আওয়ামী লীগ ফিরবে কি না, সেই প্রশ্নের চেয়েও আমার কাছে এখন বড় প্রশ্ন হলো, কেমন আওয়ামী লীগ ফিরবে?
পুরোনো ভুল, পুরোনো বলয়, একই আত্মতুষ্টি আর একই রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে একটি দল ফিরে এলে সেটিকে সত্যিকার অর্থে প্রত্যাবর্তন বলা যায় না। প্রত্যাবর্তনের অর্থ হওয়া উচিত আত্মসমালোচনা, সংশোধন এবং সময়ের দাবি বুঝে নিজেদের নতুন করে গড়ে তোলা।
আমি আওয়ামী লীগের সমর্থক। দলটির ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব এবং অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি আমার আস্থা আছে। কিন্তু সমর্থক হওয়ার অর্থ এই নয় যে দলের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নহীনভাবে মেনে নিতে হবে। বরং যে রাজনৈতিক শক্তির কাছে প্রত্যাশা বেশি, তার কাছে প্রশ্নও বেশি থাকবে।
আওয়ামী লীগের প্রতি তাই আমার অভিযোগ আছে, অভিমান আছে, আবার প্রত্যাশাও অনেক।
এবার আর শুধু ❝আমরা ফিরে আসব❞ শুনতে চাই না। কেন ফিরবেন, কী পরিবর্তন নিয়ে ফিরবেন এবং অতীতের ভুল থেকে কী শিখেছেন, সেটিও জানতে চাই।
দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার কারণে আওয়ামী লীগের ভেতরে যে আত্মতুষ্টি তৈরি হয়েছিল, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কেন্দ্রের সঙ্গে তৃণমূলের দূরত্ব, সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার অনীহা, কিছু নেতাকর্মীর ক্ষমতার দম্ভ, সমালোচকদের সহজেই প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করা এবং সুবিধাবাদীদের প্রভাব, এসব নিয়ে দলের ভেতরেই নির্মোহ আলোচনা প্রয়োজন।
কঠিন সত্য হলো, রাজনৈতিক দল শুধু উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পারে না। মানুষের মর্যাদা, কথা বলার অধিকার, ন্যায়বিচারের অনুভূতি এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই জায়গাগুলোতেই আমি নতুন আওয়ামী লীগ দেখতে চাই।
আমি চাই আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিল্প, ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক দর্শনের প্রশ্নে আপসহীন থাকুক। ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখেই সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিক। সাময়িক ভোটের হিসাব মেলাতে গিয়ে নিজের আদর্শকে অস্পষ্ট করার রাজনীতি আর দেখতে চাই না।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও দলটির সুস্পষ্ট দর্শন প্রয়োজন। আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন একটি প্রজন্ম তৈরির লক্ষ্য থাকতে হবে, যারা প্রশ্ন করতে শিখবে, যুক্তি দিয়ে ভাববে এবং ভিন্নমতকে সম্মান করবে।
কিন্তু পরিবর্তন শুধু নীতিপত্রে লিখলেই হবে না। পরিবর্তন শুরু করতে হবে দলের কর্মী এবং নেতৃত্বের রাজনৈতিক আচরণ থেকে।
দলের কর্মী হওয়া কোনো বিশেষ সুবিধার লাইসেন্স নয়। মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, ক্ষমতার দাপট, অনলাইনে সংঘবদ্ধ হেনস্তা, ভিন্নমতকে অপমান কিংবা সমালোচককে শত্রু বানানোর সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। যোগ্যতা, সততা, রাজনৈতিক শিক্ষা এবং মানুষের সঙ্গে সম্পর্ককে সাংগঠনিক মূল্যায়নের কেন্দ্রে আনতে হবে।
আমি আর এমন কোনো আওয়ামী লীগ দেখতে চাই না, যেখানে নেতার চারপাশে শুধু প্রশংসাকারীদের জায়গা হয়।
নেতাদের মানুষের কাছে যেতে হবে। শুধু নির্বাচনের আগে নয়, নিয়মিত। বাজারে দ্রব্যমূল্য কেন বাড়ছে, একজন কৃষক কী সমস্যায় আছেন, একজন তরুণ কেন হতাশ, একজন নারী কেন নিরাপত্তাহীন বোধ করেন, একজন চাকরিপ্রার্থী কেন ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, এসব জানতে হবে।
রাজনীতির ‘পালস’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রশংসামূলক পোস্ট দেখে বোঝা যায় না। সেটি বুঝতে হয় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে।
আরেকটি বড় পরিবর্তন দরকার সমালোচনার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে।
সমালোচনা মানেই শত্রুতা নয়।
যে মানুষটি আওয়ামী লীগের ভুল নিয়ে প্রশ্ন করছেন, তিনিই হয়তো দলটির সবচেয়ে বড় শুভাকাঙ্ক্ষী। কারণ সুবিধাবাদীরা সাধারণত ভুল ধরিয়ে দেয় না, তারা ক্ষমতার পাশে দাঁড়িয়ে প্রশংসা করে। প্রকৃত সমর্থকই চায় তার সমর্থিত রাজনৈতিক দলটি আরও ভালো হোক।
২০২৪ সালের ঘটনাপ্রবাহ আওয়ামী লীগের জন্য যদি কোনো রাজনৈতিক শিক্ষা রেখে গিয়ে থাকে, তবে সেই শিক্ষার অন্যতম হওয়া উচিত নিজের চারপাশের মানুষ চিনতে শেখা।
নতুন প্রজন্মের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তাদের রাজনৈতিক ভাষা আলাদা, প্রত্যাশা আলাদা, তথ্য পাওয়ার মাধ্যমও আলাদা। তাদের প্রশ্নকে অবজ্ঞা করে কিংবা ❝এই প্রজন্ম কিছু বোঝে না❞ বলে দূরে ঠেলে দিলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি রাজনৈতিক দলেরই হবে।
তরুণদের আওয়ামী লীগের কথা শোনানোর আগে আওয়ামী লীগকেও তরুণদের কথা শুনতে হবে।
সবশেষে আওয়ামী লীগকে বুঝতে হবে, ক্ষমতায় ফিরে আসা এবং মানুষের আস্থা ফিরে পাওয়া এক জিনিস নয়।
ক্ষমতা রাজনৈতিক সমীকরণে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস অর্জন করতে হয় আচরণ দিয়ে। সেই বিশ্বাস তৈরিতে সময় লাগে, আত্মসমালোচনা লাগে এবং ভুল সংশোধনের সাহস লাগে।
আমি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এমন একটি আওয়ামী লীগ দেখতে চাই, যে নিজের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করবে কিন্তু ইতিহাসের ভারে আটকে থাকবে না। যে উন্নয়নের কথা বলবে কিন্তু মানুষের অধিকারের প্রশ্নও শুনবে। যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলবে এবং নিজের রাজনৈতিক আচরণেও সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাবে। যে বিরোধীদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে, কিন্তু ভিন্নমতকে নিশ্চিহ্ন করার সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেবে না।
আমার প্রত্যাশা তাই শুধু আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন নয়। আমার প্রত্যাশা একটি বদলে যাওয়া আওয়ামী লীগ।
যে আওয়ামী লীগ মানুষের কাছে যাবে, মানুষের কথা শুনবে, নিজের ভুল স্বীকার করবে, যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করবে এবং নতুন প্রজন্মকে সঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ নিয়ে কথা বলবে।
কারণ এবার শুধু ফিরে এলেই হবে না।
কেন ফিরে আসছেন, কী শিখে ফিরে আসছেন এবং কেমন আওয়ামী লীগ হয়ে ফিরে আসছেন, জনগণের সামনে সেই উত্তরও দিতে হবে।
আর একজন সমর্থক হিসেবে এবার সেই জায়গায় আমি কোনো ছাড় দিতে রাজি নই।
মন্তব্য করুন