
নিজস্ব প্রতিবেদক
চলতি মাসেই মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তবে এই সফর নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে মালয়েশিয়ায় থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের মাঝে। ইউনূসের এই সফরের আগে বাংলাদেশিদের বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া সরকার।
অনেকের আশঙ্কা, এই সফরের পর মালয়েশিয়াও শ্রমবাজার সংকোচনের পথে যেতে পারে, যেমনটি অতীতে একাধিক দেশে সফরের পর ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত জুনে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক নিরাপত্তা অভিযানে ৩৬ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে একটি উগ্রপন্থী জঙ্গি আন্দোলনে যুক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এরপর বাংলাদেশিদের প্রতি মালয়েশিয়া সরকারও আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
মূলত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ওই সময় মালয়েশিয়ার প্রচেষ্টাকে মিথ্যা বলে প্রচার চালানো হয়। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ও তথ্যমন্ত্রী মাহফুজ আলম দাবি করেন, “দেশে কোনো জঙ্গি উত্থান ঘটেনি” এবং “চরমপন্থার সুযোগ দেওয়া হবে না।” কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাস্তবতা এই দাবির সঙ্গে মেলে না।
এমন পরিস্থিতিতে গত মঙ্গলবার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আবারও ২৬ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠিয়েছে মালয়েশিয়া। এর আগে গত ২৬ জুলাই মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৮০ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়। নিরাপত্তা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হতে না পারায় তাঁদের মালয়েশিয়ায় প্রবেশে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এর কয়েক দিন আগে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমাতে যাওয়া ১২৩ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে মালয়েশিয়ার দেশটির কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ৪৫ বাংলাদেশিকে ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
কথা ছিল ইউনূস দেশকে নিয়ে যাবেন একটি নতুন সম্ভাবনার পথে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পর শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিজেই অনেক প্রশ্নে প্রশ্নবিদ্ধ। তাকে নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে আর এই বিতর্কগুলো তিনি নিজেই সৃষ্টি করছেন। তিনি নিজের স্বার্থ যতটুকু দেখছেন, জনগণের স্বার্থ ততটা দেখছেন না—এমন অভিযোগ অনেকের।
সরকারের দায়সারা বক্তব্য
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় যে মানুষগুলোকে গ্রেফতার করা হযেছে, তারা সবাই জঙ্গি নয়, এটি প্রমাণিত। যদি জঙ্গি হতো, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ হতো এবং ছেড়ে দিতো না। অনেককে তারা ছেড়ে দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ’যাদের ফেরত পাঠানো হয়েছে তাদের মূল কারণ হচ্ছে অনিয়মিত কাগজপত্র। ভিসা শেষ হয়ে গেছে বা এরকম কিছু। আমরা এটিতে আপত্তি করতে পারি না। কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা আমলে নিয়েছে। আমরা তাদের কাছে সব ধরনের তথ্য চেয়েছি এবং এটি খুব গুরুত্বের সঙ্গে নিই। আমরা সন্ত্রাসবাদকে টলারেট করি না। আমরা জানিয়েছি, তোমাদের সম্পূর্ণভাবে সহযোগিতা করতে চাই এবং আমরা চাই তোমরাও আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করো। আমরা দুই দিকেই তদন্ত করবো।’
বিমানবন্দরে হয়রানি বেড়েছে প্রবাসীদের
বিদেশে শ্রম দিয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা প্রবাসীরা দেশে ফিরেই পড়ছেন বিড়ম্বনায়। বিমানবন্দরে তাঁদের অনেককেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসৌজন্যমূলক আচরণ ও অপ্রয়োজনীয় হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি এই অভিযোগের মাত্রা বেড়েছে বলেই জানান সংশ্লিষ্টরা।
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরসহ দেশের অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন, কাস্টমস বা বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের দ্বারা প্রবাসীরা অপমানজনক ব্যবহার, লাগেজ তল্লাশির নামে সময়ক্ষেপণ এবং সন্দেহভাজন হিসেবে দেখার অভিযোগ তুলছেন।
সৌদি আরব থেকে আসা মো. শামীম (৩৮) নামের এক প্রবাসী বলেন, ‘১৪ ঘণ্টা ফ্লাইট শেষে ঢাকায় নেমেছি। লাগেজ নিতে প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা, এরপর কাস্টমসে আমাকে ঘন্টাখানেক দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। আমার ব্যাগ ঘেঁটে এমনভাবে দেখল, যেন আমি কিছু চুরি করে এনেছি। ভাবটা এমন, যেন আমরা অপরাধী।’
আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নাসির উদ্দিন আহমেদ দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, ‘বিমানবন্দর হলো দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার। প্রবাসীরা কোনো অপরাধ না করেই যদি হয়রানির শিকার হন, সেটি শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত অপমান নয়, বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বহীনতারও প্রতিফলন।’
এক প্রবাসী বলেন, ‘বিমানবন্দরে কেউ আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করলে মনটা ভরে যায়। কিন্তু বেশিরভাগ সময় আমরা অপমানিত হই। দেশে আসা মানেই যেন জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড়ানো।’
শ্রমবাজারে নতুন সিন্ডিকেট
বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতটি বর্তমানে এক নতুন সিন্ডিকেটের চাপে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সহচর লামিয়া মোর্শেদ, যিনি বর্তমানে এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক পদে রয়েছেন। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে একটি স্পর্শকাতর ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে এমন একজন ব্যক্তি অধিষ্ঠিত হলেন, যার দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে রয়েছে বিস্তর প্রশ্ন।
সূত্র মতে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থে বারবার বিদেশ সফরে যাচ্ছেন ড. ইউনূস। যদিও এসব সফর মূলত ব্যক্তিগত বলে ধারণা করা হয়, তবে প্রত্যেক সফরে তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্ত হচ্ছেন লামিয়া মোর্শেদ। বহুল আলোচিত লন্ডন সফর এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে প্লেনভর্তি সঙ্গী নিয়ে তিনি অংশ নেন। এ পর্যন্ত ইউনূসের কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি সফরে অনুপস্থিত ছিলেন না লামিয়া।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর থেকেই ইউনূস তার নিকটজনদের রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে থাকেন। তারই ধারাবাহিকতায় ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোর্শেদকে নিয়োগ দেওয়া হয় এসডিজি মুখ্য সমন্বয়ক হিসেবে। অথচ এসডিজি বাস্তবায়নে তাঁর কোনো উল্লেখযোগ্য দক্ষতা বা অভিজ্ঞতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস: একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার?
সাম্প্রতিক সময়ে জনশক্তি রপ্তানির অনুমোদন পেয়েছে ড. ইউনূসের মালিকানাধীন গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেস লিমিটেড (GESL)। প্রতিষ্ঠানটি ২০০৯ সালেই লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছিল, যা তখনই বাতিল হয়। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে হঠাৎ করেই জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে অনুমোদন পায় প্রতিষ্ঠানটি।
এই অনুমোদনের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব ও লবিংয়ের অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ করে ড. ইউনূস ও লামিয়া মোর্শেদের প্রভাব ব্যবহারের প্রসঙ্গ নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি জনশক্তি রপ্তানির নামে মূলত সিন্ডিকেট ব্যবসায় যুক্ত এবং দেশের অন্যান্য এজেন্সিগুলিকে বাজার থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
বিএমইটির এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা, সিন্ডিকেট রাজত্ব এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণে বিগত এক বছরে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি প্রায় ৩০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
তিনি বলেন, “এখন শ্রমবাজারে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় লিপ্ত ইউনূসের ঘনিষ্ঠরা। লামিয়া মোর্শেদকে সামনে রেখে একটি শক্তিশালী চক্র গড়ে উঠেছে যারা সরকারি সফরের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বৈদেশিক জনশক্তি বাজারে প্রভাব বিস্তার করছে।”
ক্ষমতা নেওয়ার পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১০ বার বিদেশ সফর করেছেন। বিশ্বের উন্নত দেশ, যারা বিশ্বকূটনীতিতে নেতৃত্ব দেন তারা ও ১০ মাসে এতবার বিদেশ সফর করেননি। সে ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা নিঃসন্দেহে একটি অনন্য রেকর্ড স্থাপন করেছেন। কিন্তু এসব সফরে বাংলাদেশ কতটুকু লাভবান হয়েছে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। এই সময়ে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা বন্ধ হয়ে গেছে। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ করেছে। এমনকি থাইল্যান্ডের ভিসা যেন এখন সোনার হরিণ। ড. মুহাম্মদ ইউনূস দিল্লি থেকে ইউরোপের দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বাংলাদেশ থেকেই যেন তাঁরা ভিসা ও আনুষঙ্গিক কার্যক্রম চালান সেই অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ওই অনুরোধে কেউ সাড়া দেননি। বরং ইউরোপের ভিসা এখন বন্ধের উপক্রম হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব খাটানোর প্রবণতা শ্রমবাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে এর ফলাফল হতে পারে ভয়াবহ। এতে উদ্যোক্তারা যেমন আস্থা হারাচ্ছেন, তেমনি দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই প্রবণতা শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং অর্থনৈতিক ও নীতিগতভাবে ভয়াবহ। শ্রমবাজারে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর আস্থা হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা।
অর্থনীতিবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভবিষ্যতে শ্রমবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে। দেশের অন্যান্য বৈধ জনশক্তি রপ্তানিকারক এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একইসাথে সরকারি পদ ব্যবহার করে বেসরকারি স্বার্থ চরিতার্থ করার বিষয়টি গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।
একজন বিশ্লেষক বলেন, “যদি এই সিন্ডিকেটিক নিয়ন্ত্রণ চলতেই থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে জনশক্তি রপ্তানিতে স্বচ্ছতা থাকবে না। ইউনূসের প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা বা সাহস কেউ দেখাতে পারবে না, কারণ রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে তিনি একজন অপ্রতিরোধ্য ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।