈঠকও হয়। তিনি জানান, সমস্যা সমাধানের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির কেউ এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন তিনি।
মাদারগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা স্নেহাশীষ রায় বলেন, এ ধরনের অভিযোগের কথা তারা শুনেছেন, তবে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। পক্ষগুলো অনেক সময় নিজেদের মধ্যে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয় মীমাংসা করে নেয় বলেও জানান তিনি।
সারিয়াকান্দি থানার ওসি আ ফ ম আছাদুজ্জামান জানান, মুসলেম উদ্দীন হত্যা মামলায় আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলাটি বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত করছে। চাঁদাবাজির বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমন চৌধুরী জানিয়েছেন, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে তিনি থানার ওসিকে বলবেন। সারিয়াকান্দির ইউএনও এস এম মিকাইল ইসলামও বলেছেন, তিনি নতুন দায়িত্ব নিয়েছেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানেন না। তবে অভিযোগ সত্য হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যমুনার চরাঞ্চলে তৃণভূমির দখল, চাঁদাবাজি এবং রাখাল অপহরণের অভিযোগ এখন স্থানীয় কৃষক ও বাথানমালিকদের জন্য বড় আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে চর একসময় ছিল গবাদিপশু চরানোর উন্মুক্ত জায়গা, সেখানে এখন নিরাপদে গরু-মহিষ চরাতেও দিতে হচ্ছে টাকা—এমন অভিযোগই করছেন স্থানীয়রা।