ডেস্ক রিপোর্ট | ঢাকা
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি—পোশাকশিল্পই ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। একসময় দেশের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত রেডিমেড গার্মেন্টস (আরএমজি) খাত এখন বহুমুখী চাপের মধ্যে রয়েছে।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে পোশাক খাত থেকে, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১১ শতাংশের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে ভারতের কৌশলগত অগ্রযাত্রার ফলে এই খাতেই বড় ধরনের ফাঁটল ধরেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
কাঁচা সুতো ও টেক্সটাইল সংকটে পোশাকশিল্প
বাংলাদেশে টেক্সটাইল মিল থাকলেও গার্মেন্টস শিল্পের বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের সস্তা কাঁচা সুতো ও ফেব্রিকের উপর নির্ভরশীল ছিল। সম্প্রতি দেশীয় সুতো ব্যবহারের দাবিতে টেক্সটাইল মালিকদের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় বাজারে ভারতীয় কটনের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি। ভারত যদি বাংলাদেশকে বাইপাস করে সরাসরি ইউরোপে পোশাক রপ্তানি বাড়ায়, তাহলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য রপ্তানি ক্ষতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিনিয়োগে ভাটা
দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে বিদেশি বিনিয়োগে। আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোর কাছে স্থিতিশীলতা সবচেয়ে বড় শর্ত হলেও বাংলাদেশ সেই আস্থা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, চলমান সংকটে গার্মেন্টস খাতে ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। নতুন অর্ডার কমছে, পুরনো ক্রেতারাও বিকল্প দেশ খুঁজছে।
সীমান্ত, বন্দর ও ট্রান্সশিপমেন্ট চাপ
একসময় ভৌগোলিক সুবিধা ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছিল বাংলাদেশ। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ভারত স্থলবন্দর ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধায় কড়াকড়ি আরোপ করে।
ফলে নেপাল ও ভুটানে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি জটিল হয়ে পড়ে। বর্তমানে সমুদ্রপথে রপ্তানির জন্য অনেক ক্ষেত্রে ভারতের নাভা শেভা বন্দর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা সময় ও খরচ দুটোই বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ধাক্কা
বাংলাদেশি পোশাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ পরিস্থিতিকে আরও সংকটময় করে তোলে। তুলনামূলকভাবে ভারত ২৫ শতাংশ শুল্কে মার্কিন বাজারে সুবিধা পাচ্ছে। এতে ভারতীয় টেক্সটাইল রপ্তানি বাড়লেও বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
বিদ্যুৎ সংকট ও ভারতের লিভারেজ
দেশে পর্যাপ্ত দেশীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনের সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ ক্রমশ ভারতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। বকেয়া বিল সংক্রান্ত জটিলতায় ঝাড়খণ্ডের আদানি বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় একাধিক শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হয়।
পাকিস্তান–চীনের বিকল্প বাস্তবে দুর্বল
এই সংকটে পাকিস্তান ও চীন বিকল্প বাণিজ্য অংশীদার হওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে সেসব বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের চাহিদা সীমিত। ফলে এসব প্রস্তাব এখনো কার্যকর বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
ইউরোপে ভারতের বড় সাফল্য
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের প্রায় শূন্য শুল্ক সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার খবরে। প্রায় ২৪০–২৬০ বিলিয়ন ডলারের ইউরোপীয় বাজার ভারতের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। ভারতের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন, এই চুক্তি ভারতের টেক্সটাইল ও অ্যাপারেল খাতকে বড় উত্থানের সুযোগ দেবে।
ভারত ইতোমধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৯ লক্ষ কোটি টাকা সমমূল্যের টেক্সটাইল রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। গুজরাট, মহারাষ্ট্র, তামিলনাডু, অন্ধ্রপ্রদেশসহ একাধিক রাজ্য এই কৌশলের সুফল পেতে যাচ্ছে।
একমুখী নির্ভরতার ফাঁদ
বাংলাদেশের মিল মালিকরা ডিউটি-ফ্রি ভারতীয় আমদানি বন্ধ, সস্তা গ্যাস, করছাড় ও সহজ ঋণের দাবি তুললেও অর্থনীতিবিদদের মতে এগুলো সাময়িক সমাধান। প্রকৃত সংকট হলো—অতিরিক্ত একমুখী নির্ভরতা ও কৌশলগত প্রস্তুতির অভাব।
ভারত যখন ধীরে, পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্য ও ভূরাজনৈতিক কৌশলে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশ সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে পোশাকনির্ভর অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন