
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪-২৫ সময়কাল এক রক্তাক্ত ও বিতর্কিত অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনে যেমন মার্কিন প্রভাব ব্যাপকভাবে আলোচিত, তেমনি জাতিসংঘের ভূমিকাও এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের কার্যকলাপ, সেনাবাহিনীর প্রতি হুমকি, ও অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন – সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠেছে: বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কি জাতিসংঘ এক নতুন ‘ছায়াযুদ্ধ’ শুরু করেছে?
সহিংসতা ছড়াল, জাতিসংঘ চুপ থাকল
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে সহিংসতা ও অরাজকতা। সরকারি স্থাপনা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, কারাগারে হামলা, জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের মুক্তি, এবং পুলিশের ওপর নৃশংস হামলার ঘটনা দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। নরসিংদীতে হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে চিহ্নিত ৯ জন জঙ্গি পালিয়ে যায়। মহাখালী ও বনানীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
এসব ঘটনার পরও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার ভলকার টুর্ক কোনো সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানাননি। বরং ২৫ জুলাই ২০২৪-এ প্রকাশিত বিবৃতিতে তিনি একতরফাভাবে সরকারের সমালোচনা করে আন্দোলনকারীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর জোর দিলেও, পুলিশ সদস্যদের নির্মম হত্যা, যেমন—এএসআই মোক্তাদিরকে ঝুলিয়ে হত্যা এবং বনানীতে পরিদর্শক মাসুদ পারভেজকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনাগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেন।
সেনাবাহিনীর প্রতি হুমকি: রাষ্ট্রযন্ত্রকে পক্ষাঘাত করা
সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় ছিল জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণ নিয়ে হুমকি। মার্চ ২০২৫-এ বিবিসির হার্ড টক অনুষ্ঠানে ভলকার টুর্ক নিজেই জানান, আন্দোলন দমন করতে সেনাবাহিনী ব্যবহার করা হলে, তাদের শান্তিরক্ষা মিশনে আর থাকতে দেওয়া হবে না।
এই হুমকির পর সেনাবাহিনী কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলাফল— সহিংসতা আরও বাড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনী জাতিসংঘের চাপের কারণে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকে, যা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তোলে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘ যখন সেনাবাহিনীকে হুমকি দেয়, তখন সেটা কার্যত আইন শৃঙ্খলার ভাঙনকে উৎসাহ দেওয়ার সামিল।
একপেশে মানবাধিকার প্রতিবেদন: অপপ্রচারের হাতিয়ার
২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে দাবি করা হয়—জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ১,৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের পক্ষগুলোর নাম প্রকাশ করা হয়নি।
অন্যদিকে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ও অন্তর্বর্তী সরকারের হিসাব মতে নিহত সংখ্যা যথাক্রমে ৮২০ এবং ৮৩৪। রিপোর্টে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর সহিংস হামলা, বাসাবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, ও গণপিটুনির ঘটনাগুলো উপেক্ষা করা হয়।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভলকার টুর্ক আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন, যেন তিনি মানবাধিকার কমিশনার নন, বরং রাজনৈতিক পক্ষের মুখপাত্র।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “জাতিসংঘ বিরোধী দল ও সুশীল সমাজের নির্বাচিত তথ্যের ওপর নির্ভর করে প্রতিবেদন তৈরি করে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি বা প্রেক্ষাপট উপেক্ষা করা হয়। এটি তাদের নিরপেক্ষতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
রাজনৈতিক অপকৌশল সরাসরি সমর্থন: নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ
২০২৫ সালের ১২ মে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। জাতিসংঘের রেসিডেন্ট কোঅর্ডিনেটর গোয়েন লুইস এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনও অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি জাতিসংঘের পক্ষ থেকে একটি বড় রাজনৈতিক অবস্থান। কেননা, আওয়ামী লীগ ও তার জোট প্রায় ৫০ শতাংশ ভোটারের প্রতিনিধি, এবং তাদের বাদ দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন সম্ভব কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, যদি জাতিসংঘ সত্যিই নিরপেক্ষ হতো, তবে তারা আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞাকে নিন্দা করত। বাস্তবে তারা ক্ষমতা বদলের প্রকৌশলে সহায়ক হয়েছে।
ড. ইউনুসের স্বীকারোক্তি: জাতিসংঘ ছিল পাশে
২৯ জুলাই জাতিসংঘ আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস জাতিসংঘের ভূমিকার জন্য প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতা জানান। তাঁর বক্তব্য— গত বছরের জুলাই-আগস্টের অন্ধকার সময়ে জাতিসংঘ বাংলাদেশের পাশে ছিল।”
এই বক্তব্য অনেকের কাছে জাতিসংঘের সরাসরি হস্তক্ষেপের স্বীকারোক্তি বলে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, “জাতিসংঘ এবং ড. ইউনুসের বোঝাপড়া ছিল পূর্বনির্ধারিত। শেখ হাসিনাকে সরিয়ে এমন একজনকে বসানো হয়েছে, যিনি পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখেন।”
প্রথমে "গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন" হিসেবে প্রচারিত হলেও এখন জুলাই আন্দোলন রাজনৈতিক প্রকৌশলের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে বলে অনেকেই মনে করছেন।
শেখ হাসিনা বারবার পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। ৫ আগস্টের পর সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও রাখাইন করিডোর নিয়ে বিদেশি কূটনৈতিক তৎপরতা সেই সন্দেহকে আরও জোরালো করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘ মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নামে কার্যত একটি পক্ষ হয়ে গেছে। এতে দেশের গণতন্ত্রকেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে।
আওয়ামী লীগ বিরোধী জাতিসংঘের ভূমিকার নির্মম বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতিসংঘের (ইউএন) ভূমিকা সম্প্রতি তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে এর অবস্থান নিয়ে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাতিসংঘের কিছু পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও নিরপেক্ষতার নামে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষুণ্ন করেছে।
আন্দোলনের সহিংসতা উপেক্ষা : জাতিসংঘ বাংলাদেশে সাম্প্রতিক আন্দোলনের সময় সহিংসতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনো সুস্পষ্ট নিন্দা জানায়নি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আব্দুল হক বলেন, “জাতিসংঘের নীরবতা আন্দোলনকারীদের দ্বারা সংঘটিত সম্পত্তি ধ্বংস, হামলা ও সহিংসতাকে পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করেছে। এটি তাদের নিরপেক্ষতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।”
রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করা : জাতিসংঘের কিছু প্রতিবেদন ও বক্তব্যে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন বলেন, “জাতিসংঘের অযাচিত সমালোচনা সেনাবাহিনীকে হুমকির মুখে ফেলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে অকার্যকর করার চেষ্টা করছে। এটি দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ।”
রাজনৈতিক কূটকৌশলে অংশগ্রহণ: জাতিসংঘের কিছু পদক্ষেপ আওয়ামী লীগের মতো প্রধান রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার প্রচেষ্টাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ফারুক হোসেন বলেন, “একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত দলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাবকে বৈধতা দেওয়া জাতিসংঘের গণতন্ত্রবিরোধী অবস্থানের প্রমাণ।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, জাতিসংঘের আওয়ামী লীগবিরোধী অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। সহিংসতা উপেক্ষা, একতরফা প্রতিবেদন প্রকাশ এবং রাজনৈতিক কূটকৌশলে অংশগ্রহণের মাধ্যমে জাতিসংঘ তার নিরপেক্ষতার দাবি থেকে সরে গেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ দেশের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
জাতিসংঘ কি নিরপেক্ষ সংস্থা, না কি প্রভাবশালী রাজনৈতিক হাতিয়ার?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জাতিসংঘের (ইউএন) ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। মানবাধিকার, শান্তি ও নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে জাতিসংঘের একতরফা ও বিতর্কিত পদক্ষেপ দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা তৈরি করেছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক কার্যক্রম বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করেছে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে সরকারের বিরুদ্ধে একপক্ষীয় প্রতিবেদন প্রকাশ এবং আন্দোলনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে নীরবতা জাতিসংঘের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. রেহানা আক্তার বলেন, “জাতিসংঘের প্রতিবেদনগুলোতে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রাধান্য থাকলেও, বিরোধীদের সহিংস কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কোনো উল্লেখ থাকে না। এটি স্পষ্টতই একতরফা।”
জাতিসংঘের সমালোচনা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অযাচিত চাপ সৃষ্টি করছে। সাবেক কূটনীতিক মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, “জাতিসংঘের অভিযোগগুলো প্রায়ই অতিরঞ্জিত এবং প্রেক্ষাপটহীন। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপের মতো।”
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটকে অনেকে ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের কেন্দ্র হিসেবে দেখছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, “জাতিসংঘের পদক্ষেপগুলো বিশ্বশক্তিগুলোর এজেন্ডার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশকে গণতন্ত্রের নামে একটি ‘পরীক্ষাগার’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।”
জাতিসংঘের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং মানবাধিকার বিষয়ক প্রতিবেদনগুলো প্রায়ই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষক সৈয়দা ফারজানা আহমেদ বলেন, “জাতিসংঘের প্রতিবেদনগুলোতে বিরোধী দলের তথ্যের ওপর বেশি নির্ভর করা হয়, যা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।”
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, জাতিসংঘের সাম্প্রতিক কার্যক্রম বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করছে। একতরফা প্রতিবেদন, সহিংসতার প্রতি নীরবতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে জাতিসংঘ তার নিরপেক্ষতার দাবি থেকে সরে গেছে। অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশ এখন ভূ-রাজনৈতিক খেলার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে জাতিসংঘ বিশ্বশক্তিগুলোর রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।