দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্য সংকটকে মহামারির পর্যায়ে নিয়ে গেছে। টিকার ঘাটতি, নীতিগত ভুল এবং স্বাস্থ্য খাতের দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে ইতোমধ্যে অন্তত ১৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। দেশের ৫৬ জেলার পরিস্থিতি এখন উদ্বেগজনক, আর প্রায় ৯ হাজার আক্রান্ত শিশু জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে। শিশুদের এভাবে মৃত্যুর ঘটনায় পরিবারগুলোর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে পরিবেশ। কোমলমতি শিশুদের হারিয়ে শোকে কাতর অনেক পরিবার।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি; বরং ইউনূস সরকারের নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের ফাঁক, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও উদাসীনতা তৈরি হওয়াই এর প্রধান কারণ। অধ্যাপক মোস্তাক হোসেন মনে করেন, টিকা ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অন্তর্র্বতী সরকারের অপরিকল্পিত পরিবর্তন পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। তিনি বলেন, টিকা কেনার পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগটি ভালো হতে পারত, কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া তা বাস্তবায়ন করায় পুরো কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে। এর নেতিবাচক প্রভাব এখন স্পষ্ট।
অধ্যাপক লেলিন চৌধুরী বলেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ লাখ শিশু জন্মগ্রহণ করে এবং এর মধ্যে প্রায় ৯৮ শতাংশ শিশু টিকাদানের আওতায় ছিল। কিন্তু টিকা সংগ্রহে অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতির কারণে একটি বড় অংশ টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এই অবহেলা সরাসরি শিশুদের জীবনঝুঁকিতে ফেলেছে, বলেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বতী সরকার দীর্ঘদিনের টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতি বাতিল করে যথাসময়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। পূর্বের ব্যবস্থায় বিদেশি সংস্থাগুলো প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থায়ন করত এবং বাকি ৪০ শতাংশ সরকার দিত। কিন্তু সেই কাঠামো বাতিলের পর নতুন করে অর্থায়ন নিশ্চিত করা হয়নি এবং রাজস্ব খাত থেকে বরাদ্দও সময়মতো পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে থাকা নূরজাহান বেগম এর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি এবং কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। ফলে টিকার সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয় এবং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
অন্যদিকে, অধ্যাপক বেনজির আহমদ সতর্ক করে বলেন, টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ভেঙে গেলে আগে নিয়ন্ত্রিত রোগগুলো পুনরায় বিস্তার লাভ করে। ইপিআই কর্মসূচির মাধ্যমে যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছিল, তা এখন ঝুঁকির মুখে পড়েছে, বলেন তিনি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতন নাগরিকরা দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে ইউনূসসহ তার উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করা হয়েছে, যাতে সংশ্লিষ্টরা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশত্যাগ করতে না পারেন।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, দ্রুত টিকার সরবরাহ নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
মন্তব্য করুন