Insight Desk
প্রকাশ : Feb 15, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

এক তীরে তিন শিকার: ভারত–ইইউ FTA-তে কাঁপছে পাকিস্তান, বাংলাদেশ আর সবচেয়ে বেশি তুরস্ক!

নিজস্ব প্রতিবেদক

বন্ধুরা, আমরা সবাই “এক তীরে দুই শিকার” কথাটা শুনেছি। কিন্তু ভারত–ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট (India–EU FTA) হওয়ার পর যা ঘটছে, সেটা সত্যিই এক তীরে তিন শিকার। আর এই তিন শিকার হলো পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং সবচেয়ে বেশি যন্ত্রণায় থাকা দেশ—তুরস্ক।

পাকিস্তান আর বাংলাদেশ কাঁদবে, এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই FTA-র পর তুরস্ক যেভাবে অস্বস্তিতে পড়েছে, সেটা সত্যিই নজরকাড়া। কারণ এখানে শুধু বাজার হারানোর ভয় নয়, বরং পুরো ট্রেড ব্যালান্সটাই উল্টে যাচ্ছে।

এই India–EU FTA আসলে কী?

এটা কোনো ছোটখাটো চুক্তি নয়। প্রায় ২৭ ট্রিলিয়ন ডলারের কম্বাইন্ড মার্কেট, প্রায় ২ বিলিয়ন মানুষ, আর গ্লোবাল ইকোনমির প্রায় ২৫ শতাংশ—সব মিলিয়ে একে অনেকেই “Mother of all Trade Deals” বলছে। এই চুক্তির সবচেয়ে বড় লাভবান দেশগুলোর মধ্যে ভারত অন্যতম। আর সবচেয়ে বড় লাভবান সেক্টর—টেক্সটাইল, অ্যাপারেল, ফুটওয়্যার, স্টিল, অটো কম্পোনেন্টস।

এবার আসি কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে

প্রথমে পাকিস্তান। পাকিস্তানের পুরো ইন্ডাস্ট্রিয়াল বেস দাঁড়িয়ে আছে মূলত টেক্সটাইলের ওপর। গোটা পাকিস্তান বছরে মোটামুটি ৩২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। এর মধ্যে প্রায় ২৭–২৮ শতাংশ যায় ইউরোপে। ইউরোপে যে রপ্তানি হয়, তার বড় অংশই টেক্সটাইল—প্রায় ৫–৬ বিলিয়ন ডলার।

এতদিন পাকিস্তান ইউরোপে টেক্সটাইল পাঠাতে পারত কারণ তারা GSP (Generalised System of Preferences) সুবিধা পেত। মানে, প্রায় শূন্য শুল্কে তাদের পণ্য ইউরোপ ঢুকত। ভারত সেই সুবিধা পেত না। ভারতকে প্রায় ১০–১২ শতাংশ ট্যারিফ দিয়ে ইউরোপে ঢুকতে হতো।

এখন কী হচ্ছে?

India–EU FTA-র ফলে ভারতের ওপর থাকা এই ট্যারিফ উঠে যাচ্ছে। ফলে ভারতীয় টেক্সটাইল ইউরোপে ঢুকবে অনেক সস্তায়। আর ভারতের টেক্সটাইল উৎপাদন খরচ এমনিতেই কম—বিদ্যুৎ, কাঁচামাল, স্কেল, সব দিক থেকেই। ফলে পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে যে সামান্য দামের ফারাক ছিল, সেটাও উধাও। পাকিস্তানের নিজস্ব টেক্সটাইল সংগঠনগুলোই বলছে, এই অবস্থায় ভারতের সঙ্গে কম্পিট করা প্রায় অসম্ভব।

মানে, ইউরোপে পাকিস্তানের মার্কেট শেয়ার ধীরে ধীরে ভারত খেয়ে নেবে—এটা প্রায় নিশ্চিত।

এবার বাংলাদেশ

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টা আরও ভয়ংকর। কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় পুরোপুরি টেক্সটাইল নির্ভর। দেশের মোট রপ্তানি প্রায় ৪৮ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশ যায় ইউরোপে। শুধু টেক্সটাইল থেকেই ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার।

এতদিন বাংলাদেশ এই সুবিধা পেত কারণ তারা LDC (Least Developed Country) হিসেবে শূন্য ট্যারিফে ইউরোপে ঢুকতে পারত। কিন্তু এই সুবিধা চিরস্থায়ী নয়। ইউরোপ ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে—বাংলাদেশ আর LDC থাকবে না, ফলে এই ডিউটি-ফ্রি সুবিধাও ধীরে ধীরে উঠে যাবে।

একদিকে বাংলাদেশের ওপর ট্যারিফ বসবে, অন্যদিকে ভারতের ওপর থেকে ট্যারিফ উঠে যাবে। তাহলে প্রতিযোগিতা করবে কীভাবে?

বাংলাদেশের গার্মেন্ট মালিকরাই এখন বলছে—ভারতীয় পণ্যের দাম ও কোয়ালিটির সঙ্গে তারা টিকতে পারবে না। ইউরোপের মার্কেটে ভারতের অংশীদারি বাড়বে, বাংলাদেশের কমবে—এটা প্রায় নিশ্চিত।

এখন সবচেয়ে বড় ধাক্কা—তুরস্ক

পাকিস্তান ও বাংলাদেশ কাঁদলেও তুরস্কের অবস্থা সবচেয়ে জটিল। কারণ তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে Customs Union-এ রয়েছে। এর মানে কী?

সহজ ভাষায়—ইইউ যদি কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে FTA করে (যেমন ভারতের সঙ্গে), তাহলে ইইউ সেই দেশের পণ্যের ওপর ট্যারিফ কমালে, তুরস্ককেও বাধ্য হয়ে একই ট্যারিফ কমাতে হয়। কিন্তু উল্টোটা সত্যি নয়।
মানে, ভারত–ইইউ চুক্তির ফলে:

ভারতীয় পণ্য ইইউতে ঢুকবে কম ট্যারিফে

একই ভারতীয় পণ্য তুরস্কেও ঢুকবে কম বা শূন্য ট্যারিফে

কিন্তু ভারত তুরস্ককে নিজের বাজার খুলে দিতে বাধ্য নয়

ফলাফল কী?

ভারত দুইটা বাজার পাচ্ছে—ইইউ + তুরস্ক

তুরস্ক পাচ্ছে… কিছুই না।

এটাই তুরস্কের আসল মাথাব্যথা।

তুরস্ক ইউরোপে বড় টেক্সটাইল এক্সপোর্টার। ইইউ-র মোট টেক্সটাইল আমদানির প্রায় ১১ শতাংশ আসে তুরস্ক থেকে। চীনের পরেই বড় নাম ছিল তুরস্ক। ভারতের শেয়ার এখনো তুলনামূলক কম, প্রায় ৫ শতাংশ। কিন্তু এই FTA-র পর ভারতের শেয়ার ৩০–৪০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে শুধু টেক্সটাইলেই।

মানে, কারা মার্কেট হারাবে?

বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং তুরস্ক—তিনজনই।

এখানেই শেষ নয়

স্টিল, অটো কম্পোনেন্টস, মেশিনারি, কেমিক্যালস—এই সব সেক্টরেও একই গল্প। আগে ভারতের স্টিল ইউরোপে ঢুকত ২০–২২ শতাংশ ট্যারিফ দিয়ে। এখন সেটা শূন্যের দিকে যাচ্ছে। তুরস্ক ইউরোপের বড় স্টিল সাপ্লায়ার। ফলে সেখানেও ভারত সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী।

এই কারণেই তুর্কিশ মিডিয়ায় এত আতঙ্ক। তারা বলছে, এই চুক্তি তুরস্কের জন্য “বড় হুমকি”। কারণ ভারত শুধু ইউরোপে নয়, তুরস্কের ঘরোয়া বাজারেও ঢুকে পড়বে।

সব মিলিয়ে কী দাঁড়াল?

একটা ট্রেড ডিল—

পাকিস্তানের টেক্সটাইল মার্কেট কাঁপিয়ে দিল

বাংলাদেশের এক্সপোর্ট মডেলকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলল

আর তুরস্ককে দিল ডাবল শক—নিজের বাজারেও, ইউরোপেও

এইটাই বাস্তবতা

বন্ধুরা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুধু আবেগ নয়, স্ট্র্যাটেজি কাজ করে। কার সঙ্গে থাকবেন, কোন ব্লকের সঙ্গে জোট বাঁধবেন—এর ফল একদিন না একদিন ভোগ করতেই হয়।

India–EU FTA শুধু ভারতের জয় নয়। এটা অন্যদের জন্য বড় সতর্কবার্তা।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

স্বাধীন বাংলাদেশে আবারো 'রাজাকার' স্লোগান, জামায়াত-এনসিপির

1

তারেক-ইউনূস বৈঠকের পর বিএনপিতে বেড়েছে মব সন্ত্রাস

2

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধীনতা ও

3

পিটার হাসের সফরের পরই উত্তপ্ত পরিস্থিতি, এবার কি টার্গেট কক্

4

জামায়াতের ইশতেহারে ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের বার্তা, তবু ভোটের

5

‘ধন্যবাদ পাকিস্তান’ মন্তব্যে আসিফ নজরুলকে ঘিরে তীব্র সমালোচন

6

কণ্ঠরোধ করে ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা করছেন ইউনূস

7

শরীয়তপুরে অস্ত্র–গুলিসহ সাবেক ছাত্রদল নেত্রী ইলোরা গ্রেপ্তার

8

জনমনে প্রশ্ন সেনাবাহিনী কি এখন এনসিপির পাহারাদার বাহিনী

9

সেনাবাহিনীকে ঘিরে ষড়যন্ত্র, পাহাড়ে অশান্তির পেছনে জামায়াত-শি

10

জামায়াতকে জাতীয় নির্বাচনে জয়ের গ্রিন সিগনাল দিয়ে দিলেন ইউনূস

11

নৌকা ছেড়ে শীষে—সাবেক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনের অবস্থান বদলে ময়মনসি

12

যেভাবে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হচ্ছে কারাগারে

13

শেখ হাসিনাকে নিয়ে পক্ষপাতদুষ্ট প্রতিবেদন করে মিডিয়া ট্রায়াল

14

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি: নিছক দুর্ঘটনা না কি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত

15

দুই সমাবেশ স্থলেই মার খেলো এনসিপি, তাহলে গোপালগঞ্জ নিয়ে দ্বি

16

ইউনূস সরকারের ছত্রছায়ায় জঙ্গিবাদে শিশু-কিশোররাও, দেশে বাড়ছে

17

শেখ হাসিনার দৃঢ় বার্তা: “গণতন্ত্র, বৈধ সরকার ও জনগণের অধিকার

18

নির্বাচন ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র–ভারতের নীরব কূটনৈতিক তৎপরতা, পুনর

19

চাঁদাবাজ রিয়াদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাত্র প্রতিনিধি

20