
নিজস্ব প্রতিবেদক
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) একের পর এক বিতর্কে জড়াচ্ছে। সরকারের কার্যক্রমের দিকে যখন জনগণের আস্থা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, তখন ইউনূস সরকারের ‘নিরাপদ সেফ এক্সিট’ নেওয়ার পরিকল্পনা সামনে চলে এসেছে।
আমেরিকা-সমর্থিত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা
সূত্র মতে, আমেরিকার সমর্থন থাকলেও ইউনূস সরকার এখন পর্যন্ত বড় কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অন্যদিকে, জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় ইউনূস দ্রুত ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজছেন। দেশীয় রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে মানবিক করিডোর বাস্তবায়নও সম্ভব হয়নি। এছাড়া জামায়াত ছাড়া বাকি ইসলামী দলগুলো জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস নিয়েও ইউনূসকে হুমকি দিচ্ছে।
তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, আমেরিকা বিভিন্ন দেশের ওপর থেকে শুল্ক কমিয়ে নিলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা বহাল রেখেছে—এটি সরকারের প্রতি বৈশ্বিক আস্থার অভাবকেই ইঙ্গিত করছে।
চাঁদাবাজি ও অনৈতিক অর্থ ব্যবস্থাপনায় এনসিপি
এনসিপি নামধারী দলটি ‘নৈতিক রাজনীতি’ ও ‘গণঅভ্যুত্থানের’ কথা বলে আত্মপ্রকাশ করলেও এখন চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে। জুলাই মাসে আয়োজিত ‘পদযাত্রা’ ঘিরে দেশের বিভিন্ন জেলায় চাঁদা আদায়ের অভিযোগ ওঠে। কোথাও কোথাও ৫০ লাখ টাকার বেশি ব্যয়ের কথা বলা হলেও, দলটির ঘোষিত ২ কোটি টাকার ‘নাগরিক আমানত’ তহবিলের সঙ্গে তা মেলেনি।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা গুলশান-২-এ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদা চাইতে গিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তিন নেতার আটক হওয়া। সরকার বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজি হয়েছে।
এ নিয়ে বিএনপি নেতা জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, “চাঁদাবাজদের ধরেছেন, ভালো কথা। কিন্তু গত ১১ মাসে কে কী করেছে, তাদের নাম প্রকাশ করুন।”
নাহিদের আশ্রয়ে থাকা ‘চাঁদাবাজ’ রিয়াদ
সম্প্রতি গুলশানের আলোচিত চাঁদাবাজি ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া আবদুর রাজ্জাক বিন সুলায়মান ওরফে রিয়াদ জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে জানিয়েছেন প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামি। ৩১ জুলাই দেওয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি লেখেন, “রিয়াদ যে আপনার শেল্টারে ছিল সেটা আমি জানতাম। পরে জানতে পারলাম, আপনার ও আপনার বাবার সাথে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “নাহিদ ইসলাম, আপনি আমার উপর ক্ষেপে গেছেন কারণ আপনাকে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছে যে রিয়াদকে ধরিয়ে দিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা না কি আমার।”
জঙ্গি কানেকশনের অভিযোগ, সন্ত্রাসীদের মুক্তি ও পুনরায় সক্রিয়তা
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সশস্ত্র সংগ্রামের হুমকি দিয়েছিলেন নাহিদ ইসলাম নিজেই। একটি ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, “আজ যদি কোনো গণহত্যা হয়, তাহলে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান থাকবে।”
সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড মাহফুজ আলম ও নাহিদের বিরুদ্ধে হিজবুত তাহরীর-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। ৮ আগস্ট শপথ নেওয়ার পর কারাগার থেকে একে একে মুক্তি পেতে থাকে বিভিন্ন জঙ্গি ও সন্ত্রাসী। এমনকি, ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে একাধিক জেলখানায় হামলা চালিয়ে আসামিদের মুক্ত করার ঘটনাও ঘটেছে। সুযোগে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীরা দেশে ফিরে এসে পুনরায় অপরাধে জড়াচ্ছেন।
জঙ্গি মামলায় জামিনপ্রাপ্তদের সংখ্যা ৩০০’র বেশি
এ বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “জঙ্গি মামলায় জামিনপ্রাপ্তদের সংখ্যা তিনশ’র বেশি।”
এতসব তথ্য একত্র করে স্পষ্টভাবে বলা যায়, নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে এনসিপি এখন একটি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা হুমকির নাম। চাঁদাবাজি, জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা ও রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে এই দলের সংশ্লিষ্টতা গভীর উদ্বেগজনক।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) বর্তমান কর্মকাণ্ডের পেছনে যে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এবং অস্বচ্ছ অর্থনৈতিক চালনা রয়েছে, তা এখন আর অজানা নয়। চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যক্রমে সংশ্লিষ্টতা এবং জঙ্গি গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ—এসব মিলে এটি কেবল একটি দল নয়, বরং একটি বহুমাত্রিক নিরাপত্তা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই দলের পৃষ্ঠপোষকতা এসেছে একটি তথাকথিত অন্তর্বর্তী সরকারের ছায়া থেকে, যেটি নিজেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্নবিদ্ধ। রাষ্ট্রে যখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রাধান্য পায়, তখন এমন চক্রগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এখন সময় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার, কারণ এটি শুধু রাজনৈতিক ভারসাম্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।”