মাত্র এক ঘণ্টা ৪০ মিনিটের ব্যবধানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে তিন কারাবন্দীর মৃত্যু হয়েছে। রোববার সকালে পরপর ঘটে যাওয়া এই তিন মৃত্যুর মধ্যে একজন আওয়ামী লীগের কর্মী বলে জানা গেছে। বাকি দুজনকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে আনার পর মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
মৃত তিনজন হলেন মো. শাহাদত হোসেন লিটন (৫২), আবুল বাশার (৫৮) ও আব্দুল কাইয়ম (৬২)। তাঁদের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেক হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। তবে ঠিক কী কারণে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একই হাসপাতালে মাত্র ১০০ মিনিটের মধ্যে তিন কারাবন্দীর মৃত্যু এমন এক সময়ে ঘটল, যখন দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দীদের মৃত্যু, অসুস্থ বন্দীদের চিকিৎসা এবং রাজনৈতিক মামলায় আটক ব্যক্তিদের কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রশ্ন উঠছে।
আওয়ামী লীগ কর্মী শাহাদত হোসেন লিটন অসুস্থ হয়ে গত ২৮ আগস্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি হন। কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। কয়েক দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর রোববার সকাল পৌনে ৯টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
৫২ বছর বয়সী লিটন খুলনার দৌলতপুর থানার পাবলা এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বাবা প্রয়াত আব্দুল কাদের। তিনি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মামলা নম্বর ১১/০৭ এবং উত্তরা থানার মামলা ৯(১১)০৬-এর ৩০২, ৩৪ ও ২০১ ধারার মামলায় কারাবন্দী ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তিনি আওয়ামী লীগের একজন কর্মী ছিলেন।
লিটনের মৃত্যুর আগে একই সকালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে অসুস্থ অবস্থায় ঢামেক হাসপাতালে নেওয়া হয় আবুল বাশারকে। কারারক্ষীরা তাঁকে জরুরি বিভাগে নিয়ে আসার পর চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
আবুল বাশার চাঁদপুরের কচুয়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের একটি মামলায় বন্দী ছিলেন। তাঁর বাড়ি কচুয়া উপজেলার কুটিয়া লক্ষ্মীপুর গ্রামে।
এরপর আরেক কারাবন্দী আব্দুল কাইয়মকে অসুস্থ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন কারারক্ষীরা। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সকাল ৯টা ৫ মিনিটে তাঁকেও মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
৬২ বছর বয়সী আব্দুল কাইয়মের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গোলাই পদাবাজার গ্রামে। তিনি আটটি মামলায় কারাবন্দী ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে আবুল বাশারকে মৃত ঘোষণা করা হয়। এরপর সকাল পৌনে ৯টার দিকে মৃত্যু হয় শাহাদত হোসেন লিটনের। সবশেষ সকাল ৯টা ৫ মিনিটে আব্দুল কাইয়মকে মৃত ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ প্রথম ও তৃতীয় মৃত্যুর ব্যবধান মাত্র এক ঘণ্টা ৪০ মিনিট।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, তিন কারাবন্দীর মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
একই সকালে তিন কারাবন্দীর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তাঁদের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এসব মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কারাগারে অসুস্থতা ও মৃত্যুর একাধিক ঘটনা সামনে আসায় বন্দীদের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে গুরুতর অসুস্থ বন্দীকে কখন হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে, কারাগারে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে কি না এবং হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বিলম্ব হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে।
রোববারের তিন মৃত্যুর ক্ষেত্রেও চিকিৎসায় অবহেলা বা অন্য কোনো অনিয়মের প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি। তাই মৃত্যুর কারণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে ময়নাতদন্ত ও সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফলাফল প্রয়োজন।
তবে মাত্র ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিটের ব্যবধানে একই হাসপাতালে তিন কারাবন্দীর মৃত্যু নিছক পরিসংখ্যান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারাগারের ভেতরে একজন বন্দীর জীবন ও চিকিৎসার দায়িত্ব রাষ্ট্রের হেফাজতেই থাকে। ফলে একের পর এক বন্দীর মৃত্যু ঘটলে প্রতিটি মৃত্যুর কারণ স্বচ্ছভাবে প্রকাশ এবং যথাযথ তদন্তের দাবি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
মন্তব্য করুন