নিজস্ব প্রতিবেদক
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএসটিআর) দপ্তরের দেওয়া একটি চিঠি বাংলাদেশ সরকার গোপন রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশ্লেষকেররা বলছেন, ইউএসটিআরের চুক্তির শর্তাবলি গোপন রাখা হচ্ছে, যা গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার পরিপন্থী। জনগণের সম্মতি ছাড়া এমন চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের কোনো চুক্তি করার অধিকার নেই।
ঘটনার শুরু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি ঘোষণা থেকে। সম্প্রতি তিনি বলেন, পহেলা আগস্ট থেকে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হবে। এ নিয়ে আলোচনা করতে প্রতিনিধি দলও পাঠিয়েছিল সরকার। তবে ওই প্রতিনিধি দলের অর্জনকে বিশ্লেষকরা “শূন্য” বলেই আখ্যা দিচ্ছেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনেও আলোচক দলের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
পরে জানা গেল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি সমঝোতা চুক্তির খসড়া আলোচনায় এসেছে, যেখানে নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যু অন্তর্ভুক্ত থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, এসব আলোচনা ১ আগস্টের আগেই চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। এরপরই এই চুক্তির আইনি বৈধতাসহ নানা বিষয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই এগ্রিমেন্ট কবে হলো? কে করলো?
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন (১৪ জুলাই ২০২৫) অনুযায়ী, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্টের (NDA) কথা উল্লেখ করেছেন। তবে, এই চুক্তির সময়, তারিখ, বা কারা এটি সম্পাদন করেছেন, সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১০-১১ জুলাই ২০২৫-এ ওয়াশিংটন ডিসিতে শুল্ক নিয়ে দ্বিতীয় দফার আলোচনা হয়, যেখানে শেখ বশিরউদ্দিন নেতৃত্ব দেন। এই আলোচনার অংশ হিসেবে NDA স্বাক্ষরিত হতে পারে, তবে সুনির্দিষ্ট তারিখ বা স্বাক্ষরকারীদের নাম সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের চুক্তি করতে পারে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, বিদেশের সঙ্গে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করতে হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চুক্তি কেবল সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা যেতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার, যার প্রধান কাজ নির্বাচন পরিচালনা ও দৈনন্দিন প্রশাসন চালানো, সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বা নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করার এখতিয়ার রাখে না, যদি না তা জরুরি ও জনস্বার্থে হয়। বর্তমানে সংসদ নেই, তাই এই চুক্তি সংসদে পেশ করা সম্ভব নয়। এটি সংবিধানের স্পষ্ট লঙ্ঘন হতে পারে, যদি না এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে প্রমাণিত হয় এবং রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হয়। তবে, এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তৃতীয় পক্ষ কে?
একটি NDA-তে তৃতীয় পক্ষ বলতে সাধারণত এমন কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, বা দেশকে বোঝায়, যারা চুক্তির অংশ নয় এবং যাদের কাছে গোপনীয় তথ্য প্রকাশ করা নিষিদ্ধ। আপনার প্রশ্নে তৃতীয় পক্ষ হিসেবে কোনো তৃতীয় দেশের উল্লেখ করা হয়েছে, তবে এই NDA-র বিষয়বস্তু বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকায় কোনো নির্দিষ্ট দেশকে চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। সম্ভবত, এই চুক্তি বাণিজ্যিক আলোচনার অংশ হিসেবে স্বাক্ষরিত, এবং তৃতীয় পক্ষ হতে পারে অন্য কোনো দেশ, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, বা প্রতিযোগী বাজারের স্টেকহোল্ডার, যারা এই আলোচনার তথ্য থেকে সুবিধা নিতে পারে। তবে, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ না করায় সরকারের স্বচ্ছতার ঘাটতি স্পষ্ট।
চুক্তি কি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হয়েছে?
এই NDA রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হয়েছে কি না, সে সম্পর্কে কোনো প্রকাশ্য তথ্য নেই। সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এটি বাধ্যতামূলক। তবে, সংসদের অনুপস্থিতিতে এই প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে, তা স্পষ্ট নয়। যদি এটি জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে গোপন বৈঠকে পেশের বিধান থাকলেও, সংসদ না থাকায় এটি বাস্তবায়ন অসম্ভব। এই পরিস্থিতিতে, এ ধরনের চুক্তি করার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ ও সরকারের দায়বদ্ধতা
আপনার উল্লেখ অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছেন। তবে, সংসদের অনুপস্থিতিতে এ ধরনের গোপন চুক্তি করা এবং জনগণের কাছে তথ্য প্রকাশ না করা সংবিধানের স্বচ্ছতার নীতির পরিপন্থী হতে পারে। বাংলাদেশের জনগণের, যারা সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের ক্ষমতার মালিক, তাদের এই চুক্তি সম্পর্কে জানার অধিকার রয়েছে। সরকারের উচিত পরিষ্কার করা যে, এই NDA আদৌ স্বাক্ষরিত হয়েছে কি না, এবং যদি হয়, তবে এটি কেন সংবিধানের বিধান মেনে প্রকাশ করা হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের মতো একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে, যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বচ্ছতার ভিত্তিতে সম্পাদন হওয়া উচিত। অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা মূলত প্রশাসনিক ও নির্বাচনসংশ্লিষ্ট। জাতীয় নিরাপত্তা বা দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের এখতিয়ারে পড়ে না। এমন চুক্তি স্বচ্ছতা ও জনঅংশগ্রহণহীন হলে ভবিষ্যতে তা জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে যেতে পারে।
পাশাপাশি যদি চুক্তিতে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট কোনো উপাদান থাকে, তবে তা অবশ্যই সংসদীয় নজরদারির আওতায় আসা উচিত ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি একটি গভীর নৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি করছে।”
মন্তব্য করুন