নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকায় বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় দেশজুড়ে শোক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। তবে এই ঘটনাকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখছেন না অনেক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সূত্র। তাদের দাবি, ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনের মিশন চালুর সিদ্ধান্ত থেকে জনগণের দৃষ্টি সরাতেই এই বিমান দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, এ পরিকল্পনার নেপথ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। যার মাধ্যমে বাংলাদেশে তিন বছর মেয়াদি একটি মানবাধিকার মিশন চালু হচ্ছে। তবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ।
ইসরায়েলের গুপ্ত হত্যার ইতিহাস ও বইয়ের তথ্য
গুপ্ত হত্যা ও টার্গেট কিলিংয়ে ইসরায়েলের সুনাম রয়েছে বহুদিনের। দেশটির বিখ্যাত পত্রিকা ইয়েদিওত আহারনত-এর গোয়েন্দা সাংবাদিক রনেন বার্গম্যান তার আলোচিত বই ‘‘Rise and Kill First: The Secret History of Israel’s Targeted Assassinations’’–এ উল্লেখ করেন, ইসরায়েল গত ৭০ বছরে অন্তত ২ হাজার ৭০০ জনকে হত্যা করেছে, যাদের অধিকাংশই ছিলেন ফিলিস্তিনি আন্দোলনের নেতা।
বার্গম্যান দাবি করেন, পিএলও নেতা ইয়াসির আরাফাত-কেও তেজস্ক্রিয় পদার্থ প্রয়োগ করে হত্যা করে ইসরায়েল। বইটি লেখার জন্য তিনি মোসাদ, শিন বেত এবং ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ১ হাজারের বেশি কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেন, যদিও বইটি প্রকাশের সময় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে বাধা দিয়েছিল।
ইরানেও ইসরায়েলের হামলা ও সংশ্লিষ্টতা
২০২৪ সালে ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, ইসরায়েল প্রযুক্তির সহায়তায় তার হেলিকপ্টার ধ্বংস করে।
এছাড়া, ১৩ জুন ইসরায়েল ‘রাইজিং লায়ন’ নামক এক অভিযানে ইরানের রেভ্যুলিউশনারি গার্ডস করপস (আইআরজিসি) এর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের হত্যা করে। এতে এমনকি ড্রোন হামলা ব্যবহার করে বিজ্ঞানীদের শুধু নিজ ঘরেই হত্যা করা হয়, আশপাশের কিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
জাতিসংঘের মিশন ও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব
বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনের অফিস স্থাপনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এটি মার্কিন স্বার্থ বাস্তবায়নের একটি কৌশল এবং দেশের সার্বভৌমত্ব খর্বের প্রক্রিয়া। তারা বলেন, এটা হচ্ছে “আমেরিকার হাতে দেশ তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র”—যার নেতৃত্বে রয়েছেন ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠ মহল।
ড. ইউনূস: বাংলাদেশের ‘অং সান সুচি’?
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, ২০১৮ সালে মিয়ানমারে চীন-সমর্থিত সমুদ্রবন্দর প্রকল্পে চুক্তি সই হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র সেখানে অস্থিতিশীলতা তৈরির কৌশল নিয়েছিল। রোহিঙ্গা সংকট, মানবিক করিডোর, এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে বাংলাদেশ একটি কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ড. ইউনূস এখন বাংলাদেশের 'অং সান সুচি'—যাকে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত স্বার্থে ক্ষমতায় বসাতে চায়। তার ভবিষ্যৎও সুচির মতো হতে পারে, যদি তিনি পশ্চিমা স্বার্থ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হন।
অনেক সূত্র দাবি করছে, ড. ইউনূসকে জাতিসংঘ মহাসচিব করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে "প্রক্সি যুদ্ধের মুখপাত্র" হিসেবে ব্যবহার করছে মার্কিন প্রশাসন। এ যুদ্ধের লক্ষ্য—বাংলাদেশে অস্থিরতা সৃষ্টি, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে সহায়তা এবং চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্পকে বাধাগ্রস্ত করা। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশে পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিস্টান রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি।
শেখ হাসিনার সতর্কবার্তা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ২৩ মে বলেন, “বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে পূর্ব তিমুরের মতো খ্রিস্টান দেশ গঠনের ষড়যন্ত্র চলছে। বাংলাদেশে এয়ারবেজ বানানোর প্রস্তাবও এসেছে।”
ধর্মীয় ও বাম দলগুলোর প্রতিক্রিয়া
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির শাহ মহিবুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, “বাংলাদেশে জাতিসংঘ মানবাধিকার অফিস খুলতে দেওয়া হবে না। ইসলামী মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত এই দেশে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, অতীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা 'মানবাধিকার'র নামে ইসলামি শরিয়াহ ও পারিবারিক আইনে হস্তক্ষেপ করেছে—এটা আবারও ঘটতে পারে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মহাসচিব রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, “বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি সংকটে নেই। অতীতে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। এতে মানুষের মধ্যে সন্দেহ জন্মেছে।”
তবে জামায়াতে ইসলামি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, কারণ অনেক বিশ্লেষক বলছেন, তারা এই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি ষড়যন্ত্রের সঙ্গেই জড়িত।
বিশ্লেষকরা একমত যে, বঙ্গোপসাগরের দখল, রোহিঙ্গা করিডোর এবং কৌশলগত বন্দর ব্যবহার ঘিরে বাংলাদেশ এখন বড় একটি ভূরাজনৈতিক খেলায় পরিণত হয়েছে। এই অবস্থায় একটি গ্রহণযোগ্য, স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে দেশের স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে।
মন্তব্য করুন