
দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়া সংগঠন আবাহনী লিমিটেড দীর্ঘ ৫৪ বছর ধরে ব্যবহার করে আসা ধানমন্ডির মাঠটির নিয়ন্ত্রণ হারাতে যাচ্ছে। আবাহনীর নামে থাকা ৯৯ বছরের ইজারা বাতিল করে মাঠটির নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে ‘আবাহনী মাঠ’ নামে পরিচিত মাঠটির নতুন নাম হচ্ছে ‘ধানমন্ডি ক্রিকেট মাঠ’। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে মাঠটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
১৯৭২ সালে শেখ কামালের উদ্যোগে আবাহনী ক্রীড়া চক্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ধানমন্ডির এই মাঠটি ক্লাবের অনুশীলন ও ক্রীড়া কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের এই সম্পর্কের কারণেই মাঠটি মানুষের কাছে ‘আবাহনী মাঠ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
১৯৯৬ সালে মাঠটির ৯ দশমিক ৭৬ একর জমি ইজারা নেওয়ার আবেদন করে আবাহনী। ১৯৯৮ সালে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ওই জমি ৯৯ বছরের জন্য ক্লাবটিকে ইজারা দেয়। পরে ২০১০ সালে আরও শূন্য দশমিক ৮৯ একর যুক্ত করা হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ১০ দশমিক ৬৫ একর জমি আবাহনীর দীর্ঘমেয়াদি ইজারার আওতায় আসে।
কিন্তু সেই ৯৯ বছরের ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার বহু আগেই তা বাতিল করেছে সরকার। গত ৩ আগস্ট আবাহনীর তৎকালীন ফুটবল ম্যানেজার সত্যজিৎ দাস রূপু ইজারা পুনর্বহালের আবেদন করলেও মন্ত্রণালয় তা প্রত্যাখ্যান করে। সরকারি পক্ষ থেকে বকেয়া ফি ও ইজারা চুক্তির শর্ত ভঙ্গের কথা বলা হয়েছে। তবে ঠিক কোন তারিখে মূল ইজারাটি বাতিল করা হয়েছিল, তা দ্য ডেইলি স্টার নিশ্চিত করতে পারেনি।
এ সিদ্ধান্তের ফলে মাঠটির সঙ্গে আবাহনীর পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের বড় পরিবর্তন ঘটছে। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, হস্তান্তরের পর মাঠটি তাদের ব্যবস্থাপনায় থাকবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। মাঠটির সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথাও জানানো হয়েছে।
আবাহনী মাঠের উত্তরাংশে ‘শেখ কামাল স্পোর্টস কমপ্লেক্স’ নির্মাণের কাজও অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ২০১১ সালে এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর ২০২২ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরিকল্পনায় ক্লাব কার্যালয়, সুইমিংপুল, জিমনেশিয়ামসহ বিভিন্ন ইনডোর ক্রীড়া সুবিধা রাখার কথা ছিল। মাঠের পূর্ব পাশে ২০১৩ সালে একটি একাডেমি ভবনও নির্মিত হয়েছিল।
এর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় আবাহনী ক্লাব প্রাঙ্গণে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। ক্লাবের বহু ট্রফিও লুট হয়ে যায়। এরপর গত দুই মৌসুম ধরে নতুন ব্যবস্থাপনায় আবাহনীর কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আবাহনীর কার্যক্রম থেমে যায়নি। চলতি বছরের আগস্টে বিদেশি খেলোয়াড়দের বকেয়া পারিশ্রমিকসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানের পর ফিফার নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞার তালিকা থেকেও পুরোপুরি মুক্ত হয়েছে ক্লাবটি।
শেখ কামালের প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটির সঙ্গে মাঠটির দীর্ঘ ইতিহাসের কারণে ইজারা বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের প্রশ্নও উঠতে পারে। তবে সরকারের প্রকাশিত বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, ইজারাসংক্রান্ত শর্তের বিষয়টিই সিদ্ধান্তের ভিত্তি। ফলে সিদ্ধান্তটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ কি না, তা এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, যে মাঠে আবাহনীর কয়েক প্রজন্মের খেলোয়াড় অনুশীলন করেছেন, যে মাঠটি পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে ক্লাবটির নামের সঙ্গে মিশে গেছে, সেই মাঠ আর আবাহনীর নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। ৯৯ বছরের জন্য নেওয়া ইজারা বাতিলের পর ‘আবাহনী মাঠ’ নামটিও সরকারি ব্যবস্থাপনায় বদলে যাচ্ছে ‘ধানমন্ডি ক্রিকেট মাঠে’।