নিজস্ব প্রতিবেদক
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে ঘন ঘন বন্যার প্রকোপে বিপর্যস্ত জনজীবন। একের পর এক দুর্যোগে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে হাজারো পরিবার। কিন্তু এই দুর্যোগকালে জনগণের আবেগ ও সহানুভূতির সুযোগ নিয়ে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠে এসেছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে এবার জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
২০২৪ সালের ভয়াবহ ফেনী বন্যার সময় দেশজুড়ে সহানুভূতির ঢল নামে। হাজারো মানুষ নগদ অর্থ ও পণ্য সহায়তা পাঠান বন্যার্তদের জন্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) পরিণত হয় একটি গণত্রাণ কেন্দ্রস্থলে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে মানুষ ট্রাকভর্তি ত্রাণ নিয়ে হাজির হয়। শিশুদের মাটির ব্যাংক, বৃদ্ধের পেনশনের টাকা—সব কিছু ঢেলে দিয়েছিল কেবল বিপন্নদের পাশে দাঁড়াতে।
তবে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে: সেই সহায়তা ঠিকভাবে কাজে লেগেছে তো? অভিযোগ উঠেছে, শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস ফেনীর বন্যার সময় শিক্ষার্থীদের নামে কোটি কোটি টাকা তুলেছিলেন। ঘর নির্মাণ, বাঁধ মেরামত ও পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, অথচ বাস্তবে সেসব প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। বন্যা–পরবর্তী বছরগুলোতে কোনো স্থায়ী ঘর, কোনো বাঁধ কিংবা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রের অস্তিত্ব খুঁজে পাননি দুর্গতরা।
এনসিপি-র দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ এক সংবাদ সম্মেলনে স্বীকার করেছেন, গণতহবিলের অর্থ সরাসরি বিতরণ না করে তা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন যা পেয়েছি, আমরা আপডেট দিয়েছি। পরে সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব না হওয়ায় মন্ত্রণালয়কে দিয়েছি বিতরণের জন্য। প্রায় ১৬ কোটি টাকার অডিট রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে, তবে দুই-তিন লাখ টাকার হিসাব দেওয়া যায়নি।”
তবে এই হিসাবের স্বচ্ছতা নিয়ে উঠেছে জোরালো প্রশ্ন। হাসনাত নিজেই প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে অনুদানের কিছু অংশ ‘লোপাট’ হয়েছে।
এর আগে গত বছর বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসনাত বলেছিলেন, বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় এখন ওই অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ব্যয় করা হবে। তবে পরে বন্যা নিয়ে তাদের আর কর্মকাণ্ড দেখা যায়।
জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন বলেন, “আগে যিনি টিউশনি করে সংসার চালাতেন, এখন তিনি বিএমডব্লিউ নিয়ে ঘোরেন। অনেকে মনে করছেন, অনুদানের অর্থে ব্যক্তিস্বার্থেই গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল জীবনযাপন।
এদিকে যারা এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, তারা বলছেন—তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগকারীরা লিখেছেন, “যাদের ঘর ভেসে গিয়েছিল, আজ তাদেরই চুপ থাকতে বলা হচ্ছে!”
২০২৫ সালের সম্ভাব্য আরেকটি বন্যা সামনে রেখে জনমনে আবারও প্রশ্ন জেগেছে—এইবারও কি আবেগকে পুঁজি করে হবে আরেক দফা প্রতারণা? এনসিপি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও জবাবদিহির দাবি এখন সোচ্চার হয়ে উঠছে নানা মহলে।
মন্তব্য করুন