
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকারবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন, যা অনেকেই "জুলাই বিপ্লব" বা "ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান" নামে উল্লেখ করছেন, সেই আন্দোলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে শুরু হয়েছে চলছে বিতর্ক। জনগণের চোখে ধুলা দিয়ে তারা ছদ্মবেশে শুরু থেকেই এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। আর তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে একসময় সরকারের পতন হয়।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলন, যা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বা জুলাই বিপ্লব নামে পরিচিত, বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং পরবর্তীতে সরকারবিরোধী অসহযোগ আন্দোলনের সমন্বিত রূপ। এই আন্দোলনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিকা নিয়ে। তবে, জামায়াত-শিবিরের "লিডিং ভূমিকা" সম্পর্কিত দাবি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয় এবং এটি বিতর্কিত।
জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা কী ছিল? এ সংক্রান্ত শিরোনামে করা একটি প্রতিবেদনে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তখন তাদের তরফ থেকে ক্রমাগত আঙুল তোলা হচ্ছিল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দিকে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাত্র আন্দোলনে দলের প্রকাশ্য সমর্থন না দেওয়া নিয়ে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি এ ধরনের প্রশ্নকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেন। তবে, তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যাও দিয়েছেন।
মির্জা ফখরুল বলেন, “আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটা সমস্যা আছে। ছাত্ররা অনেক সময় অন্য কোনো দলকে নিজেদের বলে দাবি করতে চায় না। সমর্থন দিলে তারা বলে, ‘তাদের সমর্থন আমাদের দরকার নেই।’ এ কারণে সরাসরি সমর্থন দেওয়া ও মাঠে সমর্থন দেওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। আমরা তো মাঠে ছিলামই।”
তিনি দাবি করেন, ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারীদের সঙ্গে বিএনপি ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সবসময় যোগাযোগ ও সংযোগ ছিল। তিনি আরও বলেন, “সে সময় ঢাকা থেকে বিএনপির সাড়ে তিন হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আমরা এই আন্দোলনকে নিজেদের বলে দাবি করি।”
অন্যদিকে অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীরও অনেক ক্ষেত্রেই বেশ প্রভাব দেখা যাচ্ছে। দলটির নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বিবিসিকে বলছিলেন "এটার পেছনে যে আমরা ছিলাম এটা গোয়েন্দারা জানতো, সরকার জানতো। এজন্যই তো আমাদেরকে ব্যান করে দিয়েছে, শিবিরকে ব্যান করেছে। আর কোনো দলকে তো করে নাই"।
তাহের নিজে থেকেই বলেন যে তারা খুবই সচেতন ছিলেন যেন "এটা যে জামায়াত-শিবিরের একটা আন্দোলন এটা যেন প্রকাশিত না হয়, আমরা চেয়েছি এটা একটা সার্বজনীন রূপ দেওয়ার জন্য"।
ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের ভূমিকা
ক্যাম্পাসভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেইলি ক্যাম্পাসে জুলাই বিপ্লবের অগ্রসৈনিক ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা: শিবির সেক্রেটারি নামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল মো. নুরুল ইসলাম দাবি করেছেন যে জুলাই বিপ্লবে ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি বলেন, “যখন সবাই নিউজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা সাহস নিয়ে নিউজ করেছে। এই ক্যাম্পাস সাংবাদিকরা না থাকলে জুলাই বিপ্লব সফল হতো না।” এই দাবি ছাত্রশিবিরের তথ্য প্রচারে অবদানের ইঙ্গিত দেয়, তবে আন্দোলনের নেতৃত্ব বা প্রধান ভূমিকার প্রমাণ দেয় না।
বিএনপির দৃষ্টিকোণ: বিএনপির নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, জুলাই আন্দোলনে বিএনপির ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য, তবে তারা এটিকে এককভাবে কৃতিত্ব দাবি করতে চায় না। তিনি আন্দোলনকে “১৮ কোটি মানুষের আন্দোলন” হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যেখানে জামায়াত-শিবিরের ভূমিকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি।
সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয় , আন্দোলনের সময় নিহতদের মধ্যে ৮৭ জন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে জামায়াত-শিবিরের সদস্যরা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জামায়াতে ইসলামীর সাম্প্রতিক সক্রিয়তা, বিশেষ করে জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে তাদের পরোক্ষ উপস্থিতি এবং নেতৃত্বের দাবি, অনেকটাই প্রতিশোধপরায়ণ রাজনৈতিক মনোভাবের ফলাফল। যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় দলটির শীর্ষ নেতৃত্বকে একে একে হারানোর পর তারা মূলধারার রাজনীতি থেকে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। এখন সেই ক্ষোভ থেকেই তারা গণআন্দোলনের ঢালকে ব্যবহার করছে সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে।