
নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে একের পর মিথ্যাচার করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। মঙ্গলবার দেওয়া ভাষণে তিনি দুর্নীতি, অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। ভাষণে ইউনূস বলেন, জাতীয় জীবনে শান্তি শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে, অর্থনীতিতে গতিশীলতা এসেছে, সংকট দূর হয়েছে।'
তবে পরিস্থিতি পুরোটাই ভিন্ন ইউনূসের সময়ে শেয়ারবাজার থেকে ৯০ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে, বৈদেশিক বিনিয়োগ গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২৫০টির বেশি শিল্প কারখানা বন্ধ হওয়ায় লক্ষ লক্ষ মানুষ বেকার হয়েছে।
ধোঁকায় পড়ে জুলাই আন্দোলনে সমর্থন দেওয়া অনেকেই তখন ভেবেছিল দেশের অর্থনীতির আমূল পরিবর্তন আনবেন তিনি। তবে তার শাসনামলে একদিকে যেমন বেড়েছে দুর্নীতি, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও নাজুক হয়েছে। আর এখন এসবে দিশেহারা দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী সমাজ।
গত এপ্রিলে গুলশানে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ১৯৭১ সালে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল, আর ২০২৫ সালে হত্যা করা হচ্ছে উদ্যোক্তা ও শিল্পকে। তিনি গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার এবং আমদানিনির্ভর নীতিমালাকে দায়ী করেন।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ বিনিয়োগ শীর্ষ সম্মেলন ২০২৫’-এ বিনিয়োগ আকর্ষণের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে বিনিয়োগ কমেছে ৭০ শতাংশের বেশি। বিশ্ব ব্যাংকের মতে, ২০২৫ সালে অতিরিক্ত ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মুখে পড়তে পারে। দেশে মূল্যস্ফীতির হার, বিশেষ করে খাদ্য পণ্যের মূল্যস্ফীতি এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বাধিক। এ অভিমত বিশ্ব ব্যাংকের।
গত ডিসেম্বরে ঢাকায় আইএমএফের গবেষণা বিভাগের ডেভেলপমেন্ট ম্যাক্রো ইকোনমিকসের প্রধান ক্রিস পাপা জর্জি বলেছেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দীর্ঘদিনেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না মূল্যস্ফীতি, যা আইএমএফের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে সংস্থাটি শঙ্কিত’।
আওয়ামী লীগের দোষারোপের আয়নায় ইউনূসের প্রতিচ্ছবি
নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোটা পদ্ধতি ও স্বজনপ্রীতিকে দুর্নীতির হাতিয়ার হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন। তবে তার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরুদ্ধে উঠেছে একই ধরনের অভিযোগ—গ্রামীণ ব্যাংক ও এনজিও-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপদেষ্টা পরিষদে নিয়োগ, যেমন লামিয়া মোর্শেদের এসডিজি সমন্বয়ক পদে নিয়োগ, স্বজনপ্রীতির প্রশ্ন তুলেছে। গ্রামীণ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য দ্রুত সরকারি অনুমোদন, যেমন গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স, কর মওকুফ এবং সরকারি শেয়ার ২৫% থেকে ১০%-এ নামানো, ক্ষমতার অপব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়।
ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘন ও দুর্নীতির ১৭০টির বেশি মামলা দ্রুত খারিজ, জনশক্তি রপ্তানি খাতে সিন্ডিকেট গঠন, এবং ৩০% শ্রমশক্তি রপ্তানি হ্রাসের অভিযোগ তার সমালোচনার আন্তরিকতাকে সন্দেহের মুখে ফেলে। এছাড়া, গ্রামীণ কল্যাণের কাছ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) দাবি করা ৬৬৬ কোটি টাকা কর পরিশোধের হাইকোর্টের রায় ৪ আগস্ট ২০২৪-এ দেওয়া হলেও, ৩ অক্টোবর ২০২৪-এ বিচারপতি মোহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার ও বিচারপতি সরদার মো. রাশেদ জাহাঙ্গীরের বেঞ্চ স্বপ্রণোদিতভাবে রায় প্রত্যাহার করে, কারণ বেঞ্চের এক বিচারপতি পূর্বে রাষ্ট্রপক্ষে মামলায় জড়িত ছিলেন। এই রায় প্রত্যাহারের পর মামলার নথি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ইউনূসের শাসনামলেও স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার অব্যাহত রয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার ভাষণে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করলেও বাস্তব চিত্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং বিচারের নামে প্রহসনের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অবনতিশীল পরিস্থিতি মানবাধিকার সংস্থা এবং পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতা ও মব সন্ত্রাস: আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দেশজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। আওয়ামী লীগের কর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনা বেড়েছে। এছাড়া, হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে ঠাকুরগাঁওয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং মন্দিরে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা জামায়াতের সাথে যুক্ত ইসলামপন্থী মবের দ্বারা সংঘটিত বলে অভিযোগ উঠেছে। রংপুরেও একই ধরনের ঘটনায় ১৫টি হিন্দু পরিবারের বাড়ি ভাঙচুর করা হয় এবং অনেকে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
গণপিটুনি ও মব সন্ত্রাস: হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে (জানুয়ারি-জুন) গণপিটুনির ঘটনায় ৬৭ জন নিহত এবং ১১৯ জন আহত হয়েছেন। এই ধরনের মব সন্ত্রাসের ঘটনা আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সামাজিক অস্থিরতার প্রকট প্রমাণ। গণপিটুনির এই প্রবণতা সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে প্রকাশ করে।
হত্যাকাণ্ড: পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) দেশে ১ হাজার ২৪৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০টি, মার্চে ৩১৬টি এবং এপ্রিলে ৩৩৬টি হত্যাকাণ্ড রেকর্ড করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রতি মাসে হত্যার হার বৃদ্ধির একটি ভয়াবহ প্রবণতা নির্দেশ করে।
ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতন: এইচআরএসএস-এর প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪৭৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ২৯২ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৯ হাজার ১০০টি মামলা দায়ের হয়েছে। এই পরিসংখ্যান নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার ভয়াবহতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতাকে তুলে ধরে।
চাঁদাবাজি ও ডাকাতি: চাঁদাবাজি এবং ডাকাতির ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে ১ হাজার ১৩৯টি ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা দায়ের হয়েছে। চাঁদাবাজির ঘটনা স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং অপরাধী চক্রের দ্বারা আরও উৎসাহিত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও বিপন্ন করছে।
বিচারের নামে প্রহসন: বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং নির্বিচারে গ্রেফতারের ঘটনা বেড়েছে। ২০২৪ সালে মানবাধিকারের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায়ই গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়াই ব্যক্তিদের আটক করছে এবং আটক ব্যক্তিদের অবস্থান বা পরিস্থিতি তাদের পরিবার বা আইনজীবীর কাছে প্রকাশ করছে না। এছাড়া, রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে গ্রেফতার অব্যাহত রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে পুলিশ ১০৮ জন এমপি-মন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগের লাখের উপরে নেতাকর্মীকে কারাগারে পাঠিয়েছে।
ভেঙে পড়েছে প্রশাসন
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশের সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনে হস্তক্ষেপের অভিযোগে জনগণের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপরদিকে, প্রশাসনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।
গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে। মেট্রোরেলে আগুন দেওয়া হয়েছে। এরকম অনেক কিছুই করা হয়েছে। তা না হলে সরকারকে উৎখাত করা যেত না।’
সূত্র বলছে, ওই আন্দোলনে প্রায় তিন হাজার পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে পুলিশকে একরকম পুতুল সরকারের পরিণত করেছে সরকার। বাহিনীটির কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে লাঠি। এতে একরকম অসহায় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে পুলিশ। এখন এই বাহিনীর কাছে কোনো অভিযোগ নিয়ে গেলেও তেমন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় না। পুলিশ যেখানে ব্যর্থ সেখানে সেনাবাহিনীকে দিয়ে দেশ পাহারা দেওয়া হচ্ছে। যদিও এই বাহিনী এখন বিশেষ কয়েকটি দলের তাবেদারি করছে। আর তাদের ব্যর্থতাতেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে।
এদিকে সরকার পরিবর্তনের পর সচিবালয় ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি অংশ। প্রশাসনের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এদের বিরুদ্ধে।
সূত্র জানায়, একাধিক এনসিপি নেতা সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়মিত যাতায়াত করছেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন নিয়োগ ও সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে তদবিরে জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরইমধ্যে ওই দুটি সংগঠনের কিছু নেতা-কর্মী অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগও করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সংস্কার কমিশনেও ছাত্র প্রতিনিধিদেরকে বসানো হয়েছে। গত ডিসেম্বরে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের মতবিনিময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে হট্টগোল হয় এক ছাত্র প্রতিনিধির। মতবিনিময়ের একপর্যায়ে ছাত্র প্রতিনিধি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মেহেদী হাসানকে বক্তব্য দিতে বলেন কমিশনের প্রধান। এ সময়ে মেহেদী হাসান বলেন, আমি একটি বিষয়ে খুব আশাহত হয়েছি যে, আপনারা (সাংবাদিক) অনেক কষ্ট করেছেন, অনেক জায়গা থেকে কথা বলেছেন, অনেক ভালো কথা বলেছেন। আপনারা যখন কথা বলছেন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন তখন জনপ্রশাসন সম্পর্কে আপনাদের কিছু বিষয় একটু চিন্তা-ভাবনা করে পড়াশোনা করে আসার দরকার ছিল। সেই জায়গায় একটু ঘাটতি দেখা গেছে।
এ নিয়ে পরে প্রতিক্রিয়া দেখান সাংবাদিকেরা। একজন ব্যক্তি সচিব হতে বেশ কিছু সময় সরকারি চাকরিতে পার করার পর অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে তা হতে হয়। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কাউকে এই সচিবদের সঙ্গে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে তাদের মনোবলও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া বিভিন্ন জেলায় সরকারি কর্মকর্তাদেরকেও এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধীদের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্দেশ অমান্য বা সরকারের সমালোচনা করলে তাদেরকেও শাস্তি পেতে হচ্ছে। এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফেসবুক পোস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সমালোচনা করায় লালমনিরহাটের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাপসী তাবাসসুম ঊর্মিকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এছাড়া এখন সচিবালয়েও হামলার ঘটনা সাধারণ একটি ঘটনা হয়ে গেছে। শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগসহ কয়েকটি দাবিতে সচিবালয়ে কিছু শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করে এবং পরে সেখানে ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ১২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মামলায় হত্যাচেষ্টা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা এবং আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে গত বছরও চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা বাতিল এবং সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে এইচএসসি ফল প্রকাশের দাবিতে সচিবালয়ে ঢুকে পড়ে হাজারো শিক্ষার্থী।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রশাসনিক কাঠামোর এই বেহাল দশা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা দেশকে বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তারা বলছেন, রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ, দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বেহাল দশা গণমাধ্যমে
ভাষণে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিতে আগের সরকারের করা সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং ওই আইনের অধীনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা সব মামলাও বাতিল করা হয়েছে বলে জানান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এখানেও মিথ্যাচার করেছেন ইউনূস।
সাংবাদিকতার এক্রিডিটেশন বাতিল, রাজনৈতিক দল ও সরকারের দিক থেকে নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত, আর ভয়ের প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে প্রশ্ন করতেও ভয় পাচ্ছেন—এসবই নির্দেশ করছে দেশ এখনো “স্বাধীন মিডিয়ার স্বাধীনতা” ফিরে পায়নি।
তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরের মধ্যে ১৬৭ জন সাংবাদিকের এক্রিডিটেশন বাতিল করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। ‘কর্তৃত্ববাদী সরকার পতন-পরবর্তী এক বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক এক প্রতিবেদনে টিআইবি বলেছে, গণমাধ্যম কার্যালয়গুলোতে মব তৈরি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে টিআইবি বলছে, সাংবাদিক, লেখক ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬৬ জনকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান–সংক্রান্ত হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছে। তিনজন সাংবাদিক দায়িত্ব পালনকালে হামলায় নিহত হয়েছেন (আগস্ট ২০২৪ থেকে জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত)।
টিআইবি বলছে, এ পর্যন্ত ২৪ জনের বেশি গণমাধ্যমকর্মীকে পদ থেকে অপসারণ করা হয়েছে; ৮টি সংবাদপত্রের সম্পাদক এবং ১১টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের বার্তা প্রধানকে বরখাস্ত করা হয়েছে এবং অন্তত ১৫০ জন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। গণমাধ্যম কার্যালয়গুলোতে মব তৈরি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও টিআইবির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। টিআইবি তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়নি।
বুধবার দুপুরে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: অভিযোগ নিষ্পত্তি ও স্বনিয়ন্ত্রণের বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক আলোচনায় দৈনিক মানবজমিনের সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, আমি ভীত, চিন্তিত। সাংবাদিকরা দৌঁড়ের উপরে আছেন। অনেক সাংবাদিক মামলার শিকার, অনেকে দেশ ছেড়েছেন। অনেক সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন। সবাই বলছেন ১৬ বছরের কথা। ৫৪ বছরই তো একই অবস্থা দেখেছি। এখন বলা হচ্ছে সাংবাদিকতা মুক্ত। বাস্তবতা হল, পক্ষে গেলে মুক্ত, বিপক্ষে গেলেই মব ভায়োলেন্স।
ভাষণে ইউনূস জানান, গত ১৬ বছরে দেশ থেকে পাচার হওয়া বিপুল অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবস্থাপনাকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশের প্রকৃত চিত্র বলছে, এখনও দেশগুলর ব্যাংকে অর্থের সংকট রয়েছে। সেইসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরেও দুর্নীতি এখন চরমে। এক সময় এ দুর্নীতি কর্মকর্তাদের মধ্যে থাকলেও এখন তা শ্রমিক পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। ফলে দেশে অবৈধ পণ্য আমদানি এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ।
ভাষণে ইউনূস জানান, ঐক্যমতের ভিত্তিতে অচিরেই রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবে এবং এর বাস্তবায়নেও ঐকমত্যে পৌঁছাবে। এ নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জুলাই ঘোষণাপত্রে পরবর্তী নির্বাচিত সংসদের মাধ্যমে এটির বাস্তবায়নের কথা বলেছেন। এটি আইনি এবং এর বাইরে কোনো প্রক্রিয়ার কথা আমাদের জানা নেই।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী মনে করে, অন্তরবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ঘোষিত জুলাই ঘোষণাপত্রে জন–আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন হয়নি। একই সঙ্গে জুলাই সনদের ভিত্তিতে আগামী জাতীয় নির্বাচন হতে হবে বলে জানিয়েছে দলটি। এই দুটো কথার মধ্যেই বোঝা যাচ্ছে এ নিয়ে ঐক্যমত এখনও আসেনি। তারপরও মিথ্যাচার করেই যাচ্ছেন ইউনূস।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, এখন থেকে আমাদের অংশের বঙ্গোপসাগরকে আমরা আমাদের দেশের মূল্যবান অংশ, একথা সবসময় মাথায় রেখে অগ্রসর হব। এই অংশের পানির ওপর দিয়ে দেশ-বিদেশের সঙ্গে আমরা বাণিজ্য করব। তার মাধ্যমে আমরা পুরো পৃথিবীকে আমাদের প্রতিবেশি বানাব।
মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই পানির মধ্যে আছে অফুরন্ত সম্পদ; মৎস্য সম্পদ, যা প্রতি বছর ফসল দেয়। এই পানির নিচে আছে অফুরন্ত গ্যাস। এর সবকিছুকে নিয়েই প্রতিনিয়ত আমাদের চিন্তা-ভাবনাকে চালিত করতে হবে।
এসব কথাও মিথ্যাচার। সূত্র বলছে, চীনের আধিপত্য কমানো বঙ্গোপসাগরের প্রাকৃতিক সম্পদ হাতানোর পরিকল্পনা আমেরিকার বহুদিনের। এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি একটি নীলনকশার অংশ, যার লক্ষ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাদের আধিপত্য বিস্তার। জাতিসংঘের অফিসের মাধ্যমে ‘মানবাধিকার’ ইস্যুকে সামনে রেখে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকে ব্যাহত করা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করা হতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মিয়ানমারে চীন-সমর্থিত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থান নিতে সক্রিয় হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট, মানবিক করিডোর, এবং চট্টগ্রাম বন্দর—সব মিলে এই অঞ্চলটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। সেইসঙ্গে বঙ্গোপসাগরে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদও উত্তোলন করতে চায় দেশটি।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে একটি “খ্রিস্টান রাজ্য” গঠনের ষড়যন্ত্রের আশঙ্কাও করা হচ্ছে, যা পূর্ব তিমুরের ঘটনার সাথে তুলনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর আগেও সতর্ক করে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে । তিনি সেন্টমার্টিনে মার্কিনিরা ঘাঁটি করতে চায় সেই কথাও জানিয়েছিলেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণে যেভাবে দেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করা হয়েছে, বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরছে। অর্থনীতি যেখানে চরম চাপের মধ্যে, বেকারত্ব বাড়ছে, বিনিয়োগ কমছে—সেখানে 'গতিশীলতা'র কথা বলা জনবিচ্ছিন্ন বক্তব্য মনে হয়।
তাছাড়া, তার নিজের প্রতিষ্ঠানের বিশেষ সুবিধা পাওয়া, ঘনিষ্ঠদের উচ্চপদে বসানো, এবং মামলা খারিজের ঘটনা তার দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিয়ে যেসব ইতিবাচক কথা বলা হয়েছে, পরিসংখ্যান ও বাস্তব ঘটনা তা সমর্থন করে না।সব মিলিয়ে বলা যায়, এই ভাষণটি একটি আদর্শিক প্রচেষ্টা হলেও বাস্তব অবস্থা বিবেচনায় এটি অনেকাংশে অমূলক এবং জনগণের আস্থার জায়গা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।