Insight Desk
প্রকাশ : Sep 27, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

জামিনের পর নতুন মামলা, জেলগেটে ফের আটক: আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ঘিরে একই চিত্র

আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারামুক্তি না হওয়া, কিংবা জেলগেট থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন মামলায় আবার গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে নতুন করে আইনের প্রয়োগ, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে এ ধরনের একাধিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।

২৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বিবিসি বাংলার একটি অনুসন্ধানধর্মী প্রতিবেদনে এমন কয়েকজন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে, যারা এক বা একাধিক মামলায় জামিন পাওয়ার পরও নতুন মামলা বা পুনরায় গ্রেপ্তারের কারণে দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, যার পরিচয় গোপন রাখতে ‘আহসান আহমেদ’ ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে, তাঁর নামে থাকা দুটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগে। কিন্তু জামিন পাওয়ার পরও তিনি কারাগার থেকে বের হতে পারেননি। নতুন করে অন্য থানার মামলা যুক্ত হয়। এরপর আরও কয়েকবার জামিন নেওয়ার পর আবার নতুন মামলা সামনে আসে। শেষ পর্যন্ত প্রায় দেড় বছর পর তিনি মুক্তি পান। 

বিবিসির একই প্রতিবেদনে ‘আশিকুর রহমান’ ছদ্মনামের আরেক ব্যক্তির অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে। একটি নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তারের ৭২ দিন পর তিনি জামিন পান এবং কারাগার থেকেও বের হন। কিন্তু কারাফটক পার হওয়ার পরই তাঁকে আবার আটক করা হয়। পরে অন্য একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয় এবং পুনরায় কারাগারে পাঠানো হয়। 

প্রতিবেদনটিতে কুষ্টিয়ার আরেকটি ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়াসিম আকরাম নামের এক ব্যক্তি বিবিসিকে জানান, তাঁর বাবা করিম প্রামাণিকসহ আটজন একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর নতুন একটি নাশকতার মামলায় গ্রেপ্তার হন।

 স্বজনদের অভিযোগ, আটজন তখনও কারাগারে ছিলেন, অথচ নতুন মামলার এজাহারে তাঁদের নাশকতার ঘটনায় ‘হাতে-নাতে’ গ্রেপ্তারের বর্ণনা দেওয়া হয়। পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ অবশ্য এ বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে। 

শ্যোন অ্যারেস্ট নিয়ে আইনে কী আছে

বাংলাদেশের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৭(এ) ধারায় কারাগারে থাকা কোনো ব্যক্তিকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আদালতে হাজির করা, নতুন মামলার কেস ডায়েরি বা প্রয়োজনীয় নথি আদালতে দেওয়া এবং আসামিকে শুনানির সুযোগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। ২০২৫ সালে এই ধারা যুক্ত হয় এবং ২০২৬ সালে তা আইনে অনুমোদিত হয়। 

বিবিসি বাংলাকে অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শাহজাহান বলেন, সব মামলায় জামিন হয়ে গেলে কাউকে শুধু মুক্তি ঠেকানোর জন্য নতুন করে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ করার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, জামিনের আগেই অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে হলেও কেস ডায়েরি, সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক উপাদান আদালতে দেখাতে হবে। 

এই আইনি ব্যাখ্যার প্রেক্ষাপটেই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে ধারাবাহিক ঘটনা

মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত মেয়র শহিদুল ইসলাম বাবু মীর হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার পর ৯ জুন জেলা কারাগার থেকে মুক্ত হন। কিন্তু জেলগেট থেকেই ডিবি ও থানা পুলিশের যৌথ দল তাঁকে আবার আটক করে। 

এর আগে ৪ মে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের ছয় নেতাকর্মী জামিনে কারামুক্ত হওয়ার পর জেলগেট থেকেই পুনরায় গ্রেপ্তার হন। তাঁদের মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ছিলেন। 

মাগুরা জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সদর উপজেলার সাবেক নারী ভাইস চেয়ারম্যান কাজী সোনিয়া সুলতানাও ৮ মে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর কারাগারের ফটক থেকে পুনরায় আটক হন।

লক্ষ্মীপুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি সৈয়দ আহম্মদ পাটওয়ারীর ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জামিনে বের হওয়ার সময় তাঁকে জেলগেট থেকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২০২৬ সালে মুক্ত হওয়ার পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বলা হয়, উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও তিন দফায় তাঁকে জেলগেট থেকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। 

২১ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন মিয়াজীকেও সাত মামলায় জামিন পাওয়ার পর নতুন আরেকটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। 

সাতক্ষীরার সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের নেত্রী লায়লা পারভীন সেঁজুতিকেও কারাগারে থাকা অবস্থায় অন্য একটি হত্যা মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানোর আদেশ দেয় আদালত। 

‘জামিন পেলেই অন্য মামলায় গ্রেপ্তার’ নির্দেশনার নজির

এ ধরনের ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ নেই। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ শাহজাহান তাঁর অধীন আট জেলার পুলিশ সুপারদের একটি চিঠিতে আওয়ামী লীগের যেসব নেতাকর্মী জামিনে মুক্তি পেয়ে দলকে সংগঠিত করতে ‘সক্ষম’, তাদের সংশ্লিষ্ট অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর নির্দেশ দেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়। 

ওই নির্দেশনার পর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ডিআইজিকে আইনি নোটিশও পাঠানো হয়। নোটিশে জামিন পাওয়ার পর রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে পুনরায় গ্রেপ্তারের নির্দেশ আইন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, সেই প্রশ্ন তোলা হয়। 

এই ঘটনাগুলো একত্রে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: পুনরায় গ্রেপ্তারগুলো কি প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন ও সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগের ভিত্তিতে হচ্ছে, নাকি রাজনৈতিক পরিচয় ও সম্ভাব্য রাজনৈতিক সক্রিয়তাও বাস্তবে বিবেচনায় আসছে?

কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রেক্ষাপট

২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। এই সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে আদালতে রিটও হয়েছিল। তবে রিটটি পরে ‘not pressed’ হিসেবে খারিজ হয়; ওই আদেশে প্রজ্ঞাপনটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি।

এর পর থেকে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। জুনে ডিএমপি এক দিনের বিশেষ অভিযানে ১১৮ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানায়, যাদের মধ্যে ২৬ জন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী বলে পুলিশ উল্লেখ করে। 

আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নতুন কোনো মামলায় সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রাথমিক প্রমাণ থাকলে তাঁকে নতুন করে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে। কিন্তু আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর একই ব্যক্তিকে একের পর এক মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হলে সেটি জামিনের কার্যকারিতা এবং বিচারিক সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিজ্ঞতাগুলোও সেই প্রশ্নকেই সামনে এনেছে। একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর যদি নতুন মামলা ধারাবাহিকভাবে যুক্ত হতে থাকে এবং কারাগার থেকে মুক্তির মুহূর্তে আবার গ্রেপ্তার করা হয়, তাহলে আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে একজন ব্যক্তিকে অনির্দিষ্ট সময় আটকে রাখার সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। 

এ ধরনের প্রক্রিয়া অতীতেও বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে। তাই বর্তমান সময়ে একই ধরনের অভিযোগ সামনে এলে সেই পুরোনো বিতর্কই নতুন করে ফিরে আসে।

আইনের শাসনের মূলনীতি অনুযায়ী, রাজনৈতিক পরিচয় কাউকে অপরাধের দায় থেকে মুক্তি দেয় না। একইভাবে রাজনৈতিক পরিচয় নিজেই কারও বিরুদ্ধে নতুন মামলা, পুনরায় গ্রেপ্তার বা দীর্ঘমেয়াদি আটক রাখার ভিত্তি হতে পারে না। অভিযোগ থাকলে তদন্ত হবে, প্রমাণ থাকলে বিচার হবে; কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া, বিচারিক নজরদারি এবং ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার নিশ্চিত করাই জরুরি।

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে বারবার একই ধরনের জেলগেট গ্রেপ্তার ও নতুন মামলা সামনে আসায় এখন প্রশ্নটি আরও স্পষ্ট: আদালতের জামিনের পরও যদি নতুন মামলা ও পুনরায় গ্রেপ্তারের চক্র চলতেই থাকে, তাহলে জামিনের বাস্তব অর্থ কতটুকু থাকে?

সূত্র: বিবিসি বাংলা, ইত্তেফাক, বিডিনিউজ২৪, প্রথম আলো, জাগো নিউজ।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আমেরিকা থেকে যুদ্ধবিমান কেনাতেই কি এই বিমান বিধ্বস্তের পরিকল

1

জামায়াতের ইশতেহারে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বার্তা, তবু ভোটের

2

সিলেটে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রাজ্জাক ছুরিকাঘাতে খুন, ছাদে মি

3

যশোরের শার্শায় মধ্যরাতে প্রবাসীর স্ত্রীর কক্ষ থেকে এক জামায়া

4

জামায়াতের নারী-বিদ্বেষ বিতর্কে ফের ‘হ্যাক’ নাটক

5

রাউজানে প্রশাসন নীরব, অপরাধীরা দাপটের সঙ্গে চলাফেরা: ইউনূস স

6

২০২ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সবাই অকৃতকার্য: ভেঙে পড়ছে দেশের শিক্ষ

7

গ্যাস সংকটে বন্ধ অধিকাংশ সার কারখানা

8

তৃণমূলের আস্থার প্রতীক নুর মিয়া, ঐক্যবদ্ধ যুবলীগের লক্ষ্য এখ

9

বিএনপির মন্ত্রী: ড. খলিলুর রহমানকে ঘিরে নতুন বিতর্ক

10

ঢাবির নিয়ন্ত্রণে শিবির, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বানাচ্ছে দাবার

11

ভোটার ছিল না ভোটকেন্দ্রে ভোট ছিল গণনার টেবিলে: শেখ হাসিনা

12

মন্ত্রীর দখলে বনের ১৩১ একর - সাথে সেই জঙ্গল মনির, সেই বাউন্ড

13

ইউনূসের থাবায় ধ্বংসের পথে বাংলাদেশ

14

সাদাপাথর লুটের আসামি এখন সরকারি সফরের সঙ্গী, বদল কি আসলেই এস

15

শিবির কে প্রতিটি ক্যাম্পাসে হাজার বার গুপ্ত বলার ঘোষনা ছাত্র

16

শিবির নেতাদের সরাসরি পুলিশে নিয়োগের মিশনে ইউনূস ব্রিগেড

17

নাহিদ ইসলাম ছাত্রলীগ দিয়ে দল বড় করতে চায় - আবদুর নুর তুষার

18

স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে রাঙামাটিতে গ্রেপ্তার ৫, তাদের একজ

19

কাজ কথা বলে, সময় তার সাক্ষী, রূপপুরে দৃশ্যমান উন্নয়নের শক্ত

20