২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের একটি সমাবেশের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখানে কয়েকজনকে ভারতবিরোধী বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি ‘তিন থেকে চার দিনের মধ্যে কলকাতা দখল’ করার হুমকি দিতে শোনা যায়। সেই বক্তব্য তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনা ও ব্যঙ্গের জন্ম দিয়েছিল।
দুই বছর না পেরোতেই এবার ভিন্ন এক ঘটনায় আলোচনায় এসেছেন কয়েকজন সাবেক সেনাসদস্য।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে অস্ত্রের মুখে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৩৮ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় নয়জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য। তদন্তে একজন বর্তমান সেনাসদস্যের নামও এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
রোববার ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন তানভীর আবেদীন, মজিবুর রহমান, জাকির হোসেন ওরফে ক্যাপ্টেন জাকির, সোলায়মান মৃধা, মোহাম্মদ কবির হোসেন, আবুল কালাম আজাদ, জাকারিয়া হোসেন ওরফে লেলিন, সজল চৌধুরী ও সায়মুন চৌধুরী।
তাদের মধ্যে মজিবুর রহমান সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট পদ থেকে অবসর নিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। জাকির হোসেন ওরফে ক্যাপ্টেন জাকির অবসর নিয়েছেন অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে এবং সোলায়মান মৃধা ছিলেন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার। তাদের মধ্যে কেউ কেউ একসময় র্যাবেও দায়িত্ব পালন করেছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তদন্তে শফিক নামে সেনাবাহিনীর একজন ল্যান্স করপোরালের নামও এসেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। ধানমন্ডি থানার ওসি মুহাম্মদ ইমদাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি সেনাবাহিনীকে অবহিত করা হয়েছে এবং মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্রও পাঠানো হয়েছে। তবে ওই সেনাসদস্যকে এখনো পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৩০ আগস্ট। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন দুপুরে ধানমন্ডির ১২ নম্বর সড়কে ডিঙ্গি রেস্তোরাঁর সামনে খোরশেদ আলম নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে অস্ত্রের মুখে ৩৮ লাখ টাকা নিয়ে যায় আট থেকে দশজনের একটি দল।
ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় দুজনকে আটক করা হয়। তাদের কাছ থেকে চার রাউন্ড গুলিসহ একটি রিভলভার উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
এরপর আটক ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর দক্ষিণখানসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। পটুয়াখালী, কুয়াকাটা বাসস্ট্যান্ড, মোহাম্মদপুর ও বায়তুল মোকাররমসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পর্যায়ক্রমে অন্যদের গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছে ডিএমপি।
পুলিশ বলছে, লুট হওয়া অর্থের একটি অংশও উদ্ধার করা হয়েছে। জাকারিয়ার কাছ থেকে ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৩৫০ টাকা এবং সজল চৌধুরীর কাছ থেকে ২ লাখ টাকা উদ্ধারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫০ টাকা। চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
তদন্তে গ্রেপ্তার কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগের মামলার তথ্যও পেয়েছে পুলিশ। ডিএমপির ভাষ্য অনুযায়ী, তানভীরের বিরুদ্ধে চারটি এবং সজলের বিরুদ্ধে ছয়টি ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা রয়েছে। জাকারিয়ার বিরুদ্ধেও মাদক ও হ’ত্যাচেষ্টার দুটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে।
তবে ২০২৪ সালের ‘কলকাতা দখল’-এর হুমকি দেওয়া ভাইরাল ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে বর্তমান ঘটনায় গ্রেপ্তার তিন সাবেক সেনাসদস্যের সরাসরি পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা পুলিশ নিশ্চিত করেছে—এমন তথ্য প্রকাশিত বিবরণে নেই। ফলে দুটি ঘটনাকে একই ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করার আগে সেই যোগসূত্র নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
একদিকে কয়েক বছর আগের যুদ্ধংদেহী বক্তব্য, অন্যদিকে সাবেক সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ ডাকাতির মতো গুরুতর অভিযোগ—দুটি ঘটনা নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে আনছে: সামরিক বাহিনী থেকে অবসরের পর প্রশিক্ষিত ও সাবেক সদস্যদের একটি অংশ অপরাধী চক্রে যুক্ত হয়ে পড়লে তাদের পর্যবেক্ষণ, জবাবদিহি ও আইন প্রয়োগের কাঠামো কতটা কার্যকর?
ধানমন্ডির ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখন তদন্তাধীন। অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়াতেই নির্ধারিত হবে।
মন্তব্য করুন