
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০১০ সালে তিউনিশিয়ায় শুরু হওয়া সরকারবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিশ্বে আলোচিত হয়ে ওঠে আরব বসন্ত। তিউনিশিয়ার সরকার পতনের পর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে মিশর, লিবিয়া, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ একের পর এক আরব দেশে। স্বৈরশাসক পতন হলেও ওই দেশগুলোর অধিকাংশই আজও অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও চরমপন্থার বেড়াজালে আটকে আছে।
এবার দক্ষিণ এশিয়াতেও সেই দৃশ্যপটের পুনরাবৃত্তি ঘটছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও সর্বশেষ নেপাল একই ধরনের সহিংস আন্দোলনের মুখে পড়েছে।
নেপালে ভয়াবহ অস্থিরতা
হিমালয়ের প্রজাতন্ত্র নেপাল কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কাঠমান্ডুসহ বড় বড় শহরে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি পদত্যাগ করেছেন। তবে আন্দোলনকারীদের হামলায় তার দলের বহু নেতা–মন্ত্রীর ওপর হামলা হয়েছে, এমনকি এক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকেও পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নেপালের আন্দোলনকারীরা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, তারা বাংলাদেশে সাম্প্রতিক গণ-আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গে মিল
বাংলাদেশে গত বছরের ৫ আগস্ট শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সূত্র ধরে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। আন্দোলনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফর করেছিলেন। নেপালের ক্ষেত্রেও একই রকম ঘটনা ঘটেছে—প্রধানমন্ত্রী ওলি কয়েক দিন আগে চীন সফর করে ফেরার পরই আন্দোলনের মুখে পড়েন।
বাংলাদেশে আন্দোলনের মূল প্রভাবক হিসেবে ছিলেন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি পশ্চিমা সমর্থন পেয়েছেন বলে অভিযোগ। আর নেপালে আন্দোলনের পেছনে সক্রিয় ছিলেন এনজিওকর্মী সুদান গুরুং, যিনি শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে সহিংসতায় ঠেলে দেন।
মার্কিন ডিপ স্টেটের ভূমিকা?
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ডিপ স্টেট বা গোপন ক্ষমতাকাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই এনজিওর মাধ্যমে বিদেশি আন্দোলনে অর্থায়ন করে আসছে। তাদের কৌশল হলো—একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উস্কানি, অন্যদিকে মাঠে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশ ও নেপাল—দুই ক্ষেত্রেই এই মডেল প্রয়োগ হয়েছে বলে অভিযোগ।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ
দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য চীনকে বিপদে ফেলা এবং ভারতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। ভারত, চীন ও রাশিয়া সম্প্রতি শুল্কবিরোধী অবস্থানে একত্রিত হওয়ায় আমেরিকা আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফলে তারা বাংলাদেশের পর নেপালেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্লেষকের মন্তব্য
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, “বাংলাদেশ ও নেপালের সাম্প্রতিক আন্দোলনের মধ্যে বিস্ময়কর মিল রয়েছে। উভয় দেশেই সরকার প্রধান চীন সফর করে ফেরার পরই সহিংসতা শুরু হয়েছে। এটি নিছক কাকতালীয় নয়। এর পেছনে আন্তর্জাতিক শক্তির কৌশলগত স্বার্থ কাজ করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় অস্থিতিশীলতা তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে চীনকে দুর্বল করতে চাইছে, অন্যদিকে ভারতের উপর চাপ ধরে রাখতে চাইছে।”
তারা বলছেন, “আরব বসন্ত থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত আমাদের। বাইরের শক্তি যখন ভেতরের অসন্তোষকে ব্যবহার করে, তখন দেশ শুধু সরকার পতন নয়, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার মুখে পড়ে।