
নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। শ্রমিক, পর্যটক ও ব্যবসায়িক উদ্দেশে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবেন। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন এই নির্দেশনা কার্যকর হবে।
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বাংলাদেশের ওপর জঙ্গিবাদের তকমা আরোপ করছে উন্নত দেশগুলো। এর ফলে দেশটির নাগরিকদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার হার বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে ৩ শতাধিক জঙ্গি জামিনে মুক্ত। এছাড়া কারাগার ভেঙে পালানো জঙ্গিরা এখনো রয়েছে অধরা। তাদের মধ্যে কেউ সন্দেহভাজন, কেউ বিচারাধীন, এমনকি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্তও রয়েছেন। ধর্মের নামে অপপ্রচার, জঙ্গি সংগঠনের পুনরুত্থান এবং প্রশাসনের নীরব ভূমিকা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে জঙ্গিবাদ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করলেও সাম্প্রতিক সময়ে নীতিতে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। পাঁচই আগস্টের পট পরিবর্তনের পর থেকে একের পর এক জঙ্গি মামলার আসামি জামিনে মুক্ত হচ্ছেন।
আন্তর্জাতিক মহলের মতে, ভিসা প্রত্যাখানের পেছনে কয়েকটি বিষয় সরাসরি ভূমিকা রাখছে:- ১) রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি। ২) সাইবার নিরাপত্তার ঝুঁকি। ৩) উচ্চ যুব বেকারত্ব, বিশেষ করে নারীদের মধ্যে ৪২%। ৪) জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অভিবাসন প্রবণতা। এই ৪টি প্রধান কারণে উন্নত দেশগুলো অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে ভিসা নীতি কঠোর করছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভ্রমণ, কাজ বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক বিদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা একটি অপরিহার্য নথি। যদিও বেশিরভাগ নাগরিক সংযুক্ত আরব আমিরাতের পর্যটন ভিসা বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাজের ভিসার জন্যই আবেদন করেন।
তবে এবার বেশ কিছু দেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করলো আমিরাত। এই বিধিনিষেধের অর্থ হলো- পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই দেশগুলোর নাগরিকরা শ্রমিক, পর্যটক এবং ব্যবসায়িক উদ্দেশে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসার জন্য আবেদন করতে পারবেন না।
কেন এসব দেশের নাগরিকের ওপর ভিসা নিষিদ্ধ করা হয়েছে?
আরব আমিরাত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কারণ জানায়নি। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এর সম্ভাব্য কারণগুলো হলো-
নিরাপত্তা উদ্বেগ: সন্ত্রাসবাদ বা বেআইনি কার্যকলাপ থেকে আমিরাতের নাগরিকদের সুরক্ষিত রাখা।
ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক: উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন।
কোভিড-১৯ প্রতিরোধ: সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও কঠোর প্রবেশ নীতিমালা প্রয়োগ।
প্রথম দুটি কারণে বাংলাদেশের ওপর ভিসা নিষেধাজ্ঞা এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এরমধ্যে প্রথমটি হলো বাংলাদেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ বেড়ে যাওয়ায় আরব আমিরাতের মতো উন্নত দেশ এখন বাংলাদেশিদের নিতে চাইছে না। সেইসঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন। ইউনূস সরকারের আমেরিকাঘেঁষা ও দুর্বল কূটনীতির কারণে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের নাগরিকদের নিতে অনীহা প্রকাশ করছে।
আরব আমিরাত ভিসা বন্ধ: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা
বাংলাদেশের জন্য আরব আমিরাত নতুন ভিসা প্রদান বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। আগামী জানুয়ারি ২০২৬ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হতে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশের শ্রম বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে অর্থনীতিবিদরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট রেমিটেন্সের প্রায় ১৩.৭৬ শতাংশ। নতুন ভিসা বন্ধ হয়ে গেলে এই বিশাল অংশের আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শ্রম রপ্তানিতে বড় ধাক্কা
শ্রম রপ্তানি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বৈদেশিক আয় উৎস। প্রতিবছর কয়েক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক আরব আমিরাতের কাজের সুযোগ পান। তবে নতুন ভিসা বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে আর নতুন শ্রমিক পাঠানো সম্ভব হবে না। এতে বেকারত্ব বাড়বে এবং দেশের অভ্যন্তরে শ্রমবাজারে চাপ তৈরি হবে।
রেমিটেন্স নির্ভর পরিবার বিপাকে
দেশের লাখো পরিবার রেমিটেন্স নির্ভর। বিদেশে কর্মরত স্বজনদের পাঠানো অর্থ দিয়ে তারা খাদ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানের খরচ মেটায়। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় রেমিটেন্সের টাকায় জীবন চলে। তাই UAE থেকে রেমিটেন্স কমে গেলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এই পরিবারগুলো।
বৈদেশিক মুদ্রার সংকট বাড়বে
রেমিটেন্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। আরব আমিরাত থেকে রেমিটেন্স কমে গেলে আমদানি ব্যয় মেটাতে সমস্যায় পড়তে পারে সরকার। এর প্রভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ মতামত
বাংলাদেশি ভ্রমণবিষয়ক ইউটিউবার নাদির নিবরাস জানান, বৈধ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার ভিসা থাকলেও তিনি তাজিকিস্তানের সাধারণ ই-ভিসা পাননি। আবেদন প্রত্যাখ্যানের কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, এমনকি ফিও ফেরত দেওয়া হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে পড়াশোনা করতে যাওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, দীর্ঘ প্রস্তুতির পরেও মাত্র কয়েক মিনিটে তার ভিসা আবেদন বাতিল করা হয়। একই দিনে উপস্থিত আরও অন্তত ১০-১২ জন শিক্ষার্থীও ভিসা পাননি।
চীন থেকে পণ্য আমদানি করা এক ব্যবসায়ী জানান, গত তিন বছরে অন্তত ছয়বার চীন সফর করলেও এবার জুন মাসে তার ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
২০২৪ সালে শেনজেন অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশিদের জমা পড়া ৩৯,৩৪৫ ভিসা আবেদনের মধ্যে ২০,৯৫৭টি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, যা প্রায় ৫৪.৯%। ভিয়েতনাম, লাওস, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান ও মিশর, মালয়েশিয়া,ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা কার্যক্রম বন্ধ বা কঠোর করেছে। ভারত এখন সীমিতভাবে চিকিৎসা ও শিক্ষা ভিসা দিচ্ছে।