দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দুইশ ছাড়িয়েছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাবে, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরেই মারা গেছেন ১০৪ জন, যা চলতি বছরের যেকোনো মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
একই সময়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ১ হাজার ৮৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে বছরের শুরু থেকে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৭ হাজার ৩৬৭ জনে। তাঁদের মধ্যে ৬২ হাজার ১১৭ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সেপ্টেম্বর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত আগের দিনের হিসাবে একদিনে ১ হাজার ৮৭২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যা চলতি বছরে একদিনে সর্বোচ্চ। ওই দিন পাঁচজনের মৃত্যুর তথ্যও জানানো হয়।
২৩ সেপ্টেম্বরের হিসাবে নতুন রোগীদের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে ১৭৩ জন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের হাসপাতালে ১৭৯ জন ভর্তি হয়েছেন। দুই সিটির বাইরে ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ৪০৫ জন। চট্টগ্রামে ৩১৭, খুলনায় ২৮০, বরিশালে ১৭৮, রাজশাহীতে ১৫৬, ময়মনসিংহে ১১৩, রংপুরে ৫৯ এবং সিলেটে আটজন ভর্তি হয়েছেন।
আগস্টে ডেঙ্গুতে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। জুলাইয়ে মৃত্যু হয়েছিল ৩৬ জনের এবং জুনে ১৩ জনের। সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার আগেই ১০৪ জনের মৃত্যু হওয়ায় চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে মাসটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
একদিনে আক্রান্তের রেকর্ড
সেপ্টেম্বরজুড়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১০৭। ১৭ সেপ্টেম্বর সেটি বেড়ে ১৭৬ জনে পৌঁছায়। মাত্র ছয় দিনের ব্যবধানে ২৩ সেপ্টেম্বর মোট মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ, হটস্পটভিত্তিক মশক নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করা হচ্ছে।
হামের তথ্য নিয়ে সতর্কতা
ডেঙ্গুর পাশাপাশি হাম পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগের খবর প্রকাশিত হচ্ছে। তবে ২৩ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বর্তমানে দৃশ্যমান সরকারি হাম পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্মে গত ২৪ ঘণ্টায় ১১ জনের মৃত্যু, ১ হাজার ২৭০ জন আক্রান্ত এবং মোট ১ হাজার ৭৬ জনের মৃত্যুর পরিসংখ্যানটি দেখা যাচ্ছে না। প্ল্যাটফর্মটির বর্তমান টেবিলে শূন্য দেখানো হচ্ছে এবং নিচে তথ্য হালনাগাদের ভিত্তিতে পরিবর্তনের উল্লেখ রয়েছে।
তাই এই তিনটি সংখ্যা সরকারি বুলেটিনের অন্য কোনো সংস্করণ বা নির্ভরযোগ্য উৎস দিয়ে নিশ্চিত না করে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নিরঙ্কুশ তথ্য হিসেবে ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন
ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি মশক নিয়ন্ত্রণ, হটস্পট শনাক্তকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধ কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্ন সামনে আনছে। তবে “সরকারের অব্যবস্থাপনায় ২০১ জনের মৃত্যু” এমন সরাসরি কারণগত সিদ্ধান্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান থেকে পাওয়া যায় না। সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা থাকলে সেটি বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য হিসেবে আলাদাভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিশ্চিত পরিসংখ্যানেই পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট। বছরজুড়ে ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, মৃত্যু ছাড়িয়েছে ২০০ এবং শুধু সেপ্টেম্বরেই প্রাণ গেছে ১০৪ জনের। সেপ্টেম্বরের বাকি দিনগুলো সামনে রেখে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধ ও চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকছে।
মন্তব্য করুন