নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) মধ্যে প্রস্তাবিত ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (India–EU FTA) শুধু ভারতের জন্য নতুন সুযোগই তৈরি করছে না, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপঘেঁষা কয়েকটি দেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই একটি বাণিজ্য চুক্তির প্রভাবে একসঙ্গে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং তুরস্ক।
কী এই India–EU FTA
India–EU FTA বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্মিলিত অর্থনীতি, প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষের বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই চুক্তির আওতায় আসতে পারে।
এই চুক্তির মাধ্যমে টেক্সটাইল, অ্যাপারেল, ফুটওয়্যার, স্টিল, অটো কম্পোনেন্টসসহ একাধিক খাতে শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পাকিস্তানের ওপর প্রভাব
পাকিস্তানের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ নির্ভর করে টেক্সটাইল শিল্পের ওপর। দেশটির মোট রপ্তানির প্রায় ২৭–২৮ শতাংশ ইউরোপীয় বাজারে যায়। এতদিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের GSP সুবিধার কারণে পাকিস্তান তুলনামূলক কম শুল্কে টেক্সটাইল রপ্তানি করতে পারত।
কিন্তু India–EU FTA কার্যকর হলে ভারতের ওপর থাকা ১০–১২ শতাংশ শুল্ক উঠে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় ভারতীয় টেক্সটাইল ইউরোপের বাজারে আরও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে, যা পাকিস্তানের বাজার অংশীদারিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য বাড়তি উদ্বেগ
বাংলাদেশের অর্থনীতিও ব্যাপকভাবে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৪৪ শতাংশ ইউরোপে যায় এবং এর বড় অংশই টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস।
এতদিন স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) মর্যাদার কারণে বাংলাদেশ ইউরোপে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে এসেছে। তবে এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী সময়ে এই সুবিধা ধীরে ধীরে উঠে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
একদিকে বাংলাদেশের ওপর শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা, অন্যদিকে ভারতের শুল্কমুক্ত প্রবেশ—এই দ্বৈত চাপ বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতাকে কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে জটিল অবস্থায় তুরস্ক
এই চুক্তির সবচেয়ে জটিল প্রভাব পড়ছে তুরস্কের ওপর। তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে Customs Union-এর আওতায় রয়েছে। ফলে ইইউ যদি ভারতের মতো তৃতীয় দেশের সঙ্গে শুল্ক কমানোর চুক্তি করে, সেই সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তুরস্কের বাজারেও কার্যকর হয়।
এর ফলে ভারতীয় পণ্য শুধু ইউরোপেই নয়, তুরস্কের বাজারেও কম শুল্কে প্রবেশের সুযোগ পাবে। অথচ ভারত তুরস্কের পণ্যের জন্য একই সুবিধা দিতে বাধ্য নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এতে তুরস্ক দ্বিমুখী চাপে পড়ছে—নিজের অভ্যন্তরীণ বাজারে এবং ইউরোপীয় বাজারে।
বর্তমানে ইইউর মোট টেক্সটাইল আমদানির প্রায় ১১ শতাংশ আসে তুরস্ক থেকে। India–EU FTA কার্যকর হলে ভারতের বাজার অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে, যা তুরস্কের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
অন্যান্য খাতেও প্রভাব
শুধু টেক্সটাইল নয়—স্টিল, অটো কম্পোনেন্টস, মেশিনারি ও কেমিক্যাল খাতেও একই ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। আগে যেসব পণ্যে ভারতের ওপর ২০ শতাংশের বেশি শুল্ক ছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে শূন্যের কাছাকাছি চলে আসতে পারে।
সার্বিক চিত্র
একটি মাত্র বাণিজ্য চুক্তি—পাকিস্তানের টেক্সটাইল রপ্তানিকে চাপের মুখে ফেলছে
বাংলাদেশের রপ্তানি নির্ভর মডেলকে অনিশ্চয়তায় ফেলছে
আর তুরস্ককে দিচ্ছে দ্বিমুখী ধাক্কা
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কৌশলগত জোট ও চুক্তির গুরুত্ব দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। India–EU FTA শুধু ভারতের অর্জন নয়, বরং অন্য দেশগুলোর জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন