২০২৬ সালের জুন মাসে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এক চরম স্বাস্থ্য সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে হাম নামক একটি বিলুপ্তপ্রায় রোগ ফিরে এসে কেবল মহামারি হয়ে ওঠেনি, বরং শিশুহত্যার এক ভয়াবহ চিত্র এঁকে দিয়েছে। চলতি বছরে হাম ও হাম উপসর্গে মৃত্যু ৭০০ পার হয়ে গেছে। মৃতদের ৯২ শতাংশ শিশুই জীবনে কখনো হাম-রুবেলা টিকার একটিও ডোজ পায়নি। এই পরিসংখ্যান কোনো আকস্মিক বিপর্যয় নয়, বরং একটি সুপরিকল্পিত গাফিলতি, পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে চরম ব্যর্থতার প্রত্যক্ষ পরিণতি, যার মূল দায়ভার ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন গত আমলের ওপর বর্তায়। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, বর্তমান বিএনপি-জামাত জোট সরকার এখন পুরো ঘটনাকে এক চরম মিথ্যাচার, তথ্য কারচুপি এবং দায় এড়ানোর রাজনীতির আড়ালে ঢেকে ফেলতে মরিয়া।
মূল প্রশ্নটা এখানেই, ইউনুস আমলের এই ধ্বংসস্তূপের পেছনের সত্যটা এত ভয়ংকর কী যে, তা চাপা দিতে একটি গোটা সরকারকে এভাবে কোমর বেঁধে নামতে হলো? যে মানুষটি ক্ষমতায় এসে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি তথা ইপিআইকে ধ্বংস করেছেন, যার আমলে টিকার কাগজপত্রে নজিরবিহীন জালিয়াতি হয়েছে, যার নেতৃত্বে স্বাস্থ্য খাতের নজরদারি ব্যবস্থা ধসে পড়েছিল, তাকে বাঁচাতে কেন আজ এই মিথ্যার দেয়াল তোলা হচ্ছে? উত্তরটা স্পষ্ট, ইউনুসের অপরাধ ঢাকতে গিয়ে বিএনপি-জামাত নিজেদেরও সেই অপরাধের শরিক করে নিয়েছে।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ধ্বংসের যে বীজ ইউনুস আমলে বপন করা হয়েছিল, তার ফসল এই মৃত শিশুরা। একসময় বাংলাদেশ হাম নির্মূলে বিশ্বে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছিল। ২০১৪ সালে টিকার কভারেজ ছিল প্রায় সার্বজনীন। অথচ ইউনুস ক্ষমতায় আসার পর ইপিআইতে এক অভূতপূর্ব ধস নামে। ফিল্ড লেভেলের স্বাস্থ্যকর্মীরা বেতন পেতেন না, ভ্যাকসিন সংরক্ষণের কোল্ড চেইন ভেঙে পড়ে, নজরদারি দল নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। জনস্বাস্থ্যবিদরা তখন থেকেই সতর্ক করছিলেন, কিন্তু সে সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করে পরিসংখ্যান জালিয়াতি করে টিকা প্রদানের সাফল্যের মিথ্যা বয়ান তৈরি করা হচ্ছিল। স্বাধীন বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদরা নিশ্চিত করেছেন, বহু শিশুকে টিকা না দিয়েও নথিতে টিকা দেওয়ার তথ্য পূর্ণ করা হয়েছে, আর এই জালিয়াতি কেন্দ্রীয়ভাবে তদারকি করা হয়েছে। ইউনুস প্রশাসনের অধীনে থাকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকেরা যে এ বিষয়ে জানতেন না, সেটা বিশ্বাস করার মতো ন্যূনতম যুক্তিও নেই। অর্থাৎ ইউনুস সরকারের মেয়াদে জেনেশুনে শিশুদের ভবিষ্যৎ এবং জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে।
এই বাস্তবতার ভিত্তিতে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি-জামাত জোট সরকারের ভূমিকা এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। ইউনুস সরকারের দুঃশাসনের বলি হওয়া এই শিশুদের পরিবারগুলোর প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বদলে এই সরকার বেছে নিয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত পথ। কলম্বোতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আঞ্চলিক বিশেষজ্ঞ সভায় বাংলাদেশের পক্ষে যে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট করে লেখা ছিল, মৃতদের ৯২ শতাংশের টিকার কোনো ডোজই গ্রহণের রেকর্ড নেই। কিন্তু ক্ষমাসীন দল ও তাদের মিডিয়া সেল এই তথ্যকে কীভাবে ব্যবহার করল? তারা প্রকাশ্যে বলতে শুরু করল, এটা টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা, হঠাৎ করেই প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, প্রতিরোধ করা দুরূহ ছিল। পুরো বক্তব্য থেকে মুছে ফেলা হলো ইউনুস আমলের দুর্বৃত্তায়নের অংশটুকু। একটা সরকার এখন তার পুরো শক্তি নিয়োগ করেছে একজন ব্যক্তির ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য, যেখানে লাশ ফেলেছে শত শত শিশু।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা কেবল মৃত্যুর সংখ্যাতেই শেষ নয়, বরং এটা আরও প্রকট হয় যখন কেউ বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণটি খতিয়ে দেখেন। মৃতদের ২৬ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে, যারা টিকা গ্রহণের জন্য বয়সসীমাতেই পৌঁছায়নি। এর অর্থ, তাদের মায়েদের দেহেও পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল না, যা প্রমাণ করে সামগ্রিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা ইউনুস আমলে কতটা ধ্বংস করা হয়েছিল। ২ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুহার ১৮ শতাংশ, অর্থাৎ টিকা পেলে যারা একেবারে সুরক্ষিত থাকত, তারাও রেহাই পায়নি। এটা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটা একটি মেডিকেল ক্রাইম, এবং এর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ইউনুস সরকার থেকে এখন বিএনপি-জামাতে স্থানান্তরিত হয়েছে মাত্র।
দেখতে হবে বিএনপি-জামাত কেন এত মরিয়া হয়ে ইউনুসকে রক্ষা করছে। শুধু কি রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো আঁতাত আছে? ইউনুসের শাসনামলে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ থেকে শুরু করে ভ্যাকসিন সংগ্রহ, ইপিআই ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার থেকে শুরু করে নজরদারি সিস্টেম পর্যন্ত যে পরিমাণ দুর্নীতি আর অনিয়ম হয়েছে, তার অডিট রিপোর্ট এখনো পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। কেন? কারণ সেই আর্থিক অনিয়মের ফিঙ্গারপ্রিন্ট ছড়িয়ে আছে এমন অনেকের হাতে, যারা এখন এই সরকারের উচ্চপর্যায়ে বসে আছেন। ইউনুসের দুর্নীতির ফাইল খুললেই যে সারি সারি কঙ্কাল বেরিয়ে আসবে, যা বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্যও অস্বস্তিকর। তাই এখন বেছে নেওয়া হয়েছে ক্লাসিক কৌশল, ইউনুসকে নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারলে অন্তত দায়টা ঘোলাটে করে ফেলো, মিথ্যা আর প্রচারণার বন্যায় সত্যকে ডুবিয়ে দাও।
কিন্তু একটি জাতির বিবেককে কি একদল রাজনীতিবিদের স্বার্থে এভাবে চিরতরে চাপা দেওয়া যায়? যে শিশুরা হামে আক্রান্ত হয়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছে, ফুসফুসের প্রদাহে ভুগে নির্জীব হয়ে পড়েছে, তাদের আত্মা কি কখনও ক্ষমা করবে এই অপরাধীদের? ইউনুস এবং বর্তমানে তাকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া এই সরকার, দুই পক্ষই ইতিহাসের কাঠগড়ায় অভিযুক্ত। বাংলাদেশের মানুষ আর কখনও যেন ভুলে না যায়, যে শিশুটির বয়স ৯ মাসও হয়নি, যে শিশুটি বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল, সে কেন বাঁচল না। তার জীবনটা কেড়ে নেওয়ার পেছনে একদিকে যেমন দায়ী ইউনুস আমলের নজরদারিহীনতা আর দুর্নীতি, তেমনি দায়ী বর্তমান সরকারের সেই চক্রান্ত, যা দোষীদের রক্ষা করতে পুরো জাতির কাছে মিথ্যা বলছে।
এই ঘটনা একইসঙ্গে একটি স্বাস্থ্য সংকট এবং একটি নৈতিক সংকট। প্রমাণিত অপরাধীকে রাজনৈতিক কারণে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা একটি জাতিকে আরও বড় বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দেয়। আজ যদি ইউনুসের এই অপরাধের বিচার না হয়, তাহলে আগামীকাল আরেকটি রোগ ফিরে আসবে, আরও শিশু মারা যাবে, আর রাজনীতিবিদরা তখনও পালাবদলের পর দায় চাপানোর খেলা খেলবে। পার্থক্য শুধু এই যে, তখন আর ক্ষমা চাওয়ার মতো কেউ থাকবে না।
মন্তব্য করুন