মা শেখ হাসিনার ৮০তম জন্মদিনে তাঁর জন্মের আগের এক আবেগঘন পারিবারিক ও রাজনৈতিক স্মৃতি তুলে ধরেছেন সজীব ওয়াজেদ জয়। শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া দীর্ঘ এক স্ট্যাটাসে তিনি ১৯৪৭ সালের ভারত বিভক্তির প্রাক্কালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ঘিরে একটি স্মৃতি বর্ণনা করেন।
জয়ের লেখায় উঠে আসে, ১৯৪৭ সালের সেই উত্তাল সময়ে যুক্তবাংলার মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শরণার্থীদের সীমান্ত পারাপার তদারকির জন্য শেখ মুজিবকে একটি স্বেচ্ছাসেবক দল গঠনের দায়িত্ব নিতে বলেন। সোহরাওয়ার্দী একই সঙ্গে জানতেন, শেখ মুজিবের স্ত্রী রেণু তখন অসুস্থ এবং অন্তঃসত্ত্বা। তাই দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাঁকে স্ত্রীর কথা ভেবে দেখারও পরামর্শ দিয়েছিলেন।
সজীব ওয়াজেদ জয় লিখেছেন, শেখ মুজিব কয়েকদিনের জন্য বাড়ি ফিরে এসে পরিস্থিতি সম্পর্কে বঙ্গমাতাকে জানান। সে সময় শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ভেবেছিলেন হয়তো অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় স্বামীকে কিছুদিন কাছে পাবেন। কিন্তু দেশের মানুষের প্রয়োজনে দায়িত্ব নেওয়ার কথা শুনে তিনি ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে স্বামীকে দেশের কাজে যেতে উৎসাহ দেন।
জয়ের পোস্টে বঙ্গমাতার সেই চিঠির বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তিনি শেখ মুজিবকে জানিয়েছিলেন, তাঁর জন্ম শুধু একজন স্বামী হিসেবে নয়, দেশের কাজ করার জন্যও। দেশের দায়িত্বকেই তিনি সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখেছিলেন। নিজের জন্য চিন্তা না করে শেখ মুজিবকে নিশ্চিন্তে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
এই ঘটনাকে বঙ্গমাতার ব্যক্তিত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন জয়। তাঁর ভাষ্যে, ব্রিটিশ ভারত যুগের এক অল্পবয়সী নারী, যাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত, তিনি এমন গভীর রাজনৈতিক সচেতনতা, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল মুহূর্তেও দেশের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা তাঁকে আলাদা মর্যাদা দেয় বলে উল্লেখ করেন জয়।
জয়ের বর্ণনায়, বঙ্গমাতার উত্তর পাওয়ার পর শেখ মুজিব আবার সোহরাওয়ার্দীর কাছে গিয়ে দায়িত্ব গ্রহণের কথা জানান। তখন সোহরাওয়ার্দী জানতে চান, তিনি রেণুর সঙ্গে পরামর্শ করেছেন কি না। শেখ মুজিব জানান, রেণু তাঁকে দেশের কাজে যেতে বলেছেন। এ কথা শুনে সোহরাওয়ার্দী বঙ্গমাতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছিলেন বলেও জয়ের পোস্টে উল্লেখ করা হয়।
জয়ের লেখার সবচেয়ে আবেগঘন অংশটি আসে এরপর। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, যে সময় বঙ্গমাতা এই চিঠি লিখেছিলেন, তখন তাঁর গর্ভে ছিলেন সেই সন্তান, যিনি পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর আদরের ‘হাচু’ এবং বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন।
শেখ হাসিনা ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ সন্তান। আওয়ামী লীগের প্রকাশিত জীবনীসূত্রেও তাঁর জন্মতারিখ ও পারিবারিক পরিচয়ের এই তথ্য উল্লেখ রয়েছে।
জয় তাঁর স্ট্যাটাসে মায়ের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রেরণার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার ত্যাগ, দায়িত্ববোধ এবং সংগ্রামী মানসিকতার যোগসূত্র টেনেছেন। তাঁর মতে, শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও সংগ্রামী চেতনার শিকড় রয়েছে তাঁর বাবা-মায়ের জীবনদর্শন এবং পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যের মধ্যে।
শেখ হাসিনার জন্মদিন ঘিরে দেওয়া এই পোস্ট তাই কেবল একটি শুভেচ্ছাবার্তা নয়। এতে উঠে এসেছে একটি পরিবারের ব্যক্তিগত স্মৃতি, দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ, একজন স্ত্রীর আত্মত্যাগ এবং সেই উত্তরাধিকারের মধ্যেই জন্ম নেওয়া এক কন্যার রাজনৈতিক জীবনের সূচনার প্রতীকী গল্প।
দীর্ঘ পোস্টের শেষে সজীব ওয়াজেদ জয় অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও আবেগঘন ভাষায় মাকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি লেখেন,
“শুভ জন্মদিন, মা!”
মায়ের জন্মদিনে জয়ের এই স্মৃতিচারণে রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি পরিবারের ভেতরের ভালোবাসা, দায়িত্ব ও ত্যাগের একটি ব্যক্তিগত অধ্যায়ও সামনে এসেছে। শেখ হাসিনার ৮০তম জন্মদিনে সেই স্মৃতিই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
মন্তব্য করুন