
নিজস্ব প্রতিবেদক
গত বছর আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসকে বরণ করে নেয় কোটি কোটি বাংলাদেশি। সঙ্কটে পড়া বাংলাদেশ তখন এই ক্ষুদ্রঋণের জনকের কাছ থেকে একটি আশার পরিবর্তনের প্রত্যাশা করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবে পরিচিত ইউনূস সেই সুযোগটি লুফে নেন। অনেকের চোখে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের ‘ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট’—যিনি ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর আমেরিকাকে সঙ্কট থেকে টেনে তুলেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই অর্থনীতি অধ্যাপক বিচার বিভাগ, পুলিশ, অর্থ ও প্রশাসন সংস্কারের ঘোষণা দেন।
‘গরিবের ব্যাংকার’ হিসেবে পরিচিত ইউনুস প্রতিশ্রুতি দেন—তিনি দেশের অর্থনীতিকে চাঙা করবেন এবং “হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে” গড়ে ওঠা “দুর্নীতিপূর্ণ নেটওয়ার্ক” ধ্বংস করবেন।
বিশ্ব, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলো—যারা সাধারণত এই উপমহাদেশের বাস্তবতা সম্পর্কে উদাসীন—ইউনূসকে একজন ত্রাণকর্তা হিসেবে দেখেছিল। গত বছরের ৮ আগস্ট তিনি প্যারিস থেকে উড়ে এসে ঢাকা শহরের নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করেন।
কিন্তু এখন আগস্ট ২০২৫। সেই উচ্ছ্বাস অনেকটাই মিলিয়ে গেছে। এখন সাধারণ মানুষ প্রকাশ্যে ইউনূস ও তাঁর সরকারের প্রতি তীব্র বিরক্তি প্রকাশ করছে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—বাংলাদেশের কিছু সুশীল ব্যক্তি, যারা এক বছর আগেও ইউনূসের প্রশংসা করতেন, এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন সুরে কথা বলছেন। এক প্রবীণ সাংবাদিকের ভাষায়, এরা ‘ বাতাস দেখেই পথ চলে’।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় অর্থনীতিবিদ ও সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিড)-এর ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কথা। গত বছর ইউনূস তাঁকে জাতীয় অর্থনীতির ওপর একটি শ্বেতপত্র তৈরির দায়িত্ব দেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে অর্থনীতিতে পিএইচডি করা এই ব্যক্তি কয়েক মাস আগেও হাসিনার শাসনে বাংলাদেশ কীভাবে ‘ঘনিষ্ঠ পুঁজিবাদ’ থেকে ‘লুটপাটতন্ত্রে’ পরিণত হয়েছিল, তা তুলে ধরছিলেন।
তবে এখন তিনি নতুন সরকারের ব্যর্থতা নিয়েই বেশি কথা বলছেন। গত সপ্তাহে তিনি বলেন, এখন সময় হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি স্পষ্ট “এক্সিট পলিসি” বা সরে দাঁড়ানোর রূপরেখা ঠিক করার। এ ধরনের নাটকীয় অবস্থান পরিবর্তন এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় খুব সাধারণ হয়ে গেছে। অধিকাংশ মানুষ এই মনোভাব বদলের জন্য ইউনূস এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের দায়ী করছেন। এই প্রেক্ষাপটে, মুহাম্মদ ইউনূসসের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনের কারণগুলো বিশ্লেষণ করা এখন সময়ের দাবি।
১. ভেঙে পড়েছে অর্থনীতি
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার একটি বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করে। সম্মেলনে ২০৩৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক এবং বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতিতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তিন দিনব্যাপী সেই সম্মেলনের পর চীন থেকে ১৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি এবং বিপুল কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো নানা দাবি করা হয়।
কিন্তু এসব দাবি এবং অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পূর্বের প্রতিশ্রুতিগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। কারণ, বাংলাদেশ বর্তমানে এক নজিরবিহীন অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে শেখ হাসিনার শাসনামলে দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল উল্লেখযোগ্য।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের ঘাটতি সাধারণ মানুষের জীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। দেশের ব্যাংকিং খাত প্রায় ধসের মুখে, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৩ লাখ কোটি টাকা , যা মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ইউনূস সরকারের ব্যর্থ ব্যবস্থাপনার কারণে ভবিষ্যৎ খুব একটা আশাব্যঞ্জক দেখাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৩ শতাংশে নামিয়ে এনেছে, যেখানে ২০২৪ সালের অক্টোবরে তাদের পূর্বাভাস ছিল ৪.১ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) একই অর্থবছরের জন্য তাদের প্রবৃদ্ধি পূর্বাভাস ৪.৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩.৭ শতাংশ করেছে।
২. গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ
২০২৪ সালের আগস্টে ঢাকায় ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ওপর শুরু হয় পরিকল্পিত ও সংগঠিত দমন-পীড়ন। যদিও মুহাম্মদ ইউনুস প্রকাশ্যে সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “ইচ্ছামতো লিখুন, সমালোচনা করুন। আপনারা না লিখলে আমরা জানব কীভাবে কী ঘটছে বা ঘটছে না?”
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ১৮২ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে, প্রায় ২০৬ জনকে সহিংসতার মামলায় জড়ানো হয়েছে, ১৬৭ জন সাংবাদিকের অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করা হয়েছে, এবং ৮৫ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, যা সরকারের সন্ত্রাসবিরোধী ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধকারী সংস্থা।
ব্যবস্থাটি এতটাই দমনমূলক যে মুজাম্মেল বাবু, শ্যামল দত্ত, ফারজানা রূপা ও শাকিল আহমেদের মতো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকেরা প্রায় ১১ মাস ধরে সাজানো হত্যা মামলায় কারাগারে থাকলেও তাঁদের জামিন আবেদন পর্যন্ত শুনানির জন্য গ্রহণ করা হচ্ছে না।
এক প্রবীণ সাংবাদিক বলেন, “সাংবাদিকতার স্বাধীনতা দীর্ঘদিন ধরেই হুমকির মুখে, কিন্তু এমনটা আগে কখনো হয়নি... এখন সাংবাদিকেরা যেন দেশের প্রিয় টার্গেট। তথাকথিত ছাত্র বিপ্লবীদের এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যেন তারা যেকোনো মানুষকে হয়রানি করতে পারে। ফলে গণমাধ্যমগুলো এখন আত্মনিয়ন্ত্রণ (সেলফ-সেন্সরশিপ) অবলম্বন করছে, যাতে সরকার এবং কুখ্যাত ছাত্র নজরদারদের দৃষ্টিতে ভালো থাকে।”
৩. চাঁদাবাজির সংস্কৃতি
দীর্ঘদিন ধরে মুহাম্মদ ইউনূসের সমর্থক হিসেবে পরিচিত দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার সম্প্রতি এক সম্পাদকীয়তে সারাদেশে চাঁদাবাজির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা নিয়ে যে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তা থেকেই বোঝা যায় পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক।
উক্ত মন্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে ঢাকা মিটফোর্ড এলাকায় ভাঙারি ব্যবসায়ী লালচাঁদ ওরফে সোহাগকে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দ্বারা নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা। সেখানে আরও তুলে ধরা হয়েছে ‘ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ সংগঠনের নেতা আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদের ঘটনা, যিনি এক সাবেক এমপির পরিবারকে চাঁদা দিতে বাধ্য করেন এবং আরেক সাবেক এমপিকে কোটি কোটি টাকার চেক সই করতে চাপ দেন।
তবে এই দুটি ঘটনা আসলে বৃহত্তর বাস্তবতার ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। বাংলাদেশে এখন চাঁদাবাজি যেন এক প্রকার সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া কিছু ছাত্রনেতা কয়েক মাসের মধ্যেই কোটিপতি হয়ে উঠেছেন।
স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভাবে চাঁদাবাজির অর্থনীতি যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা দেখে কিছু বিশ্লেষক ব্যঙ্গ করে বলেছেন—সরকারের উচিত এখন একটি জাতীয় চাঁদাবাজি উন্নয়ন নীতি ঘোষণা করা।
৪. মব সন্ত্রাসের বিস্তার
বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা প্রতিষ্ঠান আইন ও সালিশ কেন্দ্র সম্প্রতি একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যার তথ্য অনুযায়ী ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২৩ জুন পর্যন্ত অন্তত ১৭৯ জন মানুষ গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন।
গত বছরের জুলাই ও আগস্টের পুলিশের ওপর হত্যাকাণ্ড হয়। এরপর পুলিশের উদাসীনতার কারণে সন্ত্রাসীদের ছেড়ে দেওয়ায় মব সন্ত্রাস প্রবণতা এই পর্যায়ে পৌঁছেছে । একদল সন্ত্রাসী একজন প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ওপরও (যিনি একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন) হামলা চালাতে সক্ষম হয়েছে।
কেএম নুরুল হুদার ওপর হামলার পর ৩০ জন বিশিষ্ট নাগরিক যৌথ বিবৃতিতে দেশের মব সন্ত্রাস নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এই ধরনের অরাজকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইউনূশের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি-৩২ নম্বর বাড়ি পর্যন্ত পোড়ানো হয়েছে মব সন্ত্রাসের হাতে, সেই সময়ই উপস্থিত ছিলেন পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও।
৫. শিক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত
গত বছরের ‘হাসিনা বিরোধী’ আন্দোলনের প্রভাবে উঠে আসা ২০-৩০ বছরের তরুণ নতুন প্রজন্মের নেতা এখন বাংলাদেশে ক্ষমতা গ্রহণ করেছে । তারা শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করছে, তাদের কারণে পরবর্তী শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একজন অধ্যাপক বলেন, ছাত্রনেতাদের হঠাৎ জাতীয় নেতা ও নীতিনির্ধারক হিসেবে আবির্ভাব শিক্ষা ও উৎকর্ষতার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
তিনি বলেন, “আমাদের শেখানো হতো যে একাডেমিক উৎকর্ষতা হলো সফলতার চাবিকাঠি... নতুন প্রজন্মের নেতারা এই নীতিকে উল্টে দিয়েছেন, কারণ তারা সহিংস সড়ক প্রতিবাদের নেতৃত্ব দিয়ে শীর্ষে পৌঁছেছেন। তারা সহিংসতাকে মহিমা দিচ্ছে, অস্ত্র বহন করছে এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছে।”
তিনি আরও বলেন, “কিছু প্রধান ছাত্র সমন্বয়কারীর তো কলেজ পাশও হয়নি। তারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য খারাপ উদাহরণ। ইউনূসকে দায়ী করা উচিত বাঙালি সংস্কৃতি ধ্বংসের জন্য, যেখানে একাডেমিক কার্যক্রম সব সময় সম্মানিত ছিল।”
তার পাশাপাশি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত অস্থিরতা ও যেকোনো অজুহাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ছায়া ফেলেছে।
৬. নারীরা অবহেলিত
বাংলাদেশে নারীদের কর্মজীবনে ব্যাপক অংশগ্রহণের দিনগুলো এখন অতীত। ঢাকায় ক্ষমতার পরিবর্তনের পর থেকে নারীদের ওপর ঘটে চলা নির্যাতনের ঘটনা বিশ্বজুড়ে দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে উঠেছে, কারণ দেশে নারীদের বিরুদ্ধে অপরাধের সংখ্যা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইসলামপন্থী উগ্রবাদীরা বিক্ষোভের সময় ইসলামপন্থী উগ্রবাদীদের একটি নারীর পুতুল উলঙ্গ করে জুতোর মারধর করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনের মতে, চলতি বছরের ২০ জুন থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত দেশে ২৪টিরও বেশি ধর্ষণের মামলা দায়ের হয়েছে। ইউনূস সরকারের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোও এই যৌন সহিংসতাকে “মহামারী-সদৃশ সংকট” হিসেবে বর্ণনা করেছে।
৭. সংখ্যালঘুরা দিশাহারা
২০২৪ সালের আগস্টে হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার সংখ্যা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অবস্থান নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। চলতি বছরের জুন মাসে কুমিল্লা এলাকায় একজন বিবাহিত হিন্দু মহিলার নির্মম ধর্ষণ ও জনসমক্ষে অপমানের ঘটনা দেশটিতে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা সামনে নিয়ে এসেছে। গত কয়েক মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্মম হামলার ঘটনা এবং মন্দিরে হামলার ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
৮. জঙ্গি কার্যক্রম বেড়েছে
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে লুকিয়ে থাকা ইসলামিক উগ্রবাদ এখন জনসমক্ষে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আগস্ট ২০২৪ থেকে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গত আগস্ট মাসে আল কায়েদা-সংশ্লিষ্ট জঙ্গি গোষ্ঠী এবিটি (আল বদর ট্রাস্ট) প্রধান মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানি ও তার সহযোগীদের মধ্যে অনেকেই মুক্তি পেয়েছেন।
এছাড়া নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরির এখন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি শেখ হাসিনা সরকার পতনের সঙ্গেও জড়িত ছিল এছাড়াও রিপোর্ট এসেছে যে, জামায়াতে মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বৃদ্ধি করেছে, যা উপমহাদেশের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
এদিকে, ১৪ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীও আছেন, যাদের মধ্যে উগ্রবাদে প্ররোচিত হওয়া এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সদস্যতায় আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর অর্থ হলো ইউনূস সরকার ইসলামী উগ্রবাদীদের শক্তিশালী করার জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে।
৯. ইতিহাসের পুনঃলিখন
অস্থায়ী সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের ‘জাতির পিতা’ পদবি তুলে দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের বর্ণনা থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে।
ইউনূস বঙ্গবন্ধু ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত আটটি জাতীয় ছুটি বাতিল করেছেন। তার ঘনিষ্টদের একটি পরিকল্পনা অনুসারে ২০২৪ সালকে ১৯৭১ সালের বিপরীতে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যা দেশের ইতিহাস পুনঃলিখনের সুক্ষ্ম পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।
ইউনূস সরকারের অধীনে বাংলাদেশে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী এটিএম আজহারুল ইসলাম মুক্তি পেয়েছেন এবং জামায়াত-শিবিরের হামলা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের রায়বিরোধী বিক্ষোভে।
মে ২৭ তারিখ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডেমোক্রেটিক স্টুডেন্ট অ্যালায়েন্সের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ উগ্র ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে প্রদর্শিত হয়। সেখান হামলার ঘটনা ঘটে। এর প্রতিবাদে ২৮ মে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আরও শাহবাগবিরোধী মঞ্চের ব্যানারে একটি বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও উগ্র ইসলামপন্থীরা হামলা চালায়।
১০. মেধাবীরা দেশ ছাড়ছে
এই পরিস্থিতিতে, বাংলাদেশের উজ্জ্বল তরুণ মেধাবীরা দেশের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে—যদিও বেশ কিছু দেশ হঠাৎ ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে—কারণ তাদের অধিকাংশের চোখে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগ (এফডিআই) ১০৪.৩৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা অন্তত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কথা তো বাদই দেন, দেশি বিনিয়োগকারীরাও রাজনীতি অস্থিরতা, শ্রমিক আন্দোলন এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দেশের মধ্যে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী নয়।
একজন এইচএসসি পরীক্ষার্থী বলেন, “আমি চাঁদাবাজ হতে পারি না... এই দেশে আমার কোন আশা নেই। আমি আমার প্লাস টু শেষ করে ইংল্যান্ড চলে যাব।”
ছেলেটির মা, যিনি ইউনুস বিরোধী একটি দলের নেতা, বলেন তিনি শুধু ক্যারিয়ার সুযোগের সংকটে নয়, সন্তানের নিরাপত্তার কারণে তার দাবি মেনে নিয়েছেন। “বাংলাদেশ এখন নিরাপদ নয়... যদি টিউশনি থেকে ফেরাতে দেরি হয়, তখন আমার হার্ট রেস করতে শুরু করে,” তিনি বলেন।
১১. কূটনীতি ক্ষতিগ্রস্ত
ইউনূস বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তিত্ব হলেও, তার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো সম্পর্কে তার মন্তব্যের কারণে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সেবাকর্মীদের মুখ লজ্জার সম্মুখীন হতে হয়েছে, এবং প্রতিবেশী দেশের বিষয়ে তার ঘনিষ্টদের অবাঞ্চিত মন্তব্য রোধে ব্যর্থতার কারণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
যদিও ইউনুস সরকার ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ঢাকাকে জুন মাসে বড় ধরনের কূটনৈতিক অপমানের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ঢাকার এক সূত্র জানিয়েছে, "তার তথাকথিত ইংল্যান্ড রাষ্ট্র সফর ছিল একটি বড় ভুল, কারণ কিয়ার স্টারমারের সঙ্গে তার সাক্ষাতের আবেদন অবহেলিত হয়েছে.. এটি একটি বড় লজ্জার বিষয়।
১২. প্রোপাগান্ডার সংস্কৃতি
ইউনূস সরকারের নীতি হলো নিজেদের ভুল স্বীকার করতে অস্বীকার এবং তা থেকে শেখার বদলে ভুল ঢাকানোর চেষ্টা করা। ভুল স্বীকার করার পরিবর্তে তারা নাজি জার্মানির প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী জোসেফ গোবেলসের কৌশল অনুসরণ করছে।
সুতরাং,মবকে বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, হিন্দুদের ওপর আক্রমণকে অবমূল্যায়িত আওয়ামী লীগের ওপর আক্রমণ হিসেবে দেখানো হয়, এবং নারীদের ওপর নির্যাতনকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে তোলা হয়।
ইউনূসের সহযোগীরা অর্থনৈতিক ভুল, আইনশৃঙ্খলার অভাব ও জঙ্গি শক্তির উত্থানকে বিদেশি মিডিয়ার প্রোপাগান্ডা হিসেবে নস্যাৎ করে দেন। এই ধরনের প্রতারণা হয়তো কয়েক মাসের জন্য মনোযোগ সরাতে পারে, কিন্তু এতে কোনও সন্দেহ নেই যে ব্যাংকার ইউনুসের সুনাম ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।