নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে টানা উচ্চ প্রবৃদ্ধির পর এখন প্রশ্ন উঠছে—অর্থনীতি কি শুধু গতি হারিয়েছে, নাকি কাঠামোগত চাপ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, আগের সময়ের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতির বড় পার্থক্য হলো গতি ও স্থিতিশীলতার ভারসাম্য।
প্রবৃদ্ধির দশক
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশ গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করে। তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয় এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন অর্থনীতিতে বিনিয়োগের আস্থা তৈরি করে।
এই সময়টায় দারিদ্র্য কমেছে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা উল্লেখ করেছিল।
তবে সমালোচকদের মতে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি কিছু দুর্বলতাকে আড়াল করেছিল—বিশেষ করে কম কর আদায়, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ।
ঋণের ধরনে পরিবর্তন
আগের সময় সরকারি ঋণের বড় অংশ ব্যয় হয়েছে সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল ও বন্দর উন্নয়নের মতো প্রকল্পে। সরকারের যুক্তি ছিল, এসব বিনিয়োগ ভবিষ্যতে উৎপাদনশীলতা বাড়াবে।
বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন ঋণের বড় অংশ যাচ্ছে ভর্তুকি, বেতন-ভাতা, জ্বালানি আমদানি এবং আগের ঋণ পরিশোধে।
অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হচ্ছে “উন্নয়নমুখী ঋণ” থেকে “ব্যয় নির্বাহের ঋণ”-এ স্থানান্তর। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনই আর্থিক চাপের ইঙ্গিত দেয়।
আন্তর্জাতিক আস্থা: তখন ও এখন
এক দশক আগে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে উল্লেখ করেছিল World Bank এবং International Monetary Fund। রিজার্ভ বাড়ছিল, রেমিট্যান্স শক্তিশালী ছিল এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের দৃষ্টিতে দেশটি ছিল তুলনামূলক স্থিতিশীল।
বর্তমানে রিজার্ভের ওপর চাপ রয়েছে, ঋণ পরিশোধের বোঝা বাড়ছে এবং বাজেট ঘাটতি বিস্তৃত হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের মনোভাবও আগের তুলনায় সতর্ক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এটিকে অর্থনৈতিক পতন হিসেবে দেখছেন না অধিকাংশ বিশ্লেষক। তাদের মতে, এটি মূলত প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার প্রভাব।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব
বর্তমান প্রশাসন পরিচালনা করছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল। রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় সাধারণত প্রশাসনিক সমন্বয় ব্যয় বাড়ে এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন সরকারকে একদিকে পূর্বের ঋণের দায় সামলাতে হচ্ছে, অন্যদিকে সামাজিক ব্যয়ের চাপও রয়েছে। রাজস্ব প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর হওয়ায় ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠছে।
যেসব কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে
দুই সময়ের মধ্যেই কিছু মৌলিক সমস্যা অপরিবর্তিত রয়েছে:
• নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত
• তৈরি পোশাক খাতের ওপর অতিনির্ভরতা
• জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা
• ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি
• ক্রমবর্ধমান সরকারি ঋণ
আগের উচ্চ প্রবৃদ্ধি এসব দুর্বলতাকে চাপা দিয়েছিল। এখন প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় সেগুলো স্পষ্ট হচ্ছে।
মূল প্রশ্ন
বিতর্কটি “কে ভালো করেছে” তা নিয়ে নয়—বরং অর্থনীতি কি ঋণনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে টেকসই আর্থিক কাঠামোর দিকে যেতে পারবে?
বিশ্লেষকদের মতে, আগে প্রবৃদ্ধি ঋণের চাপ সামাল দিতে সাহায্য করেছিল। এখন ঋণের বৃদ্ধি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চেয়ে দ্রুত হলে তা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সামনে তাই বড় চ্যালেঞ্জ—গতি হারানো অর্থনীতিকে কীভাবে স্থিতিশীল ও কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করা যায়।