
অবৈধ অসাংবিধানিক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর, বর্তমান বিএনপি সরকারের ভাষায় ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। একই সঙ্গে এসব ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে ভূমিকা রাখা পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬-এর পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের, আওয়ামী শক্তির দোসরদের’ আইনের আওতায় আনতে পারলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের পুরস্কৃত করা হবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি গ্রেপ্তারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তোলেন, এসব ব্যক্তি এতদিন দেশে অবস্থান করলেও পুলিশের গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে আগে কেন তাদের শনাক্ত করা যায়নি।
তিনি আরও বলেন, পুলিশের নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ককে আরও সক্রিয়ভাবে কাজে লাগাতে হবে। অন্যান্য সংস্থার গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে তুলনা করার পাশাপাশি পুলিশকে নিজের তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্তের নির্দেশ দেন তিনি।
আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েও আইনি বিতর্ক রয়েছে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট করা হয়েছিল। চলতি মাসে হাইকোর্ট সেই রিট ‘উত্থাপিত হয়নি’ মর্মে খারিজ করেন; ফলে প্রজ্ঞাপনটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে কোনো চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত ওই আদেশে দেওয়া হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুরস্কারের ঘোষণা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ও প্রমাণ থাকলে তাঁকে আইনের আওতায় আনা পুলিশের দায়িত্ব। তবে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তারকে আলাদা করে উৎসাহিত করা হলে আইন প্রয়োগের মানদণ্ড নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিশেষ করে পুলিশের সাফল্য যদি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বা সমর্থকদের গ্রেপ্তারের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তাহলে অপরাধভিত্তিক আইন প্রয়োগের বদলে রাজনৈতিক পরিচয়নির্ভর পুলিশিংয়ের ধারণা তৈরি হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্ব হলো অভিযোগ, প্রমাণ ও প্রচলিত আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
একই বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশকে জনগণের স্বার্থে কাজ করার আহ্বান জানান এবং দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। তিনি আওয়ামী লীগ আমলের বিভিন্ন ঘটনা ও ২০২৪ সালের সহিংসতার জন্য দলটির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও তোলেন। এসব বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক ও সরকারি অবস্থান হিসেবে এসেছে; সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া আলাদাভাবে চলমান।
ফলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে ‘দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক নিরপেক্ষতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তদন্ত ও বিচার অবশ্যই হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয় যেন নিজেই গ্রেপ্তারের কারণ বা পুলিশের সাফল্যের মাপকাঠি হয়ে না ওঠে, সেটিই আইনের শাসনের অন্যতম মৌলিক শর্ত।
সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, জাগো নিউজ, কালবেলা, সময়ের আলো, বিডিনিউজ২৪।