
নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা অনেকটাই একটি গভীর পরিকল্পনার অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। শাসকগোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ মদদে জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) যেন দেশে কার্যত সরকারপ্রধানের ভূমিকায় উঠে আসছে। প্রশাসনিক সহায়তা থেকে শুরু করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে দেওয়া হচ্ছে এই দুই রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে।
অন্যদিকে, বৃহত্তর বিরোধী দল বিএনপি এবং অন্যান্য বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে সরকার নির্বাচনের আশায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মূলা ঝুলিয়ে যাচ্ছে। সরাসরি কোনো নির্বাচন দেয়ার কথা না বললেও সরকার বিভিন্ন সময় ‘আশার আলো’ দেখিয়ে বিরোধীদের কার্যত ঘুম পাড়িয়ে রাখছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল, যেখানে নির্বাচনের নামে প্রতিশ্রুতি দিয়ে সরকার আসলে সময় কিনছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, সরকার পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করে চলেছে যেন জামায়াতে ইসলাম ও এনসিপির মতো দলগুলো সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে নির্বাচন না দিয়ে পরিস্থিতিকে একটি বিশেষ মোড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকার নির্বাচনের কোনো বাস্তব পরিকল্পনা না করেই শুধু "আশ্বাস" দিয়ে যাচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হতে বাধ্য হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশ। যেখানে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিয়ে ক্ষমতাসীন দল একটি সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করতে চাইছে — বিশেষ করে যেসব দল ইতিহাসে সরকারের সহযোগী হিসেবে পরিচিত, তাদের জন্য।
নির্বাচনের দাবিতে রাজপথ উত্তপ্ত করা বিএনপি এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের চোখে পড়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কৌশলগত ফাঁদে। ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার আওতায় ইউনূস গং যে কেবল আওয়ামী লীগ নয়, বিএনপিকেও মাইনাস করতে চাইছে—তা ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। মার্কিন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশের দুই প্রধান দলকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার পথেই এগোচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যার নেতৃত্বে রয়েছেন ইউনূস।
সম্প্রতি পুরান ঢাকায় মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে যুবদলের দুই পক্ষের সহিংসতায় এক ভাঙাড়ির ব্যবসায়ী পাথরের আঘাতে নিহত হন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে শুক্রবার (১১ জুলাই) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। সেখানেই বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অশালীন বক্তব্য ওঠে।
সূত্র জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি একটি নীলনকশার অংশ এই নির্বাচন পেছানো। যার লক্ষ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের আধিপত্য বিস্তার। জাতিসংঘের অফিসের মাধ্যমে ‘মানবাধিকার’ ইস্যুকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারে চীন-সমর্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান নিতে সক্রিয় হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট, মানবিক করিডোর, এবং চট্টগ্রাম বন্দর—সব মিলে এই অঞ্চলটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে একটি “খ্রিস্টান রাজ্য” গঠনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন অনেকে, যা পূর্ব তিমুরের ঘটনার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগেও সতর্ক করে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে এবং এ সংক্রান্ত প্রস্তাবনা বাংলাদেশে একটি এয়ার বেজ স্থাপনের মাধ্যমেও এসেছে।
একাধিক সূত্র ও বিশ্লেষকের মতে, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এই ষড়যন্ত্রে “প্রক্সি নেতা” হিসেবে ব্যবহার করছে বাইডেন প্রশাসন। তাদের দাবি, তাঁকে জাতিসংঘ মহাসচিব করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পশ্চিমা স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের সহায়তা, চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পে বাধা এবং বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টির মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে একটি গ্রহণযোগ্য, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন না হলে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যেন অন্য কোনো শক্তির হাতিয়ার হয়ে না পড়ে—সেই বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।