Insight Desk
প্রকাশ : Jul 11, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

দেশজুড়ে বাড়ছে হত্যা-ধর্ষণ, আতঙ্কিত মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীসহ সারাদেশে খুন, ধর্ষণ, গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে। যৌথ বাহিনী, পুলিশ ও র‍্যাবের সাঁড়াশি অভিযানেও এই অপরাধ প্রবণতা কমানো যাচ্ছে না। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা পর্যন্ত কেউই রেহাই পাচ্ছেন না এসব নৃশংসতা থেকে। ফলে দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন নিহত হয়েছেন এবং ১১৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৭৬ জন নারী ও শিশু, যার মধ্যে ২৯২ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অপরদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে দেশে ১ হাজার ২৪৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০টি, মার্চে ৩১৬টি এবং এপ্রিলে ৩৩৬টি। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯ হাজার ১০০টি এবং ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৩৯টি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা অবনতি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলো এখনো পুরোপুরি আগের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে পারছে না। তারা বলছেন, কোনো অপরাধের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তখন পুলিশ তা নিয়ে তৎপর হয়। এর বাইরে পুলিশ এখনো মাঠ পর্যায়ে সক্রিয়তার প্রমাণ দিতে পারেনি।

দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মদ   বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা অনুযায়ী এখনো মনোবল ফেরেনি পুলিশের। তবে পুলিশ চেষ্টা করে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখতে।’

সাম্প্রতিক আরও উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা

গত ৩ জুলাই  সকালে উপজেলার কড়ইবাড়ী গ্রামে ‘মব’ সৃষ্টি করে মা, মেয়ে, ছেলেসহ একই পরিবারের তিনজনকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। নিহত তিনজন হলেন কড়ইবাড়ী গ্রামের খলিলুর রহমানের স্ত্রী রোকসানা বেগম ওরফে রুবি (৫৩), তাঁর ছেলে রাসেল মিয়া (৩৫) ও মেয়ে তাসপিয়া আক্তার ওরফে জোনাকি (২৯)। এ ছাড়া গুরুতর আহত হয়েছেন রোকসানার আরেক মেয়ে রুমা আক্তার (২৭)। বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে তিনি চিকিৎসাধীন।

ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া স্কুলছাত্রীকে (১৩) রান্নাঘরে রেখে জরুরি প্রয়োজনে পাশের বাড়িতে গিয়েছিলেন মা। এই সুযোগে এলাকার বখাটে বেলাল ওই ছাত্রীর মুখ জাপটে ধরে তাকে ধর্ষণ করতে পাশের ভুট্টাক্ষেতে নিয়ে যায়। কন্যাশিশুটি নিজেকে রক্ষায় চিৎকার করার চেষ্টা করলে তার মুখের ভেতর বালু ও মাটি গুঁজে দেয় বেলাল। এর পরও শিশুটি নিজেকে রক্ষায় ধস্তাধস্তি করলে তার এক হাত ও এক পা মুচড়ে ভেঙে দিয়ে গলা টিপে তাকে হত্যা করে। পরে ভুট্টাক্ষেত থেকে ওই স্কুলছাত্রীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের চর শৌলমারী এলাকায় এই নির্মম ঘটনাটি ঘটে।

গত মার্চে পাবনার সাঁথিয়ায় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে আমিরুল ইসলাম (৫০) নামের যুবলীগের এক কর্মীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে মাগুরায় সদর উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামে ধানক্ষেতে সার দিতে যাওয়ার সময় প্রতিপক্ষ দলের হামলায় জাহিদ জোয়ারদার (৫০) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মী খুন হন। গত জানুয়ারিতে পুলিশ পরিচয়ে দিয়ে ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরের চানপাড়া গ্রামে কাওসার লষ্কর (৫৫) নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। 

বিশ্লেষকেরা বলছেন, যখন রাজধানীসহ সারা দেশে শিশু থেকে বৃদ্ধা পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, গণপিটুনিতে মানুষ মারা যাচ্ছে, তখন স্পষ্ট হয়ে যায়, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এমন বাস্তবতায় সরকারের নীতি-নির্ধারকদের নীরবতা বা ঘটনাবলিকে 'বিচ্ছিন্ন' বলা আসলে দায়িত্ব এড়ানোর কৌশল।"

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে গণপিটুনির অন্তত ১৪১ ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৬৭ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত ১১৯ জন। গত ২২ জুন সাবেক নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাকে হেনস্তা করা ও জুতার মালা পরানোর ঘটনা ঘটে, গত ১৬ জুন লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে মানসিক ভারসাম্যহীন ৫০ বছর বয়সী এক বয়স্ক ব্যক্তিকে চোর সন্দেহ করে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা, গত ১৩ মে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে জাকির হোসেন (৪১) নামে এক যুবলীগ কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। 

গত ৪ মার্চ দুপুরে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ছিনতাইকারী সন্দেহে দুই ইরানি নাগরিককে গণপিটুনি দিয়ে আহত, গত ৩ মার্চ রাতে চট্টগ্রামের এওচিয়া ইউনিয়নে মাইকে ‘ডাকাত’ ঘোষণা দিয়ে ২ জনকে পিটিয়ে হত্যা, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাতে মাদারীপুরে ডাকাতির ঘটনায় শরিয়তপুরে ৭ জন ডাকাতকে গনপিটুনির ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২ জন আহত হয়েছেন। 

হবিগঞ্জের বাহুবলে মোবাইল ফোনসেট চুরির সন্দেহে জাহেদ মিয়া (২৮) নামে  এক যুবককে গাছের সঙ্গে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করার এক পর্যায়ে তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। পাবনার ঈশ্বরদীতে চুরির অভিযোগ এনে এক নারীকে লোহার খুঁটিতে বেঁধে মারধর করার পর জুতার মালা পরিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার মাত্রাও ভয়াবহ। সংস্থাটির তথ্যমতে, গত ছয় মাসে কমপক্ষে ১ হাজার ৪২ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন কমপক্ষে ৪৭৬ জন, যাদের মধ্যে ২৯২ (৬০ শতাংশ) জন ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ১১০ (২২ শতাংশ) জন নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জনকে ও আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন নারী । 

২৫৩ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ১৪৩ জন। গত মার্চ মাসে মাগুরায় আছিয়া নামে ৮ বছরের এক শিশুকে তার বোনের শশুর ধর্ষণের পর হত্যা চেষ্টা করে এবং শিশুটি ৮ দিন পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় (১৩ মার্চ) ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মারা যায়। 

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ফাতেমা নামের একটি শিশুকে (৬) ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ দীঘিতে ফেলে দেয়। গত ২৯ শে জুন কুমিল্লার মুরাদনগরের একটি গ্রামে বসতঘরের দরজা ভেঙে এক নারীকে (২৫) ধর্ষণ এবং ৩০ শে জুন ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলায় চাঁদা না পেয়ে স্বামীকে বেঁধে মারধর ও স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে । 

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, সব ধরনের অপরাধ বাড়ার পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে, দেশে পটপরিবর্তনের পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি হয়েছিল, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা তা এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি। ফলে অপরাধ কর্মকাণ্ড থামছে না। প্রায়ই চাঞ্চল্যকর অপরাধের ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হচ্ছে। এসব চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ায় দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়, দিন দিন হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, ডাকাতি, দস্যুতা ও চুরি, ছিনতাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে দেশে এক হাজার ১৩৯টি ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে, যা গড়ে প্রতি মাসে ২২৮টি। গত বছর প্রতি মাসে এই সংখ্যা ছিল গড়ে ১৫৮। এই পাঁচ মাসে হত্যা মামলা হয়েছে এক হাজার ৫৮৭টি, যা গড়ে প্রতি মাসে ৩১৭টি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা অবনতি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলো এখনো পুরোপুরি আগের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে পারছে না। তারা বলছেন, কোনো অপরাধের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তখন পুলিশ তা নিয়ে তৎপর হয়। এর বাইরে পুলিশ এখনো মাঠ পর্যায়ে সক্রিয়তার প্রমাণ দিতে পারেনি।

২৫ জুন রাতে কুষ্টিয়ার মিরপুরের ছাতিয়ান ইউনিয়নের কালিতলা সড়কে একটি লাশবাহী অ্যাম্বুল্যান্সে সশস্ত্র ডাকাতির ঘটনা ঘটে। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল থেকে আয়েশা খাতুন (৫০) নামের এক নারীর মরদেহ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা বাড়ি ফেরার সময় এই ঘটনা ঘটে। এ সময় অ্যাম্বুল্যান্সে থাকা স্বজনদের মারধরের পাশাপাশি তাদের স্বর্ণাংলকার ও টাকা লুট করা হয়। অলংকারের জন্য মরদেহেও তল্লাশি চালিয়েছে ডাকাতদল।

এ ছাড়া ২৯ জনু দুপুরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার হরিপুরে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঠিকাদারি নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষে বিরোধের জেরে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে ‘মব’ তৈরি করে মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতিকে বিবস্ত্র করে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। ভুক্তভোগী ব্যক্তি বন্দর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। এর আগের দিন গত শনিবার রাত ২টায় জামালপুরের ইসলামপুরে ইউপি সদস্য আবদুর রহিমকে (৪৮) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। উপজেলার কুলকান্দি ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ডের যমুনা নদীর দুর্গম চর জিগাতলা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। আবদুর রহিম ওই গ্রামের মৃত তৈয়বুর খন্দকারের ছেলে ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।

নিহতের স্বজন, পুলিশ ও স্থানীয়রা জানান, ঘটনার রাতে একদল লোক প্রশাসনের পরিচয়ে দরজা খুলতে বলে। দরজা না খোলায় ধাক্কাধাক্কি করতে থাকে। এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে দরজা খুলে দিলে দুর্বৃত্তরা আবদুর রহিমকে টেনেহিঁচড়ে বের করে উঠানে ফেলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। পরে দুর্বৃত্তরা যমুনা নদী দিয়ে ট্রলারে করে পালিয়ে যায়। পরিবারের সদস্যরা আবদুর রহিমকে উদ্ধার করতে গেলে তাঁদেরও পিটিয়ে আহত করা হয়। নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন,  রাতে মুখোশ পরে থাকায় তাঁরা কাউকে চিনতে পারেননি।

সম্প্রতি খুলনার রূপসা উপজেলার আইচগাতী ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে এক পক্ষের গুলিতে সাব্বির (২৭) নামের এক যুবক নিহত হন এবং দুজন গুলিবিদ্ধ হন। একই রাতে খুলনা মহানগরীর হরিণটানা থানাধীন রাজবাধ দক্ষিণপাড়ায় বালু ব্যবসায়ী বাবলু দত্তকে (৫০) নির্মমভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়। খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতির ফলে জেলার মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাবাড়ী ইউনিয়নে ছয় বছরের শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে হাবিল মিয়া নামের এক যুবক গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন। এর আগে ২৩ ও ২৪ জুন রাজধানীতে তিনটি পৃথক ঘটনায় তিন যুবক খুন হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, পুরনো বিরোধ ও জমিসংক্রান্ত ঘটনার জেরে খিলগাঁও, পল্লবী ও কামরাঙ্গীর চর এলাকায় এসব ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন মো. সাগর (২২), মো. রিফাত (২২) ও মো. রকি (৩১)।

 গত মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রামের আকবর শাহ থানার বিজয়নগর এলাকায় ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগে রায়হান (৩০) নামের এক যুবককে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করেছে স্থানীয় লোকজন।

জুনে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার মাঝের দেওর গ্রামের কামাল গাজী নামের এক ব্যক্তি একটি ডিডিও ফেসবুকে পোস্ট করেন। ১৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে দেখা যায়, অন্ধকারের মধ্যে কিছু মানুষ জোর করে এক তরুণীর হাত-পা বাঁধছে। এ সময় ওই তরুণীকে কান্নাকাটি করতে দেখা যায়। তিনি ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিলেন। এই ভিডিওটি ফেসবুকে পোস্ট করার পর তা ভাইরাল হয়। ভিডিওতে অভিযোগ করা হয়, তাঁর স্ত্রীকে কিছু মানুষ রাতের আঁধারে তুলে নিয়ে গেছে।

গত ১৬ মে রাতে একটি থাপ্পড়ের প্রতিশোধ নিতে হাজারীবাগ থানাধীন জিগাতলা বাসস্ট্যান্ডে সামিউর রহমান আলভি (২৩) নামে এক শিক্ষার্থীকে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হত্যা করে ২০-২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল। গত ১৩ মে মধ্যরাতে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মুক্তমঞ্চের পাশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা শাহরিয়ার আলম সাম্যকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। 

পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দুষ্কৃতকারীরা তাদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল দিয়ে সাম্যর মোটরসাইকেল ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। বিষয়টি নিয়ে বাকবিতণ্ডা শুরু হলে সাম্য ও তার বন্ধুদের ইট দিয়ে আঘাত করা হয়। একপর্যায়ে সাম্যকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে ডান পায়ের ঊরুর পেছন দিকে আঘাত করলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) মারা যায় সাম্য। এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে গ্রেফতার ও সর্বোচ্চ বিচারের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি চলছে।

গত ১৩ মে রাজধানীর মতিঝিল আরামবাগ এলাকায় গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে মোমিন (২০) নামে এক যুবককে হত্যা করা হয়। একই দিন রাজধানীর তেজগাঁও তেজকুনিপাড়া এলাকা থেকে রোজা মনি নামে সাড়ে ৪ বছরের এক শিশুর বীভৎস মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শিশুটিকে পাশবিক নির্যাতনের পর শ্বাসরোধ করে হত্যার পর বস্তায় ভরে ড্রেনে ফেলা হয়েছে বলে জানায় পুলিশ। 

গত ৯ মে সাভার পৌর এলাকার মজিদপুর কাঁঠালবাগান মহল্লায় আবদুস সাত্তার (৫৬) নামের এক ব্যক্তিকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে তার মেয়ে জান্নাত জাহান শিফা (২৩)। মরদেহে একাধারে ছুরিকাঘাতের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও পোস্ট করেন শিফা। মুহূর্তে ভাইরাল হওয়া এই ভিডিও নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। তিন হাজার টাকা দিয়ে একটি পুরোনো বাইসাইকেল কেনার জন্য নিজের খালার টাকা চুরি করতে গিয়ে ধরা খেয়ে দুই খালা মরিয়ম বেগম (৬০) ও সুফিয়া বেগমকে (৫২) হত্যা করে তাদের আপন ভাগনে।

গত ৯ মে মরিয়ম বেগমের রাজধানীর শেওড়াপাড়ার বাসায় ডাইনিং টেবিলের ওপরে থাকা ফল কাটা ছুরি দিয়ে একে একে দুই খালাকে আঘাত করে। তারা চিৎকার করায় রান্নাঘর থেকে শিল-পাটা এনে মাথায় আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করে নিজের পোশাক পরিবর্তন করে চলে যায়। রাজধানীর তুরাগে  স্বামীর দেওয়া আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান রিজিয়া বেগম (৪২) নামে এক গৃহবধূ। গত ৭ মে রাতে রিজিয়ার কাছে টাকা চেয়ে না পেয়ে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল তার স্বামী আবু সাঈদ। গত ১১ মে রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের লিফটের ফাঁকা জায়গা দিয়ে পড়ে কবির হোসেন শিকদার (৩৫) নামে এক রিকশাচালক মারা যান। তবে পরিবারের অভিযোগ, মাদকের দ্বন্দ্বে তাকে হত্যা করে লিফটের ফাঁকা জায়গা দিয়ে ফেলে দেওয়া হয়।

গত ১২ মে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় পারিবারিক বিরোধের জেরে রিয়াদ হোসেন (১৩) নামের এক স্কুল ছাত্রকে দিনদুপুরে বাবা-মায়ের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। গত ৬ মে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলায় পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী-শাশুড়িকে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে বাদল নামে এক ব্যক্তি। গত ১৫ এপ্রিল নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জে লাকী আক্তার নামে অন্তঃসত্ত্বা এক নারীকে মেলায় ঘুরতে নিয়ে নাগরদোলায় উঠিয়ে জবাই করে হত্যা করে তার স্বামী শাকিব। 

গত ৫ এপ্রিল পারিবারিক কোন্দলের জেরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার শ্যামেরকোনা গ্রামে ছেলে ও মেয়ের হাতে মুসলিম মিয়া (৪৭) নামে এক ব্যক্তি খুন হন। গেমে আসক্ত ছেলের হাত থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে গত ২২ মার্চ রাতে চুয়াডাঙ্গায় নামাজরত বাবা দোদুল হোসেন রিন্টুকে কুপিয়ে হত্যা করে ছেলে রিফাত হোসেন (১৭)। একই দিন শরীয়তপুরের নড়িয়ার মুক্তারের চর ইউনিয়নের চেরাগ আলী বেপারিকান্দিতে ছেলের এলোপাতাড়ি কোপে নিহত হন মকবুল হোসেন মোল্লা (৫৫)। এ ঘটনার পরপরই হার্ট অ্যাটাকে ঘাতকপুত্র রুবেল মোল্লাও (৩০) মারা যায়।

রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডও বাড়ছে 

গণমাধ্যম ও দলীয় সূত্র অনুযায়ী, গত এক বছরে অন্তত ২৬ জন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী পুলিশি হেফাজতে, কারাগারে কিংবা অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন। এসব মামলার অধিকাংশই রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপ্রসূত বলে দাবি করেছে পরিবার ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এছাড়া মব তৈরি করে শত শত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ১০ হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। যেগুলোর অনেককিছুই গণমাধ্যমে আসছে না। 

 গত সেপ্টেম্বরে শিশুর জন্য ওষুধ কিনতে বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন নগরীর বিনোদপুর এলাকায় গেলে হামলা হয় আব্দুল্লাহ আল মাসুদের ওপর।  হামলায় তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর দেখে সেনাবাহিনীর সহায়তায় রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই তিনি মারা যান। সম্প্রতি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জেরে মাগুরায় জ্যান্ত কবর দেওয়া কমিরুল মোল্যা নামের এক ব্যক্তিকে। এ ঘটনা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

এর আগে শেরপুরে ছাত্রলীগ নেতা শাকিলের ওপর ছাত্রদল ক্যাডারদের নির্মম হামলায় তার পা কেটে নেওয়া হয়।  ২৮ জুন পিরোজপুরের ইন্দুরকানি উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নে পারিবারিক বিরোধের জেরে ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. শহিদুল ইসলাম হাওলাদার ও তাঁর ভাবি মৌকলি বেগম (৪৮) কুপিয়ে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। এ ঘটনায় শহিদুল ইসলামের স্ত্রী রেহানা বেগমকেও (৪০) কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়েছে।

তারা আরও বলেন, "যেসব অপরাধ ভিডিও হয়ে ভাইরাল না হয়, সেগুলোর অধিকাংশই অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয়, সরকারের অপরাধ দমনের অভাবনীয় ব্যর্থতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেশাদারিত্বের অভাব। শুধু বাহিনীগুলোর ওপর দোষ চাপিয়ে লাভ নেই; আসলে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং জবাবদিহিহীন শাসনই এই নৈরাজ্যের মূল কারণ।"

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উপদেষ্টার মন্তব্যে বিতর্ক: 'আমি ফার্মের মুরগি খাই না, পাহাড়

1

৯ম পে-স্কেল দাবিতে আন্দোলন, পুলিশের দমন নীতির তীব্র নিন্দা

2

কক্সবাজারে মৌলবাদী হুমকির পর খুন হলেন যুবলীগ নেতা

3

অভ্যন্তরীণ ফ্যাসিবাদ, দুর্নীতির অভিযোগে এনসিপি ও বৈছাআ থেকে

4

অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে ‘ছাত্রলীগ নেতা’ বানিয়ে গ্রেপ্তার

5

নেত্রকোনায় থানার পাশেই মুদি ব্যবসায়ীকে গলাকেটে হত্যা

6

জেলে ঠাঁই নেই, তাই সেনানিবাসেই নতুন কারাগার!

7

ভোটের ৬০ ঘন্টা আগে বোয়িং চুক্তি নিয়ে বিতর্ক

8

পুলিশ নয় আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডে জড়িত শিবির!

9

রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অপসারণ চেষ্টা, আন্দোলনকারীদের

10

নাহিদের জবানবন্দিতে রাষ্ট্রীয় নথিতে রেকর্ড হলো ইউনূসের মিথ্য

11

শরীয়তপুরে অস্ত্র–গুলিসহ সাবেক ছাত্রদল নেত্রী ইলোরা গ্রেপ্তার

12

পুলিশ হেফাজতে বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু: পরিবারের দাবি পরিকল্

13

অগ্রযাত্রার পথে উল্টো হাওয়া: ঘর থেকে কর্মক্ষেত্র, সংকুচিত হচ

14

চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট আবার সাধারণ রোগীদেরও হবে কবে?

15

নসিপি ও বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মে নিরাপদ নয় নারী নেত্রীরা

16

দেশ কব্জায় আরও এগিয়ে গেল আমেরিকা, ইউনূসের প্রতারণা ফাঁস

17

বিমানবন্দরে আসিফ মাহমুদের ব্যাগে অ্যামোনেশন ম্যাগজিন শনাক্ত

18

নিষেধাজ্ঞা, মামলা-গ্রেপ্তারের মধ্যেও ফের রাজপথে ছাত্রলীগের ব

19

ইউনুস সরকারের অস্ত্র চুক্তি বিতর্কে খলিলুরের দায় এড়ানো মন্তব

20