
নিজস্ব প্রতিবেদক :
গত বছরের ‘জুলাই আন্দোলন’-এর নামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উৎখাতের প্রচেষ্টা চালানো চক্রটি ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এবার তাদের লক্ষ্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের বাসভবনে লুটপাট চালানো। সেইসঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে বিদ্রূপ ও রাজনৈতিক আক্রমণ।
সম্প্রতি পুরান ঢাকায় যুবদলের দুই পক্ষের সংঘর্ষে এক ভাঙাড়ির ব্যবসায়ী নিহত হন। এই ঘটনাকে ঘিরে বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মিছিলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানকে নিয়ে অশালীন স্লোগান দেওয়া হয়। ঢাকায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মিছিলে শোনা গেছে, হাসিনা গেছে যে পথে, খালেদাও যাবে সে পথে স্লোগান। ঝিনাইদহেও বিএনপির অফিসে হামলার খবর পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াত-শিবিরের ছায়ায় পরিচালিত এই চক্রটি এখন বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। ইতোমধ্যে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ট্রল, বিদ্রূপ, কটাক্ষ এবং উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
ফেসবুকে ‘ফাইয়াজ ইফতি’ নামের একটি আইডি থেকে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিয়ে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়া হয়। ওই আইডি থেকে লেখা হয়, “খালেদা জিয়ার সব শাড়ি আর মেকআপ আইটেমগুলো আমি নেবো, আগেই বলে দিলাম।”
পোস্টটির নিচে মন্তব্যে একজন লেখেন, রুমিন ফারহানার শাড়িগুলো কেউ নিতে আসবেন না খবরদার। সামনে বিয়েশাদি করবো, খরচ বাঁচবে। আরেকজন লিখেছেন, বিএনপির সবাইকে গালিও দাও, সমালোচনাও করো, কিন্তু বেগম জিয়াকে কিছু বোলো না প্লিজ। উনি সম্মানিত মানুষ।
এসব পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে লাল প্রোফাইল পিকচারের মাধ্যমে, ঠিক যেভাবে গত বছরের ‘জুলাই আন্দোলনের’ সময় পরিচালনা করা হয়েছিল। এই ‘লাল প্রোফাইল’ মূলত একটি সংগঠিত প্রতীকী প্রচারণার অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই ধারার অন্যতম কুশীলব হিসেবে পরিচিত আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও তার লাল প্রোফাইল আইডি থেকে লেখেন,“প্রস্তর যুগে স্বাগতম। কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিবেন না, ধন্যবাদ।”
এ বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—এই কথিত প্রস্তর যুগের সূচনা করছে কারা? ৫ আগস্টের পর থেকে যেসব সহিংসতা বা উত্তেজনাকর ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে, তার নেতৃত্বে কারা? বিশ্লেষকদের মতে, এই চক্রটি সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে রাজপথে নামিয়ে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখায় এবং শেষপর্যন্ত বিশৃঙ্খলার মাধ্যমে দেশকে এক অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেয়। তাদের অন্যতম উদ্দেশ্য দেশকে অস্থিতিশীল করে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের পথ তৈরি করা।
প্রশ্ন উঠতে পারে লাল প্রোফাইলের সঙ্গে জামায়াত শিবিরের সংশ্লিষ্টতা কোথায়। সম্প্রতি এর উত্তর দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি এস এম ফরহাদ। তিনি এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেন, “রাষ্ট্র যখন কালো পতাকা দেয়, তখন আমরা পাল্টা কর্মসূচি দিই লাল রঙের মাধ্যমে। আমাদের পরামর্শে আবু সাদিক কায়েম (ঢাবির শিবিরের সাবেক সভাপতি) লাল প্রোফাইলের ধারণা গ্রহণ করেন এবং সেটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।”
তিনি আরও জানান, “পরদিন ড. ইউনূস ও খালেদা জিয়ার ফেসবুক পেজ থেকেও লাল প্রোফাইল শেয়ার করা হয়।”
এদিকে সাবেক এমপি ও সাংবাদিক গোলাম মাওলা রনি বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করে বলেন, “তারেক রহমানকে নিয়ে অশ্লীল স্লোগানের পরিণতি শুভ হবে না। রাজনীতি শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকবে না; অস্ত্রের ঝনঝনানি আবার শুরু হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে সেই চক্র, যারা বাংলাদেশকে জঙ্গি রাষ্ট্র বানিয়ে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ডাকার স্বপ্ন দেখছে।”
এ স্ট্যাটাসের পর গোলাম মাওলা রনিকেও জঙ্গি স্টাইলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠবে এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে।