Insight Desk
প্রকাশ : Aug 3, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

প্রশাসনিক ব্যবস্থার বেহাল দশা, দেশে বড় বিপদের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক

শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশের সহিংসতা, চাঁদাবাজি ও প্রশাসনে হস্তক্ষেপের অভিযোগে জনগণের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। অপরদিকে, প্রশাসনের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলেছে।

গত বছর শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক হাসিব আল ইসলাম বলেন, ‘পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে। মেট্রোরেলে আগুন দেওয়া হয়েছে। এরকম অনেক কিছুই করা হয়েছে। তা না হলে সরকারকে উৎখাত করা যেত না।’

সূত্র বলছে, ওই আন্দোলনে প্রায় তিন হাজার পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। এরপর থেকে পুলিশকে একরকম পুতুল সরকারের পরিণত করেছে সরকার। বাহিনীটির কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে লাঠি। এতে একরকম অসহায় বাহিনীতে পরিণত হয়েছে পুলিশ। এখন এই বাহিনীর কাছে কোনো অভিযোগ নিয়ে গেলেও তেমন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় না। 

সম্প্রতি এ ঘটনায় চরম উদাহরণ পাওয়া গেছে এক সাংবাদিকের ফোন ছিনতাই হওয়ার পর। আহমাদ আহমাদ ওয়াদুদ নামের ওই সাংবাদিক তার ফোন ছিনতাই হওয়া নিয়ে এক স্ট্যাটাসে জানান, তিনি মোহাম্মদপুর থানার এএসআই আনারুলকে আবার ওই সন্ত্রাসীদের দেখিয়ে দিই। তবে আনারুল সেখানে না গিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় সন্ত্রাসীরাও পুলিশসহ আমাকে দেখে আস্তে আস্তে ঘটনাস্থল থেকে সরে যেতে থাকে।  এ থেকে বোঝা যায় পুলিশই এখন ছিনতাইকারীকে দেখে ভয়ে তটস্থ থাকে। 

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে গণপিটুনির ঘটনায় অন্তত ৬৭ জন নিহত হয়েছেন এবং ১১৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৪৭৬ জন নারী ও শিশু, যার মধ্যে ২৯২ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অপরদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য মতে, ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে দেশে ১ হাজার ২৪৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২৯৪টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩০০টি, মার্চে ৩১৬টি এবং এপ্রিলে ৩৩৬টি। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯ হাজার ১০০টি এবং ডাকাতি ও দস্যুতার মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৩৯টি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা অবনতি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীগুলো এখনো পুরোপুরি আগের মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে পারছে না। তারা বলছেন, কোনো অপরাধের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তখন পুলিশ তা নিয়ে তৎপর হয়। এর বাইরে পুলিশ এখনো মাঠ পর্যায়ে সক্রিয়তার প্রমাণ দিতে পারেনি।

দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশা অনুযায়ী এখনো মনোবল ফেরেনি পুলিশের। তবে পুলিশ চেষ্টা করে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক পর্যায়ে রাখতে।’

এদিকে বাংলাদেশ জামায়াত, এনসিপি, বিএনপি ও বৈষম্যবিরোধীদের চাঁদাবাজি ও মবের ঘটনা  বাংলাদেশে মব বাহিনীর দলবদ্ধ সহিংসতা দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে এবং সেনাবাহিনীর নীরবতা জনমনে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। গত মাসেই গোপালগঞ্জে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমাবেশ ঘিরে সংঘর্ষ এবং উত্তেজনার মধ্যে সেনাবাহিনীর গুলিতে অন্তত সাতজন নিহত হয়। পুলিশ যেখানে ব্যর্থ সেখানে সেনাবাহিনীকে দিয়ে দেশ পাহারা দেওয়া হচ্ছে। যদিও এই বাহিনী এখন বিশেষ কয়েকটি দলের তাবেদারি করছে। আর তাদের ব্যর্থতাতেও দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি হয়েছে।  

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে সহিংসতা, আন্দোলন, পিটিয়ে (মব) হত্যা, সীমান্ত হত্যাকাণ্ড, নারী ও শিশু নির্যাতন, কারাগারে মৃত্যুসহ নানান ঘটনায় কমপক্ষে ৪৬৮ জন মানুষ নিহত হয়েছেন, যা মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতি নির্দেশ করে। গোপালগঞ্জে ১৬ জুলাই এনসিপির সমাবেশে হামলা ও মিটফোর্ডে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো জনমনে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।

এদিকে সরকার পরিবর্তনের পর সচিবালয় ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটি অংশ। প্রশাসনের ভেতরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা এবং বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে এদের বিরুদ্ধে।

সূত্র জানায়, একাধিক এনসিপি নেতা সচিবালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে নিয়মিত যাতায়াত করছেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। একইসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের কয়েকজন সদস্য বিভিন্ন নিয়োগ ও সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে তদবিরে জড়িত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এরইমধ্যে ওই দুটি সংগঠনের কিছু নেতা-কর্মী অভ্যন্তরীণ অনিয়ম, চাঁদাবাজি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগও করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন সংস্কার কমিশনেও ছাত্র প্রতিনিধিদেরকে বসানো হয়েছে। গত ডিসেম্বরে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের মতবিনিময়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে হট্টগোল হয় এক ছাত্র প্রতিনিধির। মতবিনিময়ের একপর্যায়ে ছাত্র প্রতিনিধি ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মেহেদী হাসানকে বক্তব্য দিতে বলেন কমিশনের প্রধান। এ সময়ে মেহেদী হাসান বলেন, আমি একটি বিষয়ে খুব আশাহত হয়েছি যে, আপনারা (সাংবাদিক) অনেক কষ্ট করেছেন, অনেক জায়গা থেকে কথা বলেছেন, অনেক ভালো কথা বলেছেন। আপনারা যখন কথা বলছেন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন তখন জনপ্রশাসন সম্পর্কে আপনাদের কিছু বিষয় একটু চিন্তা-ভাবনা করে পড়াশোনা করে আসার দরকার ছিল। সেই জায়গায় একটু ঘাটতি দেখা গেছে।

এ নিয়ে পরে প্রতিক্রিয়া দেখান সাংবাদিকেরা। একজন ব্যক্তি সচিব হতে বেশ কিছু সময় সরকারি চাকরিতে পার করার পর অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে তা হতে হয়। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে যে কাউকে এই সচিবদের সঙ্গে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে তাদের মনোবলও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। 

এছাড়া বিভিন্ন জেলায় সরকারি কর্মকর্তাদেরকেও এনসিপি ও বৈষম্যবিরোধীদের সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। নির্দেশ অমান্য বা সরকারের সমালোচনা করলে তাদেরকেও শাস্তি পেতে হচ্ছে। এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ফেসবুক পোস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সমালোচনা করায় লালমনিরহাটের সাবেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাপসী তাবাসসুম ঊর্মিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। 

এছাড়া এখন সচিবালয়েও হামলার ঘটনা সাধারণ একটি ঘটনা হয়ে গেছে। শিক্ষা উপদেষ্টার পদত্যাগসহ কয়েকটি দাবিতে সচিবালয়ে কিছু শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করে এবং পরে সেখানে ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে ১২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। মামলায় হত্যাচেষ্টা, সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করা এবং আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে গত বছরও চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা বাতিল এবং সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে এইচএসসি ফল প্রকাশের দাবিতে সচিবালয়ে ঢুকে পড়ে হাজারো শিক্ষার্থী।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রশাসনিক কাঠামোর এই বেহাল দশা এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা দেশকে বড় বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তারা বলছেন, রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ, দলীয় নিয়ন্ত্রণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ভয় দেখিয়ে ৫ আগস্ট ‘গণজোয়ার’ সৃষ্টির অপচেষ্টা

1

আয়নাঘরে গুম নয়, আট বছর আত্মগোপনে ছিলেন ব্যারিস্টার আরমান

2

শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েছে ড. ইউনুস

3

জাতি হারাল ভাষা, সাহিত্য ও রবীন্দ্রচর্চার এক অমর পথিক

4

বিএনপি সরকার গঠনের পর নির্বাচনী সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগ

5

খাটের ওপর পড়ে ছিল ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগের নেত্রীর মরদেহ

6

সংঘর্ষ-গুলি, গ্রেপ্তার ও মৃত্যু: গোপালগঞ্জ কি যুদ্ধ ক্ষেত্র

7

ইউনূস গংয়ের জঙ্গি কার্যক্রমের খেসারত দিচ্ছে প্রবাসীরা

8

সিলেটে প্রকাশ্যেই পাথর লুট করছে বিএনপি নেতারা, প্রশাসনের নীর

9

চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট আবার সাধারণ রোগীদেরও হবে কবে?

10

যে কারণে কালো আর্মব্যান্ড পরে খেলছে ভারত-ইংল্যান্ড

11

অনিশ্চয়তায় দুলছে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট, নির্বাচনের আগে রাজনীতিত

12

তিন বাহিনীকে নিয়ে জাতির সঙ্গে ইউনুসের প্রেস উইংয়ের মিথ্যাচ

13

বিপদে পড়লেই আওয়ামী লীগের কথা মনে পড়ে ইউনূসের

14

দামে ধস, সংকটে কক্সবাজারের লবণ চাষিরা

15

ধানমন্ডি ৩২-এ ৭ মার্চ ফুল দিতে গিয়ে আটক: ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার

16

প্যারিসে ফ্রান্স আওয়ামী লীগের আয়োজনে “মার্চ ফর বাংলাদেশ” কর্

17

রবিবার রেমিট্যান্স শাট ডাউন পালনের আহ্বান শেখ হাসিনা সংগ্রাম

18

ঢাবির নিয়ন্ত্রণে শিবির, সাধারণ শিক্ষার্থীদের বানাচ্ছে দাবার

19

চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধের হুমকি: নতুন ট্যারিফে ক্ষোভে ব্যবসায়ী

20