
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতা, মব ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে গোপালগঞ্জে এক ভয়াবহ ও বেদনাদায়ক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সেনাবাহিনীর গুলিতে কমপক্ষে সাতজন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে দাবি করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৯৩০ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৯৪, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০, মার্চে ৩১৬, এপ্রিলে ৩৩৬, মে মাসে ৩৪১ এবং জুনে সর্বোচ্চ ৩৪৩ জন খুন হয়েছেন।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি মাসেই খুনের সংখ্যা বাড়ছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন, ঢাকা রেঞ্জ ও চট্টগ্রাম রেঞ্জে এই ঘটনা সবচেয়ে বেশি। জঙ্গি গোষ্ঠীগুলো সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার ও রাজনৈতিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে এই সহিংসতাকে উসকে দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বুধবার এনসিপির ঘোষিত 'মার্চ টু গোপালগঞ্জ' কর্মসূচির পর দলটির শীর্ষ নেতারা সমাবেশ শেষে শহরের একটি এলাকায় সাধারণ মানুষের জনরোষে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। স্থানীয়ভাবে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর একটি দল মাঠে নামে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সেনাসদস্যরা শুরুতে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করলেও কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করে।
ভিডিও প্রমাণ ও জনমত
ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একাত্তর টিভির সরাসরি সম্প্রচারে সেনাবাহিনীর সদস্যদেরকে আন্দোলনকারীদের দিকে গুলি চালাতে বলা হচ্ছে এবং পরবর্তী দৃশ্যগুলোতে গুলিবর্ষণের শব্দ শোনা যায়।
আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, ছাত্রলীগ সদস্য দীপ্ত সাহার মরদেহ রক্তাক্ত অবস্থায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে কয়েকজন। একটি ভিন্ন ফুটেজে নিহত একজন যুবকের মরদেহ কাঁধে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ির পথে ফিরছেন তার আত্মীয়। এসব দৃশ্য জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা ও বিতর্ক। কেউ কেউ সেনাবাহিনীর এই ভূমিকাকে "পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মতো বর্বরতা" বলে উল্লেখ করেছেন। অনেকেই বলছেন, জঙ্গিদের বাঁচাতে সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষদের ওপর গুলি চালিয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, গত জুলাই মাসে যখন দেশজুড়ে বড় আন্দোলন চলছিল, তখন বাহিনীটি ‘মানবাধিকারের কথা বলে’ গুলি চালায়নি, অথচ এবার নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলি চালানো হয়েছে।
সাবেক এমপি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন,“আজ দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী না থাকলে যে কী হতো! যারা বলতেন গরিব দেশে ট্যাংকের দরকার নেই, আজ তারা বুঝেছেন কেন দরকার। আগে গোপালগঞ্জ ঠিক হোক, তারপর নির্বাচন—নইলে দ্বিতীয় বিপ্লব অনিবার্য।”
এনসিপির গোপালগঞ্জ অভিমুখে পদযাত্রা ও সমাবেশ নিয়ে মঙ্গলবার রাত থেকেই সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার ঝড় ওঠে। ফেসবুকে এনসিপির পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ কর্মসূচির প্রচার চালানো হয়। বুধবার নেতারা গোপালগঞ্জে পৌঁছাতে গেলে বিভিন্ন স্থানে বাধা, পাল্টা হামলা ও যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশের গাড়ি ও ইউএনওর যানবাহনেও হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, “গোপালগঞ্জে সেনাবাহিনীর সরাসরি গুলিতে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির অভিযোগ শুধু একটি ট্র্যাজেডি নয়, এটি আমাদের গণতন্ত্র, সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রশ্ন তোলে। সেনাবাহিনী জনগণের সম্পদ, তাদের ভূমিকা সর্বদা নিরপেক্ষ ও সংবিধানসম্মত থাকা উচিত। যদি এই ঘটনা সত্য হয়, তাহলে এটি একটি ন্যায্য বিচারের দাবি রাখে।”
তাদের মতে,গোপালগঞ্জের ঘটনায় যে ভয়াবহতা ও রাষ্ট্রীয় শক্তির বর্বর প্রয়োগ আমরা দেখেছি, তা গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশে বড় বাধা। যদি জনগণের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই গুলির মাধ্যমে দমন করা হয়, তাহলে বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার কোথায় থাকবে? এটা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর আঘাত।"