নিজস্ব প্রতিবেদক
থানার ভেতরে বসে একজন ব্যক্তি যদি প্রকাশ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তার সামনে থানা পোড়ানো ও একজন পুলিশ সদস্যকে জীবিত পুড়িয়ে হত্যার দাবি করেন, সেই বক্তব্য ভিডিও আকারে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে—তারপরও যদি তাকে গ্রেপ্তার করে আবার মবের চাপে মুক্তি দিতে হয়, তাহলে প্রশ্ন একটাই: এই রাষ্ট্রে আইন আসলে কার নিয়ন্ত্রণে?
হবিগঞ্জে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহদী হাসানকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনা বাংলাদেশের আইনের শাসনের ভঙ্গুর বাস্তবতাকে নগ্নভাবে সামনে এনেছে। শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভেতরে বসে প্রকাশ্যে ওসিকে হুমকি দেওয়া, বানিয়াচং থানা পোড়ানো এবং এসআই সন্তোষ চৌধুরীকে জ্বালিয়ে হত্যার দাবি—সবই ঘটেছে রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান, একটি থানার ভেতরে।
এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলে পুলিশ বাধ্য হয়ে মাহদী হাসানকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু সেই গ্রেপ্তার টেকেনি। শুরু হয় থানাঘেরাও, সড়ক অবরোধ, ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ এবং আলটিমেটাম। শেষ পর্যন্ত আদালত জামিন দিলে মুক্তির পর বের হয় আনন্দ মিছিল।
প্রশ্ন উঠছে—আইন কি তার নিজস্ব গতিতে চলেছে, নাকি রাজপথের ভিড়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে?
মব সন্ত্রাস ও অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা
এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে আসছে—ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মব সন্ত্রাসকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে উস্কানি দিচ্ছে কি না। অভিযোগ রয়েছে, মব নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে শক্ত অবস্থান নিতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে এবং রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক ক্ষেত্রে মবকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।
এর ফলেই দেখা যাচ্ছে—অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেও সংগঠিত বিক্ষোভ ও চাপের মুখে প্রশাসন পিছু হটছে। পুলিশ, যাদের কাজ আইন প্রয়োগ করা, তারাই যেন ভিড়ের ভয়ে অসহায় হয়ে পড়ছে। এটি শুধু একটি মামলার প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ার স্পষ্ট আলামত।
আইনের শাসনের পরাজয়
আইনের শাসনের মূল শর্ত হলো—অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তার বিরুদ্ধে আইন চলবে প্রমাণ ও প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে, মবের হুমকিতে নয়। কিন্তু এখানে দেখা গেল, একজন ব্যক্তি থানার ভেতরে বসে হত্যার দায় নিজের মুখে উচ্চারণ করার পরও ‘স্লিপ অব টাং’ ব্যাখ্যায় দায়মুক্তির সুযোগ পাচ্ছেন।
মানবাধিকার কর্মী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তি না হলেও আইনশৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের জন্য ভয়াবহ বার্তা। মবের চাপে কোনো অভিযুক্তের মুক্তি মানে আইনের শাসনের প্রকাশ্য পরাজয়।
৫ আগস্টের রক্তাক্ত বাস্তবতা
৫ আগস্ট বানিয়াচং থানায় ঘটে যাওয়া সহিংসতা ছিল রাষ্ট্রের ইতিহাসে অন্যতম নৃশংস ঘটনা—যেখানে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে পিটিয়ে হত্যা করে মরদেহ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। সেই ঘটনার দায় নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার পরও যদি কেউ নিরাপদে বেরিয়ে আসে, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট—
আইন সবার জন্য সমান নয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ প্রশ্ন
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন এখানেই—একজন অপরাধী যদি নিজ মুখে অপরাধের কথা স্বীকার করেও, তা-ও থানার ওসির সামনে, ভিডিও প্রমাণসহ—তবুও যদি মবের কারণে তাকে ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে দেশে আইনের শাসন কোথায়?
এই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরবতা কিংবা নিষ্ক্রিয়তা কি নিছক ব্যর্থতা, নাকি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল—সে প্রশ্নও উঠছে।
যদি এখনই রাষ্ট্র স্পষ্ট বার্তা না দেয় যে আইনই শেষ কথা, তাহলে ভবিষ্যতে আদালত নয়—ভিড়ই হয়ে উঠবে বিচারক।
আর সেটাই হবে রাষ্ট্র ভাঙনের সবচেয়ে ভয়ংকর পথ।
মন্তব্য করুন