
নিজস্ব প্রতিবেদক
একের পর এক বিতর্ক, অভিযোগ আর সমালোচনায় যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। মুরাদনগরে ট্রিপল মার্ডার, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি-মোট কথা ক্ষমতায় থেকে প্রায় সবধরনের অপকর্মই করেই যাচ্ছেন তিনি। এগুলো প্রমাণিতও হচ্ছে। তবে এর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।
সম্প্রতি জাতীয় দৈনিক আমার দেশের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের সব উপজেলায় মিনি স্টেডিয়াম নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। শেখ রাসেলের নামে এই স্থাপনা বানাতে প্রথম পর্যায়ে প্রতিটির পেছনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫১ লাখ টাকা।
গতকাল রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় সব উপদেষ্টার আপত্তি সত্ত্বেও প্রকল্পটি পাস করিয়ে নিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। আর এই প্রকল্পটির এখনকার ব্যয় ১৪ কোটি টাকা।
বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি না থাকায় একনেক সভায় অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, ব্যয় বেশি হওয়ায় সব উপদেষ্টাই প্রকল্পটি অনুমোদনের বিপক্ষে ছিলেন, কিন্তু উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের একক অনুরোধ ও জোর প্রচেষ্টায় এটি অনুমোদন দেন প্রধান উপদেষ্টা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংবাদিক মঞ্জুরুল আলম পান্না বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একার সিদ্ধান্তে সরকারের একটি প্রকল্প থেকে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ১২০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে নিয়েছে।’
তিনি বলেছেন, তাকে নিয়ে কাহিনির যেন শেষ নেই। একের পর এক গুরুতর অভিযোগ, নানা ধরনের গল্প আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হচ্ছে। আর নির্দ্বিধায় এটুকু বলা যায়, তার বিরুদ্ধে আরো নানা ধরনের অভিযোগ আমাদের সামনে আসবে। এটুকু চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাস্যরস, আলোচনা, সমালোচনা কিংবা ট্রলের ঘটনা ঘটে চলেছে। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্য ঘিরে রাষ্ট্রের উচ্চ পদে থাকা ব্যক্তিদের সুযোগ-সুবিধা বা বেতন-ভাতার বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।
আওয়ামী লীগের সাবেক একজন সংসদ সদস্যের বাসায় চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া জানে আলম অপু সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায়আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। সেই অভিযোগের ব্যাপারে সম্প্রতি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। যেখানে রাতের খাবার খেতে মাঝে-মধ্যে ঢাকায় পূর্বাচলের তিনশ ফিট সংলগ্ন নীলা মার্কেটে অথবা গুলশান এলাকার অভিজাত ওয়েস্টিন হোটেলে যাওয়ার কথা বলেন সজীব ভুঁইয়া।
গত ২৯ জুন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার সঙ্গে থাকা একটি ব্যাগে অ্যামোনেশন ম্যাগজিন পাওয়া যায়। শনাক্তের পর ব্যাগ থেকে ম্যাগজিনটি বের করে তিনি তার প্রোটোকল অফিসারের কাছে জমা দেন।
চলতি মাসের শুরুতে নড়াইলের কালিয়ায় সেনাবাহিনী সোহান মোল্যা (২৬) নামের এক শিক্ষার্থীর ঘর থেকে একটি উন্নত মানের স্নাইপার নাইট্রো রাইফেল উদ্ধার করে। সেই রাইফেলের ব্যবহার জুলাই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, এমনটিও জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। এমন প্রেক্ষাপটে আসিফ মাহমুদের ব্যাগ থেকে অ্যামোনেশন ম্যাগাজিন উদ্ধারের বিষয়টি নিছক 'ভুল' নাকি এর পেছনে গভীর কোনো সংযোগ ছিল তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যেকোনো সরকারের উপদেষ্টার বিরুদ্ধে যদি লাগাতার অভিযোগ আসে—তা সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন হোক কিংবা প্রশাসনিক অসদাচরণ—তাহলে সেই অভিযোগ যথাযথভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ উপদেষ্টারা নীতিনির্ধারণে সরাসরি না থাকলেও প্রভাব বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
কুমিল্লার মুরাদনগরে মা-ছেলে-মেয়েকে হত্যার নির্দেশদাতা অভিযোগ করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার বাবা বিল্লাল মাস্টারকে গ্রেপ্তারের দাবি তোলা হয়েছে।
আসিফের সঙ্গে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীর ও শিবির সম্পর্কের খবর নতুন নয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী জুলকারনাইন তার ফেসবুক জানান, নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বর্তমান প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। আর এই এজাজকে নিয়োগ দিয়েছিলেন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদই। এজাজ ছাত্র জীবনে ইসলামি ছাত্র শিবিরের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন, ২০০২ সাল থেকে হিজবুত তাহরীরের সাথে জড়িত হন।
অপরদিকে আসিফের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে গত এপ্রিল মাসে কুমিল্লার মুরাদনগরে বিক্ষোভ মিছিল হয়। ওই মিছিলে পুলিশ বাধাও দেয়। এ সময় বক্তারা বলেন, ‘তারা আন্দোলন করেছিলেন বাক্স্বাধীনতার জন্য; কিন্তু মুরাদনগরে তারা তা দেখতে পাচ্ছেন না।
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঢাকায় আন্দোলন হলেও প্রশাসন বাধা দেয় না। তাহলে মুরাদনগরে বাধা কেন? মুরাদনগর আসিফ মাহমুদের নিজের উপজেলা বলে? জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশ স্বৈরাচারমুক্ত হলেও আসিফ মাহমুদের মতো কিছু উপদেষ্টা চেয়ারে বসে দুর্নীতি করে বেড়াচ্ছেন। উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের পদত্যাগ চাই।
কয়েক মাস আগে বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের তিনজন উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি করেছে। তারা মনে করে, এই ব্যক্তিদের উপস্থিতি সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এই উপদেষ্টারা হলেন- যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। এ নিয়ে রাজপথে আটকিয়ে আন্দোলনও করেন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন। এসব উপদেষ্টাদের পদত্যাগ ও নির্বাচনের তারিখ নিয়ে যখন বিএনপি রাজপথ নিয়ন্ত্রণে নিতে চাইছিল তখনই পদত্যাগের নাটক সাজান অধ্যাপক ইউনূস। এই নাটকও মঞ্চস্থ করান এনসিপির নেতা নাহিদ ইসলামকে দিয়ে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসেন প্রধান উপদেষ্টা। সেখানেও উপস্থিত ছিলেন আসিফ। যা নিয়ে পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বিতর্ক।
দৃশ্যপটের পরিবর্তন হয়ে যায় লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকের পর। এই বৈঠকের পর থেকেই বিএনপি আর মাঠে নেই। তারা এখন দেশের স্বার্থকে না দেখে প্রধান উপদেষ্টার ইউনূসের প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়েছে।
উপদেষ্টা আসিফের এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে তদবির, টেন্ডার–বাণিজ্যসহ অনিয়মের মাধ্যমে শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত বৃহস্পতিবার দুদক কার্যালয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরে অভিযোগের বিষয়ে আরও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন হওয়ায় তার বিদেশ যাওয়া এবং এনআইডি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন করা হয়েছে।
গত বছরের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ১৫৮ সদস্যের সমন্বয়ক টিমে ১৭ নম্বর সমন্বয়ক ছিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন। ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হওয়ার পর উপদেষ্টা পরিষদে যুক্ত হন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। উপদেষ্টা হওয়ার পর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু মোয়াজ্জেমকে সহকারী একান্ত সচিব হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন আসিফ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মন্ত্রী বা উপদেষ্টারা তাদের ব্যক্তিগত সহকারী বা এপিএসের মাধ্যমেই তাদের দুর্নীতিগুলো করে থাকেন। যাতে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন। আসিফ ও তার বন্ধু মোয়াজ্জেমকে দিয়েই কাজটি করিয়েছেন। ধরা পড়ার শঙ্কায় পরে তাকে বলির পাঠা হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
গত ২৩ এপ্রিল কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী জুলকারনাইন সায়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি অভিযোগ উত্থাপন করেন যে, আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেন একটি সরকারি ঠিকাদারি লাইসেন্স নিয়েছেন।
পোস্টে তিনি একটি লাইসেন্সের ছবি সংযুক্ত করে দাবি করেন, “স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (কুমিল্লা) নির্বাহী প্রকৌশলী ১৬ মার্চ এই লাইসেন্স ইস্যু করেন।”
সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের দাবি অনুসারে, বিষয়টি নিশ্চিত করতে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি শুরুতে এ বিষয়ে অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। পরে তিনি বিষয়টি যাচাই করে জানান, “লাইসেন্সটি সত্য, তবে এটি তার জ্ঞাতসারে হয়নি। স্থানীয় এক ঠিকাদারের প্ররোচনায় তার শিক্ষক পিতা লাইসেন্সটি নিয়েছেন এবং এখনও পর্যন্ত সেটি কোনো কাজে ব্যবহৃত হয়নি।”
তবে প্রশ্ন উঠছে, একজন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হওয়ায় এই লাইসেন্স গ্রহণ প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ ছিল। বিশ্লেষকেরা বলছেন—এটি একটি ‘নৈতিক সংঘাত’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এছাড়া কুমিল্লা জেলাধীন মুরাদনগর উপজেলার রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের হিন্দু ধর্মাবলম্বী এক প্রবাসীর স্ত্রীকে শ্লীলতাহানি ও নির্যাতন করে একটি দুর্বৃত্ত চক্র। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পাশাপাশি এই ঘটনার জন্য যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দিকে অভিযোগে আঙুল তুলেছেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশকে কেন্দ্র করে গোপালগঞ্জে বুধবার (১৬ জুলাই) সাধারণ জনগণের সঙ্গে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় সাতজন নিহত এবং অন্তত ৫০ জন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, এই সংঘর্ষ ও অভিযান পরিচালনার পুরো মিশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ছবিতে দেখা গেছে, তারা পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করছেন।
আসিফ মাহমুদ সজীব নিজেও ফেসবুকে লিখেছেন, “সকল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে এবং নিষিদ্ধ সংগঠনের সন্ত্রাসীদের ভেঙে দেওয়া হবে।”
বিশ্লেষকেরা বলছেন, যে ব্যক্তি সরকারের উপদেষ্টা, অথচ নিয়ম-কানুনের অবমাননা করে, জঙ্গিদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, এবং নিজের শক্তি প্রদর্শনের জন্য সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করে—তার অবস্থান কোনো গণতান্ত্রিক দেশে গ্রহণযোগ্য নয়। আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া কেবল নিজের স্বার্থে প্রশাসন ব্যবহার করছেন, রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করছেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।”