Insight Desk
প্রকাশ : Jun 22, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট আবার সাধারণ রোগীদেরও হবে কবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা

দেশের একমাত্র অত্যাধুনিক চক্ষু চিকিৎসার হাসপাতাল জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট। সেখানে অচলাবস্থা বিরাজ করছে ১৭ দিন ধরে৷ ৩ জুন জরুরি বিভাগ চালু হলেও চিকিৎসা ব্যবস্থায় স্বাভাবিকতা ফেরেনি। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার থেকে পুরোদমে হাসপাতালের কার্যক্রম চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে গণঅভ্যুত্থানে আহত রোগীরা শনিবার আবারও হাসপাতালের বেডে ওঠার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে আরো সংকটময় পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে জুলাই-আগস্টে আহত ৫ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি আছেন। অন্যরা ঈদের ছুটিতে বাড়িতে গেছেন।

শুক্রবার সরেজমিনে ওই হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে ভুতুড়ে পরিবেশ। গেইটের সামনে আনসার সদস্যদের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। ভেতরের বিভিন্ন ফ্লোরে আনসার সদস্যরা বসে আছেন। চতুর্থ তলার বি ব্লকে দুইজন নার্সের পাশাপাশি একজন আনসার সদস্যকেও পাওয়া গেল৷ সেখানেই ভর্তি আছেন জুলাই অভ্যুত্থানের সময়ের আহতরা।

বি ব্লকে ৬৪টি বেড আছে। সেখানে শুক্রবার পাওয়া গেল মাত্র ৫ জনকে। তিনটি কক্ষে তারা আছেন। তাদের একজন ইমরান হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘আমার ডান চোখে সমস্যা। আমাকে সিঙ্গাপুরেও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে সঠিক চিকিৎসা হয়নি। আমার আরো উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সে ব্যবস্থা করছে না। এই কারণে আমি হাসপাতাল ছেড়ে যাচ্ছি না। এখান থেকে চলে গেলে কেউ আর খোঁজ নেবে না।”

২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট থেকে এই হাসপাতালে আছেন ইমরান। তার সঙ্গে আছেন নূর আলম, ফিরোজ, রাজু ও মামুন। তাদের সকলের বয়স ৩০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। আলাপকালে নূর হোসেন ডয়চে ভেলেকে বলেন, "যাদের মামা-খালু আছে তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। আমি তো উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে পারি না, এজন্য আমার উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা হচ্ছে না। আমার দুই চোখেই স্প্লিন্টার রয়ে গেছে। সারা শরীরে স্প্লিন্টার আছে। এমনকি গোপনাঙ্গেও একটা স্প্লিন্টার আছে। কিন্তু আমার সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে না।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আবু হুসাইন মো. মনিরুল আহসান ডয়চে ভেলেকে বলেন, "সরকারের সব এজেন্সি বিষয়টি জানে। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলও বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত। আমরা আশা করছি, শনিবার থেকে হাসপাতালটির কার্যক্রম পুরোপুরি চালু করা যাবে। এখন আর কেউ অযথা ঝামেলা করবে না।”

অচলাবস্থার কারণ: গত ২৮ মে অভ্যুত্থানের সময় আহত রায়হান নামে এক রোগী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরীর কাছে গিয়ে একজন নারী রোগীর কাগজে সই করিয়ে আনেন। এরপর রায়হান যখন সব সিরিয়াল ভেঙে ওই নারী রোগীকে দেখানোর জন্য সামনে নিয়ে যান, তখন হাসপাতালের কর্মচারীরা তাতে বাধা দেন। তখন ওই নারী রোগী দাবি করেন, আগে দেখানোর কথা বলে তার কাছ থেকে ৫০০ টাকা নিয়েছেন রায়হান। এ নিয়ে রায়হানের সঙ্গে কর্মচারীদের তর্কাতর্কি হয়। এক পর্যায়ে রায়হান অভ্যুত্থানের সময় আহত আরো কয়েকজনকে ডেকে এনে কর্মচারীদের মারধর করেন। কর্মচারীরাও একজোট হয়ে প্রতিহত করতে গেলে দু' পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয়।

ওই দিন থেকে কর্মস্থলে নিরাপত্তার দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেন চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা৷ জরুরি বিভাগ ছাড়া নিয়মিত অস্ত্রোপচার থেকে শুরু করে সব চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন। এ কারণে সকাল থেকেই হাসপাতালে আসা সাধারণ রোগী ও সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে কর্মীদের কথা কাটাকাটি হয়। যাদের পূর্বনির্ধারিত অস্ত্রোপচারের তারিখ ছিল, তাদেরও ফিরে যেতে হয়। এতে সেবাপ্রার্থীরা হইহুল্লোড় ও হট্টগোল করতে থাকেন। চিকিৎসক ও নার্সদের দিকে তেড়ে যান। এসময় আনসার সদস্যরা নিবৃত করতে গেলে হাতাহাতি হয়। হাসপাতালের কর্মী ও সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে মারামারিও হয়।

এরপর পুরো হাসপাতালে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে ভেতরের সব ওয়ার্ডের কলাপসিবল গেট আটকে তালা দিয়ে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। বিষয়টি নিজেদের জন্য আতঙ্কের বা আক্রমণাত্মক হতে পারে- এমন আশঙ্কায় উল্টো তালা ভেঙে জুলাই আহতরা লাঠিসোঁটা ও রড হাতে চিকিৎসক, কর্মী ও সেবাপ্রার্থীদের এলোপাতাড়ি পেটানো শুরু করেন৷ তাদের সঙ্গে এসে যোগ দেন পঙ্গু হাসপাতালে থাকা জুলাই আহতরাও। এ ঘটনায় চিকিৎসকসহ ১৫ জন আহত হন। এরপর আতঙ্কে চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীদের বেশিরভাগ দ্রুত হাসপাতাল ছেড়ে যান। কেউ কেউ ভেতরে আটকা পড়লে সেনাসদস্যরা গিয়ে তাদের উদ্ধার করেন। এরপরই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় হাসপাতালের সেবা কার্যক্রম। কার্যত ওইদিন থেকে পুরো হাসপাতাল জুলাই আহতদের দখলে চলে যায়। এরপর থেকে হাসপাতালে যাচ্ছেন না চিকিৎসক-নার্স ও অন্য কর্মীরা। সেখানে এখন শুধু জুলাই আহতরা অবস্থান করছেন। সরকার রুটিনমাফিক তাদের জন্য খাবার সরবরাহ করছে।

প্রতিদিন সেবাবঞ্চিত পাঁচ হাজার মানুষ: সরকারের ৬০০ কোটি টাকার সরঞ্জামসমৃদ্ধ অত্যাধুনিক এ হাসপাতালটি ১৭ দিন ধরে বন্ধ। প্রতিদিন পাঁচ হাজার মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছে। গত ৪ জুন মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরাও হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন। তারা এসে ২০৭ নম্বর রুমে ভর্তি থাকা ৫৪ জন জুলাই আহতের সঙ্গে চিকিৎসাসংক্রান্ত বৈঠকে বসতে চান। আহতদের মধ্যে ৩০ জন তাদের ডাকে সাড়া দেন। তাদের সবার চোখ পরীক্ষা করেন বোর্ডের সদস্যরা। তাদের সবাইকে ছাড়পত্র (রিলিজ) দেওয়া এবং পুনর্বাসন করার সুপারিশ করে মেডিকেল বোর্ড৷ বাকি ২৪ জন হাজির না হওয়ায় তাদের ব্যাপারে কিছু করা যায়নি।

জানা গেছে, মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা চলে যাওয়ার পর জরুরি বিভাগের সামনে আবাসিক চিকিৎসক (আরএস)-এর রুমে জুলাই আহতরা চিকিৎসকদের সঙ্গে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হন। জুলাই আহতরা সাফ জানিয়ে দেন, নানান কারণে তাদের ঢাকায় আসতে হয়। তারা জানতে চান, ঢাকায় এসে তারা থাকবেন কোথায়? এজন্য তাদের পক্ষে হাসপাতাল ছাড়া সম্ভব নয় বলেও জানিয়ে দেন তারা। এসময় জুলাই আহতদের পক্ষ থেকে রিলিজের যাবতীয় কাগজ ছিঁড়ে ফেলে হাসপাতাল থেকে না যাওয়ার কথাও জানিয়ে দেয়া হয়।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র যুগ্ম আহবায়ক মনিরা শারমিন ডয়চে ভেলেকে বলেন, "বিষয়টি নিয়ে আমরাও বিব্রত। আমাদের মধ্যেও এ বিষয়ে অনির্ধারিত আলোচনা হয়েছে। আমরাও চাচ্ছি, দ্রুত বিষয়টির একটা সমাধান হোক।”

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

কর্মজীবী নারীদের পতিতাদের সঙ্গে তুলনা: জামায়াতের বক্তব্যে ফু

1

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: নিছক দুর্ঘটনা না কি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত

2

শিশু ধর্ষণ, টাকার বিনিময়ে মীমাংসায় জামায়াত নেতা

3

সংকটে এনসিপি, মার্কিন গুরুর দীক্ষা নিতে কক্সবাজারে এনসিপির ন

4

২১ আগস্টের দাগি আসামিদের খালাস দিল ইউনূসের ক্যাঙ্গারু কোর্ট

5

বাংলাদেশ যদি মৌলবাদীদের হাতে পড়ে, দিল্লি কি নিরাপদ থাকবে?

6

নির্যাতন-অবমাননার চাপে ভেঙে পড়ছে পুলিশ: “বানরের মতো খাঁচায় ব

7

জামাতি স্টাইলে এবার জাপার কার্যালয়ে আগুন দিল গণঅধিকার পরিষদ

8

বিবিসি বাংলার পক্ষপাতমূলক প্রচার: শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি নষ্ট

9

সময় ফুরিয়ে আসছে সরকারের, আরও বেপোরোয়া হয়ে উঠছে এনসিপি

10

পূর্ব পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশকে হাইজ্যাক করেছে জঙ্গিরা?

11

বিজয় দিবসে এবারও প্যারেড হবে না: জনমনে নিন্দা ও বিতর্ক, পাকি

12

কাশিমপুরে বন্দিদের খাবারে বিষ মেশানোর অভিযোগ, ভিন্নমত দমনের

13

চাঁদা শুধু বিএনপি না এনসিপি-বৈষম্যবিরোধীরাও খায়, ধরা খেলেই ব

14

জামিন মিলেও স্বাধীনতা নেই: গায়েবী মামলার ফাঁদে আটকে মৃত্যুপথ

15

ইউনূস সরকারের ছত্রছায়ায় জঙ্গিবাদে শিশু-কিশোররাও, দেশে বাড়ছে

16

জাতিসংঘ মিশন থেকে ১৮০ পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার: ইউনুস সরকারের

17

শিবির নেতাদের সরাসরি পুলিশে নিয়োগের মিশনে ইউনূস ব্রিগেড

18

২০২৫: সহিংসতা, নির্যাতন ও মানবাধিকার সংকট

19

শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছে ড. ইউনুস

20