জাসদ সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গত ২০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রায়ে দেখা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের মধ্যে তিনটিতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং পাঁচটি অভিযোগে খালাস দেওয়া হয়েছে। তিন অভিযোগে পৃথকভাবে ১০ বছর করে কারাদণ্ড হলেও সাজাগুলো একই সঙ্গে চলবে। ফলে তাঁকে কার্যত ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে।
পূর্ণাঙ্গ রায় সামনে আসার পর আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ইনুর বিরুদ্ধে দায় প্রতিষ্ঠার ধরন। বিশেষ করে কুষ্টিয়ায় ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশ দেওয়া এবং দেশজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষকে হত্যা ও আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ থাকা ৮ নম্বর অভিযোগটি ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়নি। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি, ১৪ দলের বৈঠকে কথিত ‘শুট-অ্যাট-সাইট’ নীতির প্রতি সমর্থন, প্রাণঘাতী অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং সরকারের হত্যা ও দমন-পীড়নকে প্রকাশ্যে সমর্থনের অভিযোগ থাকা ১, ২, ৪ ও ৫ নম্বর অভিযোগ থেকেও তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ট্রাইব্যুনাল ইনুকে দমনমূলক কর্মকাণ্ডের সব ধরনের দায় থেকে মুক্ত বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আদালতের রায়ে ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি দায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
কোন তিন অভিযোগে দোষী ইনু
৩ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইনু ফোনে কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে আন্দোলনরত ছাত্র ও সাধারণ মানুষের ছবি ব্যবহার করে তালিকা তৈরি এবং তাঁদের গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই অভিযোগে তাঁকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
৬ নম্বর অভিযোগে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোটের একটি বৈঠকে অংশগ্রহণ এবং সেখানে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টি আদালত বিবেচনায় নিয়েছে। এ অভিযোগেও তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড এবং এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
৭ নম্বর অভিযোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোন কথোপকথনের মাধ্যমে কথিত ষড়যন্ত্রে ইনুর সম্পৃক্ততা ট্রাইব্যুনাল প্রমাণিত বলে সিদ্ধান্ত দেয়। এই অভিযোগেও ১০ বছরের কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণের আদেশ দেওয়া হয়েছে।
তিন অভিযোগ মিলিয়ে পৃথকভাবে ৩০ বছরের সাজা দেওয়া হলেও সেগুলো যুগপৎ কার্যকর হবে। ফলে কারাভোগের কার্যকর মেয়াদ ১০ বছর।
পাঁচ অভিযোগে কেন খালাস
রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রসিকিউশনের আনা আটটি অভিযোগের পাঁচটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়নি বলে ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
১ নম্বর অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতীয় একটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ ছিল।
২ নম্বর অভিযোগে ১৯ জুলাই গণভবনে অনুষ্ঠিত ১৪ দলের বৈঠকে আন্দোলন দমনে কথিত ‘শুট-অ্যাট-সাইট’ নীতি গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নে সমর্থনের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
৪ নম্বর অভিযোগ ছিল আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের পরিকল্পনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার। ৫ নম্বর অভিযোগে উসকানিমূলক বক্তব্য এবং সরকারের হত্যা ও দমন-পীড়নকে সমর্থনের অভিযোগ ছিল।
সবচেয়ে গুরুতর ৮ নম্বর অভিযোগে কুষ্টিয়ায় ছয় আন্দোলনকারীকে হত্যার নির্দেশসহ দেশব্যাপী ব্যাপক হত্যা ও আহত করার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এসব পাঁচ অভিযোগেই ইনুকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
সরাসরি হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত নয়, তবু দায় কোথায়
পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর রাজনৈতিক ও আইনি আলোচনার বড় জায়গা তৈরি হয়েছে এখানেই। কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় ইনুর সরাসরি নির্দেশের অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়নি। বিচার চলাকালে তাঁর আইনজীবীরাও বলেন, হত্যাকাণ্ডের সময় ইনু কুষ্টিয়ায় উপস্থিত ছিলেন না এবং সাক্ষীদের বক্তব্যেও তাঁর উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
অন্যদিকে ট্রাইব্যুনালের অবস্থান হলো, সরাসরি হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও অন্য তিন অভিযোগে তাঁর কর্মকাণ্ড পৃথকভাবে ফৌজদারি দায় সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ আদালতের সিদ্ধান্তে ইনুর সাজা কুষ্টিয়ার ছয়জনকে সরাসরি হত্যার দায়ে নয়, বরং প্রমাণিত বলে বিবেচিত ৩, ৬ ও ৭ নম্বর অভিযোগের ভিত্তিতে।
এই পার্থক্যটিই পূর্ণাঙ্গ রায়ের রাজনৈতিক ও আইনি তাৎপর্য নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিক তৈমুর ফারুক তুষার। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইনুর বিরুদ্ধে আনা সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি অংশ যখন প্রমাণিত হয়নি এবং সরাসরি হত্যার নির্দেশের অভিযোগ থেকেও তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে, তখন রাজনৈতিক বক্তব্য, বৈঠকে অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ভূমিকার মতো বিষয় কতটা ফৌজদারি দায় সৃষ্টি করতে পারে, সেটি গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
তুষারের অভিযোগ, এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পক্ষপাতের প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, রাজনৈতিক অবস্থান, বক্তব্য বা সাংগঠনিক ভূমিকার ভিত্তিতে ফৌজদারি দায় নির্ধারণের এই ব্যাখ্যা ভবিষ্যতে অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োগ করা হতে পারে।
তবে তাঁর এই ব্যাখ্যা ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। আদালত ইনুকে শুধু রাজনৈতিক মতামত বা ‘নৈতিক সমর্থনের’ কারণে সাজা দিয়েছে, এমনটি প্রকাশিত অভিযোগের বিবরণ থেকে বলা যায় না। ট্রাইব্যুনাল নির্দিষ্টভাবে তিনটি অভিযোগে তাঁর নির্দেশ, বৈঠকে ভূমিকা এবং টেলিফোন কথোপকথনের মাধ্যমে কথিত ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছে।
অন্যদিকে জাসদও রায় প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির নেতারা রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন এবং বলেছেন, কুষ্টিয়ার ছয় হত্যায় ইনুর সম্পৃক্ততা প্রসিকিউশন প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এটি জাসদের রাজনৈতিক অবস্থান ও অভিযোগ, আদালতের সিদ্ধান্ত নয়।
প্রসিকিউশনও রায়ে সন্তুষ্ট নয়
রায় নিয়ে প্রশ্ন শুধু ইনুর রাজনৈতিক পক্ষ বা সমালোচকদের দিক থেকেই আসেনি। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামও ৩০ জুনের রায়ের পর বলেন, প্রসিকিউশন ১০ বছরের কার্যকর সাজাকে যথেষ্ট মনে করছে না।
তিনি জানান, যে তিন অভিযোগে ইনুকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, সেগুলোতে আরও কঠোর শাস্তি চাওয়া হবে। একই সঙ্গে যে পাঁচ অভিযোগে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধেও উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানিয়েছে প্রসিকিউশন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরও আপিলের প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছে।
ফলে হাসানুল হক ইনুর মামলার বিচারিক লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না। একদিকে তাঁর রাজনৈতিক পক্ষ সরাসরি হত্যার অভিযোগে খালাস এবং পাঁচ অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ার বিষয়টি সামনে আনছে। অন্যদিকে ট্রাইব্যুনাল বলছে, বাকি তিন অভিযোগ তাঁর ফৌজদারি দায় প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট। আবার প্রসিকিউশন বর্তমান সাজাকেই অপর্যাপ্ত মনে করছে।
এই তিন অবস্থানের মধ্যেই এখন মূল আইনি প্রশ্নটি সামনে থাকছে: সরাসরি হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, নির্দেশ, বৈঠক ও কথোপকথনের মাধ্যমে কোনো অপরাধে অবদানের সীমা কোথায় শুরু হয় এবং সেই দায় নির্ধারণে ভবিষ্যতে একই আইনি মানদণ্ড কীভাবে প্রয়োগ করা হবে?
মন্তব্য করুন