Insight Desk
প্রকাশ : Aug 7, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

জুলাই ঘোষণাপত্র ইতিহাস বিকৃতির এক নির্লজ্জ প্রয়াস

নিজস্ব প্রতিবেদক

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জুলাই ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি স্পর্শকাতর অধ্যায়কে বিকৃত করার একটি সচেতন প্রচেষ্টা হিসেবে সমালোচিত হয়েছে। এই ঘোষণাপত্রে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারের নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে। 

ঘোষণাপত্রে ১৯৭২ সালের পরবর্তী সময়ের তথাকথিত আওয়ামী দমন-পীড়নের কথা উল্লেখ করে না করে সরাসরি ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর ঘটনায় চলে যাওয়া হয়েছে, যেন মাঝের এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি কখনোই ঘটেনি। এটি কেবল একটি তথ্য উপেক্ষা নয়, বরং ইতিহাসের সঙ্গে এক জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা।

ব্রিটিশ সাংবাদিক ও বাংলাদেশ পরিস্থিতির পর্যালোচক ডেভিড বার্গম্যান এই ঘোষণাপত্রকে অত্যন্ত পক্ষপাতদুষ্ট ও একচোখা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, এটি আওয়ামী লীগের প্রতি ঘৃণা থেকে উদ্ভূত একটি রাজনৈতিক প্রচারপত্রের মতো। ঘোষণায় ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলকে ‘‘জনবিরোধী’’, ‘‘স্বৈরাচারী’’, ‘‘মানবাধিকারের বিরুদ্ধে’’ এবং ‘‘মাফিয়া ও ব্যর্থ রাষ্ট্র’’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এই সময়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারী শিক্ষার প্রসার, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জলবায়ু ইস্যুতে অগ্রগতির মতো ইতিবাচক দিকগুলো সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া হয়েছে। বার্গম্যানের মতে, এই একপাক্ষিক উপস্থাপনা আওয়ামী লীগের সমালোচকদের দীর্ঘদিনের বর্ণনার প্রতিফলন, যা ইতিহাসের সত্যতাকে বিকৃত করে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরও এই ঘোষণাপত্র নিয়ে গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, এই ঘোষণাপত্রে দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার তেমন কোনো প্রতিফলন হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, আন্দোলনে শহীদ পরিবার এবং আহতদের জন্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও ভাতার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশিকা নেই, যা জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তিনি এটিকে একটি পাশ কাটিয়ে যাওয়ার প্রয়াস হিসেবে অভিহিত করে বলেন, আমরা এই ঘোষণাপত্রে হতাশ, এই জাতি হতাশ।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাসুদ কামাল জুলাই ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ ধারণার বিষয়ে বিভ্রান্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, সেকেন্ড রিপাবলিক জিনিসটা আমি ঠিক বুঝি না। নতুন সংবিধান প্রণয়নের জন্য একটা কমিশন গঠিত হয়েছে, তারা কিছু প্রস্তাবও দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—নতুন সংবিধান মানে কী? আগের সংবিধান পুরোপুরি বাদ দিলে তবেই তো একে ‘নতুন’ বলা যাবে। আর যদি আগের সংবিধানের কিছু অংশ রেখে দেন তাহলে সেটা তো ‘সংশোধিত সংবিধান’ হবে, নতুন নয়। 

তিনি আরও উল্লেখ করেন, তিনি সংশোধিত সংবিধানের পক্ষে থাকলেও ‘সেকেন্ড রিপাবলিক’ শব্দটির অর্থ তার কাছে অস্পষ্ট এবং সাধারণ মানুষের পক্ষে বোধগম্য নয়।

মাসুদ কামাল আরও সমালোচনা করে বলেন, জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব নিয়ে এনসিপির দাবি অতিরঞ্জিত। তিনি বলেন, আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, জুলাই আন্দোলনে কোনো একক অথবা একটা গোষ্ঠীগত নেতৃত্ব ছিল না, কোনো নেতা ছিল না। এ আন্দোলন ছিল সারা দেশের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন। কিন্তু এখন আমরা কি দেখছি—এ আন্দোলনের ক্রেডিট নেওয়ার জন্য নানাজনের নানা পাঁয়তারা।

তিনি এনসিপির নেতৃত্বের দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলেন, এনসিপি বলছে তাদের নেতৃত্বে আন্দোলন হয়েছে এবং সেই শীর্ষ নেতা যারা আছে এনসিপির, তারা তো দাবি করে বসেছে, তারা এক দফার ঘোষণা দিয়েছে। এক দফার ঘোষণা যে দিল, সে-ই নেতা হয়ে গেল তাও তো না।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, এনসিপির নেতারা মূলত ছাত্রশক্তি নামক একটি ক্ষুদ্র ছাত্র সংগঠনের সদস্য, যার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কোনো শাখা নেই। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, সেই ছাত্রশক্তির কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো শাখা পর্যন্ত আছে? নেই তো। তাহলে তারা এভাবে দাবি করেন কেন? এই কারণে দাবি করেন, তারা আসলে এখন ক্ষমতাঘনিষ্ঠ।

ঘোষণাপত্রে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর উল্লেখের উৎস বা প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা হয়নি, যা বিএনপির রাজনৈতিক দাবির প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বঙ্গবন্ধুর অবদানকে অস্বীকার করার একটি প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ড. ইউনূসের এই ঘোষণা যেন বোঝায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ হঠাৎ শুরু হয়ে গিয়েছিল এবং গত ৫৪ বছরে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এমন একটি বর্ণনা জাতির ইতিহাসের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে।

বার্গম্যান ঘোষণাপত্রের কিছু ইতিবাচক দিকও উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, এটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে একটি ‘‘উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’’ গঠনের সংগ্রাম হিসেবে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করেছে। এছাড়া, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে প্রায় এক হাজার নিহতের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে, এই ইতিবাচক দিকগুলো ঘোষণাপত্রের ইতিহাস বিকৃতির মারাত্মক ত্রুটিগুলোর ছায়ায় ম্লান হয়ে গেছে।

এই ঘোষণাপত্র ইতিহাসের সত্যকে উপেক্ষা করে একটি পক্ষপাতদুষ্ট আখ্যান তৈরি করেছে, যা জনগণের সম্মতিহীন এবং অর্থহীন হিসেবে বিবেচিত হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখার এই প্রয়াস কখনোই টিকে থাকবে না, যেমনটি শেক্সপিয়রের হ্যামলেট নাটক ‘‘প্রিন্স অব ডেনমার্ক’’ ছাড়া অসম্পূর্ণ। ড. ইউনূসের এই ঘোষণাপত্র তার খ্যাতিকে ক্ষুণ্ণ করার পাশাপাশি জাতির ইতিহাসের প্রতি একটি গভীর অবিচার করেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

অবৈধ ক্ষমতার খেলায় মাতৃভূমি দারিদ্র্যের দেশে পরিণত ইউনুসের ন

1

রজার রহস্যে মুখে কুলুপ খলিলুরের, নাগরিকত্ব বিতর্কে দেশজুড়ে

2

মার্কিন চুক্তির নীলনকশা : শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে সার্বভৌমত্বের

3

বিজয় দিবসে এবারও প্যারেড হবে না: জনমনে নিন্দা ও বিতর্ক, পাকি

4

সাজীব ওয়াজেদ: এই নির্বাচন অবৈধ, দেশের অস্থিতিশীলতা দূর করতে

5

ছাত্রলীগের তীব্র হুঁশিয়ারি: “প্রতিটি জুলুমের কড়ায়-গণ্ডায় হিস

6

৯ মাসে পুঁজিবাজারে মূলধন কমেছে ৫৪ হাজার কোটি টাকা

7

আহত শিক্ষার্থীদের নামে এনসিপির জন্য ফান্ড তুলতে গিয়ে ধরা খেল

8

লক্ষ্মীপুরের বিএনপির সন্ত্রাসীর হাতে জোড়া খুন

9

ইউনূসের এক বছরে দেশ অন্ধকারে, অর্থনীতি ধ্বংস

10

গণভোটের অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন

11

আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা দেখে নতুন ষড়যন্ত্রে দেশবিরোধীরা

12

দেশে ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে ভুলিয়ে খ্রিস্টান রাজ্য বানাতে মরিয়

13

ভয়ের মাঝে একুশের চেতনা, ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারি

14

অপকর্ম ফাঁস হওয়ার ভয়ে সারজিসের তৈলাক্ত স্ট্যাটাস

15

শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনই প্রমাণ করবে তিনি স্বৈরাচার ছিলেন ন

16

জুলাই আন্দোলন: সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয় জামায়াত

17

ভয় দেখিয়ে ৫ আগস্ট ‘গণজোয়ার’ সৃষ্টির অপচেষ্টা

18

রাউজানে প্রশাসন নীরব, অপরাধীরা দাপটের সঙ্গে চলাফেরা: ইউনূস স

19

ইউনূসের ভূমিকায় আলোচনায় চট্টগ্রাম বন্দর ও সেন্টমার্টিন

20