
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মিথ্যাচার এবার জবানবন্দি দিয়ে ফাঁস করলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এর ফলে ইউনূস যে একজন প্রতারক ব্যক্তি তা রাষ্ট্রীয় রেকর্ড নথিবদ্ধ হিসেবে থাকল। বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত শেখ হাসিনাসহ অন্যদের বিরুদ্ধে দেওয়া সাক্ষ্যে এ কথা বলেন নাহিদ ইসলাম।
তিনি বলেন, গত বছরের ৪ আগস্ট নতুন সরকার গঠনের পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলোচনা হয়। সেদিন ড. ইউনূসকে নতুন সরকারের প্রধানের দায়িত্ব পালনের প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
চলতি বছর বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন উপলক্ষে সুইজারল্যান্ডের দাভোস সফর করেন প্রধান উপদেষ্টা। সে সময় ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বৈদেশিকবিষয়ক প্রধান ভাষ্যকার গিডেয়েন রাখমানের উপস্থাপনায় একটি পডকাস্টে কথা বলেন তিনি।
‘রাখমান রিভিউ’ নামের ওই পডকাস্ট অনুষ্ঠানে কথোপকথন লিখিত আকারে পরে প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানেই সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও ছাত্রদের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন ড. ইউনূস।
ইউনূস বলেন, ‘আমি যখন প্রথম ফোনকল পাই, তখন আমি প্যারিসের হাসপাতালে ছিলাম। আমার ছোট্ট একটি অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। তখন তারা (ছাত্রনেতারা) ফোন দিল। যদিও আমি বাংলাদেশে কী ঘটছে, সেসব খবর প্রতিদিন মুঠোফোনে দেখতাম। তখন তারা বলল, “তিনি (শেখ হাসিনা) চলে গেছেন। এখন আমাদের সরকার গঠন করতে হবে। দয়া করে, আমাদের জন্য সরকার গঠন করুন।” আমি বলেছিলাম, না, আমি সেই ব্যক্তি নই। আমি এর কিছুই জানি না। আমি এর সঙ্গে যুক্ত হতেও চাই না।’
এখানে স্পষ্ট যে ইউনূস মিথ্যাচার করেছেন। তারা কথা মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীরা তারা সঙ্গে যোগাযোগ করে। ব্যাপারটি যে এমন নয় তা নাহিদের জবানবন্দিতে স্পষ্ট।
সশস্ত্র আন্দোলনের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত রেখেছিলেন ইউনূস
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন না হলে সশস্ত্র সংগ্রাম করা হতো বলে জানিয়েছেন মো. নাহিদ ইসলাম। গত বছর উপদেষ্টা থাকার সময় এক অনুষ্ঠানে তিনি এ তথ্য জানিয়েছিলেন।
তিনি বলেছেন, “৫ আগস্ট অর্থাৎ ৩৬ জুলাই আমরা একটা ভিডিও করে বের হয়েছিলাম, ভিডিওতে আমি বলেছিলাম যে, আজ যদি কোনো গণহত্যা হয় বা ম্যাসাকার হয়, তাহলে আমাদের সশস্ত্র সংগ্রামের আহ্বান থাকবে। আমরা ফিরে নাও আসতে পারি আপনারা লড়াই চালিয়ে যাবেন। একটা ভিডিও করে আমি কিছু সাংবাদিককে দিয়ে এসেছিলাম। যদি আজ আমি না ফিরি, আজ আমাদের বিজয় অর্জন না হয়, তাহলে এটাই আমাদের শেষ বার্তা। আমরা প্রত্যেকেই মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলাম এবং এখনো আছি।”
এরপর যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদও বেশ কয়েকবার জানিয়েছেন, তারা ৫ আগস্ট সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিতে প্রস্তুত ছিলেন।
গত বছর একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে শনিবার রাতে আলোচক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম। তার সঙ্গে আলোচক ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য এবং বিএনপির সহ-স্বনির্ভর বিষয়ক সম্পাদক নিলোফার চৌধুরী মনি।
উপস্থাপকের প্রশ্নের জবাবে হাসিবকে বলতে শোনা যায়, ‘মেট্রোরেলে আগুন না দিলে কিংবা পুলিশ হত্যা না করা হলে এত সহজে বিপ্লব অর্জন করা যেত না।’
ইউনূসের পেছনে ছিল শিবির
জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির রাজপথে থাকা, পরামর্শ দেওয়া ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপে সহযোদ্ধার মতো ভূমিকা পালন করেছিল বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। জুলাই অভ্যুত্থানের শুরু থেকে শিবিরের কর্মীদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, কেউ কোনো দিন কোনো সত্যকে চেপে রাখতে পারে না। সত্য প্রকাশিত হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা।
গত ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রশিবিরের সদস্য সম্মেলনে দেওয়া বক্তৃতায় এসব কথা বলেন সারজিস আলম। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত মিথ্যাচার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় রাজনীতির জন্যও তাৎপর্যপূর্ণ।
একজন বিশ্লেষক মনে করেন, “দাভোসে দেওয়া বক্তব্যে ইউনূস বলেছেন, ছাত্ররা তাকে সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু নাহিদের জবানবন্দি থেকে ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে। এতে প্রমাণ হয়, ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে তিনি জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় রেকর্ডে বিষয়টি সংরক্ষিত হওয়ায় তার বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।”
অন্য একজন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের মতে, “৫ আগস্ট সশস্ত্র সংগ্রামের প্রস্তুতির বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, রাজনৈতিক পরিবর্তন শান্তিপূর্ণভাবে না হলে সহিংসতা ঘটতে পারত। এতে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতো এবং আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হতো।”
তিনি আরও যোগ করেন— “ইসলামী ছাত্রশিবিরের সম্পৃক্ততা যেভাবে সামনে আসছে, তা আন্দোলনের চরিত্র ও অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। দীর্ঘমেয়াদে এসব তথ্য রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও তীব্র করতে পারে।”