নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানী গুলশানের দ্য ওয়েস্টিন হোটেল থেকে সম্প্রতি ৫০ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক টেরেন্স আরভেল জ্যাকসনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তিনি এ বছরের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে এসেছিলেন এবং ‘তার সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজে’ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভ্রমণ করছিলেন।
প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের গণমাধ্যম জানিয়েছিল, জ্যাকসন ব্যবসায়িক কাজে বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তারা প্রথমবার স্বীকার করেছেন যে, তিনি সরকারি কাজে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়েছিলেন।
রহস্যজনক ঘটনা ঘিরে আরও তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ দাবি করেছে, জ্যাকসন ২৯ আগস্ট দুপুর ৩টায় হোটেলে চেক-ইন করেছিলেন। তবে হোটেল ও নিরাপত্তা সূত্র জানায়, তিনি আসলে ২৭ আগস্ট চেক-ইন করেছিলেন। বুকিং-এর অনুরোধটি মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তার পক্ষ থেকে করা হয় এবং হোটেলের রিজার্ভেশন ডিপার্টমেন্ট এটি নিশ্চিত করেছে।
হোটেল কর্মীরা জানিয়েছেন, ২৭ আগস্ট তিনি হোটেলের ভেতরে-বাইরে চলাফেরা করেছেন। পরদিন (২৮ আগস্ট) হোটেলের রেস্তোরাঁয় সকালের নাস্তা ও রাতের খাবার গ্রহণ করেন। ২৯ আগস্ট তিনি বাইরে যান, তবে ৩০ আগস্ট এবং ৩১ আগস্ট একদম বাইরে যাননি। ৩১ আগস্ট তার মৃতদেহ কক্ষে পাওয়া যায়।
মৃত্যুর পর হোটেল তৎক্ষণাৎ থমথমে হয়ে ওঠে। ফ্রন্ট ডেস্ক সব কর্মচারীকে কক্ষে প্রবেশ না করার নির্দেশ দেয়। হোটেলের একটি সূত্র জানিয়েছে, সিনিয়র কর্মকর্তা কিছু জুনিয়রকে সতর্ক করেছিলেন যেন তারা বেশি কিছু জানতে চেষ্টা না করে এবং মিডিয়ার কল এড়ায়।
৩১ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টায় তিনজন মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তা হোটেলে পৌঁছে হোটেল কর্মীদের নির্দেশ দেন, “আমাদের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো কথা কাউকে বলবেন না।” সূত্রে বলা হয়েছে, জ্যাকসনের মরদেহ তার বিছানায় “সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়” পাওয়া গেছে।
নর্থইস্ট নিউজের তথ্য অনুযায়ী, জ্যাকসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলের একটি রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হোটেল সূত্র জানায়, এমন “সংকটকালীন পরিস্থিতিতেও” মার্কিন দূতাবাস সংবাদ বিবৃতি জারি করতে চাইনি।
মার্কিন দূতাবাস তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও চিকিৎসক নিয়ে আসে এবং জ্যাকসনের থাকার কক্ষ নম্বর ৮০৮ “নীল ও হলুদ” টেপ দিয়ে ঘিরে ফেলে। পরে ৩১ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দূতাবাস জ্যাকসনের মৃতদেহ উদ্ধার করে। সঙ্গে নেওয়া হয় তার ব্যবহৃত কয়েকটি বড় স্যুটকেস এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রী।
১ সেপ্টেম্বর, মার্কিন আর্মির ১ম স্পেশাল ফোর্সেস কমান্ড (এয়ারবর্ন)-এর একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, ঢাকার হোটেলে মৃত অবস্থায় পাওয়া মার্কিন নাগরিকটি উত্তর ক্যারোলিনার রেফোর্ডে বসবাসকারী একই ব্যক্তি নন।
নর্থইস্ট নিউজের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জ্যাকসন ১ম স্পেশাল ফোর্সেস কমান্ডের (এয়ারবর্ন) কমান্ড ইন্সপেক্টর জেনারেল ছিলেন এবং পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে অবসর নেওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। তার লিঙ্কডইন পেজে লেখা ছিল, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীতে ২০ বছরের বেশি সময় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধকালীন মোতায়েন ও দায়িত্বে ছিলেন।
মার্কিন আর্মি স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডের পাবলিক অ্যাফেয়ার্স অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল অ্যালি স্কট ৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে নর্থইস্ট নিউজকে জানিয়েছিলেন যে, ঢাকায় কোনো চলমান অভিযান নেই এবং মৃত্যুর বিষয়ে মন্তব্য করার ক্ষমতা তাদের নেই। বিস্তারিত তথ্যের জন্য তারা ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের দিকে নির্দেশ দিয়েছেন।
নর্থইস্ট নিউজ জানায়, জ্যাকসন বাংলাদেশের অবস্থানকালে অন্তত চার মাস ধরে বাংলাদেশি সেনা অফিসারদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন। প্রশিক্ষণের সময় তিনি প্রায়শই নাইন লাইন অ্যাপারেলসের টি-শার্ট পরতেন, যা ২০১৩ সালে বিশেষ ফোর্সেস অফিসার টাইলার মেরিট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার সঙ্গে অন্যান্য মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস অফিসারও ছিলেন।
হোটেল সূত্র জানায়, জ্যাকসনের মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগে ৫-৬ জন মার্কিন সেনা অফিসার ইউনিফর্মে হোটেলের লবিতে দেখা গেছে। তারা হোটেলের অতিথি ছিলেন। অদ্ভুতভাবে, জ্যাকসনের লিঙ্কডইন পেজের সংবেদনশীল অংশ পরে মুছে ফেলা হয়েছে। যেখানে উল্লেখ ছিল, তিনি বর্তমানে ১ম স্পেশাল ফোর্সেস কমান্ডে কমান্ড ইন্সপেক্টর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে অবসর নিতে চান।
নর্থইস্ট নিউজ জানায়, অন্যান্য মার্কিন অফিসারও বাংলাদেশে থাকছেন এবং তারা বাংলাদেশি সেনা অফিসারদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই উপস্থিতি সম্পর্কে অবগত থাকলেও, আইএসপিআর কোনো মন্তব্য করেনি। জ্যাকসনের ব্যক্তিগত জীবনেও শখ ছিল। তিনি রেডিও-কন্ট্রোল (আরস) বিমানপ্রেমী ছিলেন এবং অ্যারিজোনায় বসবাসরত বন্ধুদের সঙ্গে এই শখ উপভোগ করতেন। তার অ্যারিজোনার বন্ধুরা তার মৃত্যুর খবর শোনে শোক প্রকাশ করেছেন।
মন্তব্য করুন