একটা সংখ্যা দিয়েই শুরু করি। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা নাকি ৩০ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। শুনতে দারুণ লাগে, তাই না? কিন্তু বাস্তবতা হলো, গরমকালে চাহিদা যেই মাত্র ১৬-১৭ হাজার মেগাওয়াটে গিয়ে ঠেকছে, সেই মুহূর্তেই পিডিবির অবস্থা একদম লেজে-গোবরে হয়ে যাচ্ছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে দেশজুড়ে। অর্ধেক চাহিদাও মেটাতে না পারা একটা সরকারের মুখে উন্নয়নের বুলি কতটা হাস্যকর শোনায়, সেটা একবার ভেবে দেখুন তো।
গত ২৮ জুন রাত দুইটায় যে হিসাব সরকার নিজেই প্রকাশ করেছে, সেটা একটু খেয়াল করুন। চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫০৪ মেগাওয়াট, উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ৭৩ মেগাওয়াট। মানে দেশের প্রায় একুশ ভাগ এলাকা সেই রাতে অন্ধকারে ডুবে ছিল। এটা কোনো বিরোধী দলের অভিযোগ না, এটা সরকারি তথ্য। তারপরও মন্ত্রী মহোদয় সংসদে দাঁড়িয়ে বলে দিলেন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটির কারণে তিন হাজার মেগাওয়াট কম উৎপাদন হচ্ছে। কারিগরি ত্রুটি শব্দটা যেন এই সরকারের কাছে একটা ম্যাজিক শব্দ, যেটা দিয়ে যেকোনো ব্যর্থতা ঢেকে দেওয়া যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর মতো সাধারণ একটা কাজে এত ঘন ঘন কারিগরি ত্রুটি হয় কীভাবে, সেই প্রশ্নের জবাব কেউ দেয় না।
মজার বিষয় হলো, সরকার বেশ চালাকি করেই ঢাকায় তুলনামূলক কম লোডশেডিং করে, আর ঢাকার বাইরে গ্রামেগঞ্জে আসল আঘাতটা হানে। রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, চট্টগ্রামের মানুষ দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ হারাচ্ছেন, কোথাও তো দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছেই না, কোনো সময়সূচি ছাড়াই। শহরের মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিয়ে গ্রামের মানুষকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়াটা একটা পুরনো রাজনৈতিক কৌশল, যেটা এই সরকার দিব্যি আবার প্রয়োগ করছে। কৃষি সেচ বন্ধ, ক্ষুদ্র শিল্প বন্ধ, ব্যবসা-বাণিজ্য মার খাচ্ছে, অথচ এসব নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই।
ঢাকার ভেতরেও যে খুব সুখের গল্প তা না। মানিকনগর, কলাবাগান, শান্তিনগর, রায়সাহেব বাজার, রামপুরা, ধানমন্ডির মতো এলাকায় দিনে কয়েকবার আর গভীর রাতেও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। অথচ ডিপিডিসির পরিচালক বলে বসলেন তাদের এলাকায় লোডশেডিং নাকি খুবই কম। ডেসকোর এমডি আবার বললেন চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। এই দুইটা বক্তব্য যারা রাতে ফ্যান ছাড়া ঘামে ভিজে শুয়ে থাকেন তাদের কানে কতটা অপমানজনক শোনায়, সেটা বোধহয় কর্মকর্তারা কখনো ভেবে দেখেননি। নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার করার বদলে পরিসংখ্যান দিয়ে বাস্তবতা ঢেকে দেওয়ার এই অভ্যাসটা একদম চেনা চেনা লাগছে না?
আসলে লাগারই কথা। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সেই বিএনপি-জামায়াত আমলের কথা যাদের মনে আছে, তাদের কাছে এই দৃশ্য একদমই নতুন কিছু না। তখনও বিদ্যুৎ ছিল রাজনীতির হাতিয়ার, এলাকাভেদে বৈষম্য ছিল নিয়মিত ঘটনা, আর মন্ত্রীদের মুখে অজুহাতের শেষ ছিল না। এখন মনে হচ্ছে সময়টা যেন আবার পিছিয়ে গেছে। সক্ষমতার বড় বড় সংখ্যা দেখিয়ে বাহবা নেওয়া আর বাস্তবে মানুষকে গরমে সিদ্ধ করে রাখা, এই দুইয়ের মধ্যে যে বিশাল ফারাক, সেটা এই সরকার বুঝতেই চাইছে না, নাকি বুঝেও পাত্তা দিচ্ছে না, সেটাই এখন আসল প্রশ্ন।
শিশু, বয়স্ক আর অসুস্থ মানুষেরা এই গরমে সবচেয়ে বেশি ভুগছেন, ফ্যান এসি পানির পাম্প সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অথচ যাদের হাতে এই সংকট সমাধানের ক্ষমতা আছে, তারা ব্যস্ত একে অপরকে দোষ দিতে আর সংসদে পরিসংখ্যান আওড়াতে। সংসদ সদস্যরাও যখন নিজেদের এলাকার জন্য মন্ত্রীর কাছে বিদ্যুৎ ভিক্ষা চাইতে বাধ্য হন, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে পুরো ব্যবস্থাটাই কতটা ভেঙে পড়েছে। তিরিশ হাজার মেগাওয়াটের গল্প আর ষোলো হাজারে ধসে পড়া বাস্তবতা, এই দুইয়ের মাঝখানে ঝুলে থাকা সাধারণ মানুষের এই কষ্টের হিসাব কে রাখবে?
মন্তব্য করুন