Insight Desk
প্রকাশ : Aug 20, 2025 ইং
অনলাইন সংস্করণ

দেশ ধ্বংস করতে জামায়াত-শিবিরের ছাত্র-জনতার ব্যানার

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করার অশুভ উদ্দেশ্যে জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি বাহিনী ছাত্র-জনতার ব্যানারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়েছে। ৫ আগস্টের পর থেকে দেশব্যাপী ঘটে চলা এই সহিংস ঘটনাগুলো জনমনে আতঙ্ক ও অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, যা দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে একটি মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

কোটাবিরোধী আন্দোলনের আড়ালে জঙ্গি ষড়যন্ত্র

২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন, যা প্রথমে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের ন্যায্য দাবি নিয়ে শুরু হয়েছিল, ক্রমশ একটি সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায়। তবে, এই আন্দোলনের ছাত্র-জনতার ব্যানারের আড়ালে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন শিবিরের জঙ্গি বাহিনী একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশে বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। ‌‍

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবির নেতা সাদিক কায়েম দাবি করেছেন, এই আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, হাসনাত আবদুল্লাহ এবং সারজিস আলম শিবিরের সঙ্গে আলোচনা করে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ হোসেনও একই কথা বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, আন্দোলনের জনপ্রিয় স্লোগান “তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার” ছিল শিবিরের কনসেপ্ট থেকে উদ্ভূত, যা সরকারের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। এই অভিযোগগুলো সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের উপর প্রশ্ন তোলে।

শেখ হাসিনার সংস্কার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে জামায়াত-শিবিরের ধ্বংসাত্মক ষড়যন্ত্র

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন বাংলাদেশের সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়েছিল, যা প্রাথমিকভাবে ছাত্রদের ন্যায্য দাবি হিসেবে বিবেচিত হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার এই দাবির প্রতি সংবেদনশীলতা দেখিয়ে ২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় ৯৫% মেধাভিত্তিক নিয়োগের সংস্কার বাস্তবায়ন করে। তবে, বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনকে কাজে লাগিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন শিবির দেশে অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা ছড়ানোর জন্য একটি ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, যা শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়নের ধারাকে ব্যাহত করে এবং ৫ আগস্ট তাকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করে।

২০২৪ সালের ২৫ জুলাই  বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন গণমাধ্যমকে বলেছিলে, “শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরুতে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সঠিক ছিল না। বিশেষ করে কোটা সংস্কার আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করাটা একদম সমীচীন হয়নি, যা তৃতীয় শক্তির হস্তক্ষেপের সুযোগ করে দিয়েছে। এ সুযোগটার অপেক্ষায় ছিল জামায়াত-শিবিরসহ অপশক্তি। তারা দুইদিন আগে থেকে সারাদেশ থেকে, বিশেষ করে সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম থেকে সশস্ত্র সন্ত্রাসী ও ক্যাডারবাহিনী এনে ঢাকায় জড় করে। এই সহিংসতার মাধ্যমে আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হয়েছে এবং দক্ষিণপন্থি শক্তির ছায়া এই আন্দোলনের ওপর পড়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “সরকার আগে থেকে আন্তরিক হলে মৃত্যু কমানো যেতো। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা যে দাবি করেছিল, সেটা তো শেষ পর্যন্ত মেনে নেওয়া হয়েছে। এটাই যদি শুরুতে উদ্যোগ নিয়ে করা হতো তাহলে তো এত প্রাণহানি হতো না। বরং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ছাত্রলীগকে উস্কানি দিয়ে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা না করালে হয়ত পরিস্থিতি এ দিকে যেতো না। তিনি সরকারের প্রাথমিক ভুল পদক্ষেপ এবং জামায়াত-শিবিরের সুযোগ গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়ির সাংবাদিক বলেন, “জামায়াতের মেইন উদ্দেশ্য অর্থাৎ দেশকে জঙ্গিস্থান বানানো, দেশে মৌলবাদ কায়েম, সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টি, আত্মঘাতী হামলা, মসজিদে বোমা মেরে মুসল্লি হত্যা, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মাদ্রাসা বানানো। হাসিনা এদের দমনে পরিপূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।” তিনি জামায়াত-শিবিরের ষড়যন্ত্রমূলক উদ্দেশ্য এবং আন্দোলনের সুযোগ গ্রহণের বিষয়টি তুলে ধরেন।

বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র ক্যাডাররা আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ রূপকে সহিংস করে তুলে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে। ১৫ জুলাই থেকে আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়, যার ফলে ৬৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়, এবং দেশের অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষতি হয়। সরকারের প্রাথমিক ভুল পদক্ষেপ, যেমন ছাত্রলীগের ব্যবহার এবং ইন্টারনেট শাটডাউন, জামায়াত-শিবিরকে সুযোগ করে দেয় আন্দোলনকে সরকারবিরোধী গণজাগরণে রূপান্তরিত করতে। ফলে, শেখ হাসিনার শিক্ষা, অর্থনীতি ও অবকাঠামোতে অভূতপূর্ব উন্নয়নের ধারা ব্যাহত হয়, এবং তিনি ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। এই ষড়যন্ত্র বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির পথে এক কালো অধ্যায় রচনা করে। বিশ্লেষকরা একমত যে, সরকারের প্রাথমিক সংলাপ ও সংযমী পদক্ষেপ এই সংকট প্রশমনে কার্যকর হতে পারতো, এবং জামায়াত-শিবিরের মতো অপশক্তির হস্তক্ষেপ রোধ করা সম্ভব হতো।

ছাত্র-জনতার ব্যানারে ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম

২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন, যা প্রাথমিকভাবে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত একটি সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এই আন্দোলনের মূল শক্তি হিসেবে পরিচিতি পায় ছাত্র-জনতা প্ল্যাটফর্ম। তবে, ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে যে এই প্ল্যাটফর্মের আড়ালে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের জঙ্গি বাহিনী দেশে অস্থিতিশীলতা ও ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করেছে।

৫ আগস্টের পর থেকে দেশব্যাপী বিভিন্ন সহিংস ঘটনা, যেমন থানা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, জামায়াত-শিবিরের পরিকল্পিত কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই প্রতিবেদনে ঘটনাপ্রবাহ এবং বিশ্লেষকদের মতামতের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হলো।

৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, বগুড়াসহ বিভিন্ন শহরে থানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার ধানমন্ডি, মতিঝিল, বংশাল, পল্টন, খিলগাঁও, আদাবর, মোহাম্মদপুর, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, চাঁনখারপুল ও সাভার থানায় হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অর্ধশত পুলিশ সদস্য নিহত হন। এছাড়া, গণভবন, সংসদ ভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যা বিশ্লেষকরা জামায়াত-শিবিরের সুপরিকল্পিত কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ব্যাপক হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু হল এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে হামলার অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের উপর হামলা এবং শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা লক্ষ্য করা গেছে। এক্স-এ প্রকাশিত একটি পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে, শাহরাস্তি নুনিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় শিবিরের একজন শিক্ষার্থী ক্লাসরুমে কনডম দেখিয়ে সহপাঠীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করে, যা শিবিরের আচরণের ধরন নির্দেশ করে।

গণমাধ্যমের অফিসগুলোও এই সহিংসতার শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এবং দৈনিক প্রথম আলোর অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সাংবাদিকদের উপর হামলার অভিযোগও উঠেছে। মানবকণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শাহবাগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫০টি গাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, যদিও হামলাকারীদের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

বিশ্লেষকরা এই সহিংসতাকে জামায়াত-শিবিরের পরিকল্পিত কার্যক্রম হিসেবে দেখছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এক্স-এ এক পোস্টে দাবি করেছেন, ছাত্র আন্দোলনকে জামায়াত-শিবির নিয়ন্ত্রণ করেছে। রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “জামায়াত-শিবির তাদের অতীতের সহিংসতা থেকে সরে আসেনি। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ঢুকে তারা গণভবনসহ স্বাধীনতার স্মৃতিগুলোকে টার্গেট করে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।” এছাড়া, albd.org-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামায়াত-শিবিরের ইতিহাসে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলা, অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুরের মতো সন্ত্রাসী কার্যক্রম তাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তা বলেন, “জামায়াত-শিবিরের এই কার্যক্রম শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে পরিচালিত। এরা ছাত্র-জনতার ব্যানার ব্যবহার করে তাদের জঙ্গি মতাদর্শ ছড়িয়ে দিচ্ছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই ধরনের হামলা ও অগ্নিসংযোগ দেশের অগ্রগতির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৪ সালের ১ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে, কারণ তাদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সাথে সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছিল। তবে, ২৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার এই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। এই সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, কারণ অনেকে মনে করেন, এটি জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রমকে আরও উৎসাহিত করতে পারে।

জামায়াত-শিবিরের গণপিটুনি ও সহিংসতার কালো অধ্যায়

২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলন, যা ছাত্র-জনতার প্ল্যাটফর্মকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল, পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন শিবিরের জঙ্গি বাহিনীর পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশব্যাপী ধ্বংসাত্মক সহিংসতায় রূপ নেয়। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএফএস) জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত গণপিটুনিতে ৭৮ জন নিহত হয়েছেন, এবং আগস্টের প্রথম ১০ দিনে আরও ৯ জনের মৃত্যুসহ মোট নিহতের সংখ্যা ৮৭-এ পৌঁছেছে। এই সময়ে ২৬৬ জন আহত হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত গণপিটুনি ও উচ্ছৃঙ্খল জনতার সন্ত্রাসে কমপক্ষে ১১১ জন নিহত হয়েছেন। এই সহিংসতাগুলোকে বিশ্লেষকরা জামায়াত-শিবিরের সুপরিকল্পিত কার্যক্রম হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যারা ছাত্র-জনতার ব্যানারে দেশের আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা ধ্বংসের লক্ষ্যে কাজ করছে।

সর্বশেষ ৯ আগস্ট রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় চোর সন্দেহে রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাস নামে জামাই-শ্বশুরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। রূপলালের মা লালিচা দাস প্রথম আলোকে বলেন, “মোর ছাওয়ার ঘরোক যায় মারছে, তাঁর বিচার চাও।” একই দিন মাদারীপুরে চোর সন্দেহে তিনজনকে গণপিটুনির শিকার করা হয়, যার মধ্যে একজনের চোখ তুলে ফেলার চেষ্টা হয়। এমএফএসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথম ১০ দিনে ১৩টি গণপিটুনির ঘটনার মধ্যে ৮টিই চোর সন্দেহে সংঘটিত হয়েছে, যা জামায়াত-শিবিরের উসকানির ফল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাজ্জাদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, “বিচারহীনতার সংস্কৃতি বৃদ্ধি পেলে মানুষ মানুষের প্রতি সহিংস হয়ে ওঠে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাৎক্ষণিক ও সংঘবদ্ধ মবের ঘটনা বেড়েছে, যার পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করছে।” তিনি জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি কার্যক্রমকে এই সহিংসতার মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন, “সরকারের দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাব এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দুর্বলতা গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনাকে বাড়িয়ে তুলছে। জামায়াত-শিবিরের মতো দলগুলো এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করছে।” তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এই মব সন্ত্রাসের পেছনে মূল ভূমিকা পালন করছে।”

ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) ‘পালস সার্ভে ৩’ জরিপে দেখা গেছে, ৮০% মানুষ মব সন্ত্রাস নিয়ে উদ্বিগ্ন। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল প্রথম আলোকে বলেন, “জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের নৈতিক অবস্থান দুর্বল ছিল, যার ফলে তারা মব সন্ত্রাস দমন করতে ব্যর্থ হয়েছে।”

সরকারের ব্যর্থতা ও জামায়াত-শিবিরের কৌশল

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশি কার্যক্রমের দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি বাহিনীকে গণপিটুনি ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ করে দিয়েছে। এই সংগঠনগুলো ছাত্র-জনতার প্ল্যাটফর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যমের উপর হামলা চালিয়ে দেশের উন্নয়ন ও শান্তি বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে। মানবাধিকারকর্মীরা সরকারের দৃশ্যমান ও কঠোর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে এই ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম বন্ধ করা যায় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।

জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি ষড়যন্ত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন শিবির দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সহিংসতা, অগ্নিসন্ত্রাস ও জঙ্গি কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিনষ্টের অভিযোগে অভিযুক্ত। ২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ব্যানারে তাদের সম্পৃক্ততা এই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি বাহিনী এই প্ল্যাটফর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে দেশব্যাপী ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, যার ফলে দেশ গভীর অস্থিতিশীলতার মুখোমুখি হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী এবং শিবিরের সহিংস কর্মকাণ্ডের ইতিহাস বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। নিম্নে তাদের কিছু উল্লেখযোগ্য জঙ্গি কার্যক্রম তুলে ধরা হলো:  ২০১৩ সালে জামায়াত-শিবির হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে মিলে ঢাকার শাপলা চত্বরে ব্যাপক সহিংসতা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটায়। এই ঘটনায় সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস, পুলিশের উপর হামলা এবং জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী (৬ মে ২০১৩), এই সহিংসতায় বেশ কয়েকজন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়। এটি জামায়াত-শিবিরের সুপরিকল্পিত জঙ্গি কৌশলের একটি স্পষ্ট প্রমাণ।

২০১৪ ও ২০১৫ সালে জামায়াত-শিবিরের নেতৃত্বে দেশব্যাপী পেট্রোল বোমা হামলা, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনায় শতাধিক নিরীহ মানুষ নিহত ও আহত হয়। দৈনিক সমকালের একটি প্রতিবেদন (২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫) উল্লেখ করে, এই সময়ে জামায়াত-শিবিরের সহিংস প্রতিবাদের ফলে দেশের পরিবহন ব্যবস্থা এবং জনজীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনাগুলো তাদের ধ্বংসাত্মক জঙ্গি মানসিকতার প্রকাশ।

২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনে জামায়াত-শিবির ছাত্র-জনতার প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএফএস) জানায়, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের প্রথম ১০ দিন পর্যন্ত গণপিটুনিতে ৮৭ জন নিহত এবং ২৬৬ জন আহত হয়েছেন। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, এই সময়ে ১১১ জন উচ্ছৃঙ্খল জনতার সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন। এই সহিংসতাগুলো জামায়াত-শিবিরের পরিকল্পিত কৌশলের অংশ বলে অভিযোগ উঠেছে।

জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি সম্পৃক্ততার প্রমাণ ও যুক্তি

২০২৪ সালে ঢাকার ধানমন্ডি থানায় অগ্নিসংযোগ, গণভবন ও সংসদ ভবনে লুটপাট, এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উপর হামলা জামায়াত-শিবিরের পূর্ববর্তী অগ্নিসন্ত্রাসের ধরনের সঙ্গে মিলে যায়। প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন (১১ আগস্ট ২০২৪) এই হামলাগুলোকে সংগঠিত ও পরিকল্পিত হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সাজ্জাদ সিদ্দিকী প্রথম আলোকে বলেন, “সংঘবদ্ধ মবের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে। জামায়াত-শিবিরের মতো সংগঠনগুলো ছাত্র-জনতার ব্যানারে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করছে।”

রংপুরের তারাগঞ্জে ৯ আগস্ট চোর সন্দেহে রূপলাল দাস ও প্রদীপ দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা এবং মাদারীপুরে একজনের চোখ তুলে ফেলার চেষ্টার ঘটনা জামায়াত-শিবিরের উসকানির ফল বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন। এমএফএসের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের প্রথম ১০ দিনে ১৩টি গণপিটুনির ঘটনার ৮টিই চোর সন্দেহে সংঘটিত হয়েছে। এ বিষয়ে গুম তদন্ত কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন প্রথম আলোকে বলেন, “জামায়াত-শিবিরের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো পুলিশের দুর্বলতা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির সুযোগ নিয়ে গণপিটুনি ও সহিংসতার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা ছড়াচ্ছে।”

জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি কার্যক্রমের পেছনে সেনাবাহিনীর মৌন সমর্থন?

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের জঙ্গি কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ, বিশেষ করে ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর সেনা সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এক বৈঠক, এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। এই বৈঠকে জামায়াত-শিবিরের নেতাদের উপস্থিতি এবং সেনা প্রধানের বক্তব্যে জামায়াতের আমিরের নাম প্রথমে উচ্চারণ করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই ঘটনাকে অনেকে জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রমাণ হিসেবে দেখছেন, যা দেশের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার জন্য উদ্বেগজনক।

২০২৪ সালের ১ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮(১) ধারায় জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞার কারণ হিসেবে সরকার জানিয়েছিল, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সহিংসতা, হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপে এই সংগঠনগুলোর সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে। তবে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সেনা সদর দপ্তরে বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের উপস্থিতি জনমনে বিস্ময় ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। একটি নিষিদ্ধ সংগঠন কীভাবে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক স্থাপনায় প্রবেশ করতে পারে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

বৈঠকের পর সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যে জামায়াতের আমিরের নাম প্রথমে উচ্চারণ করা এবং তার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া অনেকের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এই ঘটনাকে জামায়াত-শিবিরের প্রতি সেনাবাহিনীর মৌন সমর্থন বা পক্ষপাত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। জামায়াতের প্রচার সম্পাদক মতিউর রহমান আকন্দ দাবি করেছেন, সেনা প্রধানের এই বক্তব্য এবং বৈঠকে জামায়াতের আমন্ত্রণ প্রমাণ করে যে নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন এখন আর কার্যকর নেই। 

তিনি আরও বলেন, বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকেও জামায়াতের আমিরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক বৈধতার ইঙ্গিত দেয়। এই ধরনের ঘটনা সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।


সেনাবাহিনী নিয়ে জামায়াত-শিবির সমর্থিত এনসিপি ও এবি পার্টি থেকে বিভিন্ন বিতর্কিত এলেও তা আশ্চর্যভাবেই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি অফিসার্স অ্যাড্রেস অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান বলেন, এসব মন্তব্যে অখুশি হওয়ার কিছু নেই, যারা এসব বলছে তারা আমাদের সন্তানের বয়সী। বয়স বাড়লে বুঝতে পারবে, তখন লজ্জাই পাবে। প্রশ্ন উঠেছে, শিশু বলে আখ্যা দেওয়া সমন্বয়ক-নেতাদের জন্যই কি সেনারা মাঠে নেমে সাধারণ নাগরিকদের রক্ত ঝরাচ্ছে?  

জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে জঙ্গি কার্যক্রমের অভিযোগ নতুন নয়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করতে রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস গঠনে জামায়াতের ভূমিকা ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে এই সংগঠনকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী করা হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সহিংসতায় জড়িত থাকার অভিযোগে সরকার তাদের নিষিদ্ধ করে। নোয়াখালীর সুধারামে পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ এবং সাভারে বিস্ফোরক দ্রব্যসহ গোপন বৈঠকের অভিযোগে জামায়াত-শিবিরের ৬৬ জন নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলো তাদের জঙ্গি কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে।

সেনা সদরে জামায়াতের নেতাদের প্রবেশ এবং সেনা প্রধানের বক্তব্যে তাদের গুরুত্ব দেওয়া সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বলেন, “আগের সরকারের নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন বাতিল না করে জামায়াতের সঙ্গে বৈঠক করা আইনের শাসন নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।” সেনাবাহিনীর এই পদক্ষেপ কি জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি কার্যক্রমের প্রতি মৌন সমর্থন নির্দেশ করে? এই প্রশ্ন এখন জাতির সামনে।

ছাত্র-জনতার আড়ালে জামায়াত-শিবিরের বিষাক্ত প্রচারণা 

২০২৪ সালের কোটাবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্র-জনতার ব্যানারে জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের জঙ্গি নেতাকর্মীরা সামাজিক মাধ্যমে বিষাক্ত প্রচারণা চালিয়ে দেশে অরাজকতা ও অস্থিতিশীলতা ছড়িয়েছে। এই সংগঠনগুলোর সুপরিকল্পিত উসকানিমূলক পোস্ট, ভিডিও এবং প্রচারণা জনমনে বিভ্রান্তি ও ভয়ের সঞ্চার করেছে, যা দেশের আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক সম্প্রীতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্ম যেমন ফেসবুক, টুইটার (এক্স) এবং ইউটিউবে ছাত্র-জনতার নামে অসংখ্য পোস্ট ও ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে, যেখানে জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সুস্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, শিবিরের একজন কুখ্যাত নেতা মোহাম্মদ আলী নামে এক ব্যক্তির একটি ভিডিও গত জুলাই মাসে ভাইরাল হয়, যেখানে তিনি ছাত্র-জনতার ব্যানারে উসকানিমূলক বক্তৃতা দিচ্ছেন। এই ভিডিওতে তিনি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলার জন্য জনগণকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করেন। এই ভিডিওটি হাজার হাজার বার শেয়ার হয়েছে, যা জামায়াত-শিবিরের প্রচারণার বিস্তৃত প্রভাব প্রকাশ করে।

এছাড়া, ফেসবুকে ‘ছাত্র-জনতা মঞ্চ’ নামে একটি পেজ থেকে নিয়মিত পোস্ট করা হয়েছে, যেখানে থানায় হামলা, সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস এবং পুলিশের উপর আক্রমণের ছবি ও ভিডিও প্রচার করা হয়। এই পেজের অ্যাডমিনদের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের সদস্যদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এই ধরনের প্রচারণা জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ানোর পাশাপাশি তরুণদের সহিংসতায় উৎসাহিত করছে।

জামায়াত-শিবিরের ইতিহাস বিবেচনা করলে তাদের এই প্রচারণা কোনো নতুন কৌশল নয়। ২০১৩ সালে হেফাজতে ইসলামের সাথে যৌথভাবে সংঘটিত সহিংসতার সময়ও তারা সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে গুজব ও উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়িয়েছিল। সে সময় ফেসবুকে ভুয়া ছবি ও ভিডিও শেয়ার করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ব্যানারে তারা একই কৌশল অবলম্বন করেছে, যেখানে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংসতায় রূপান্তরিত করতে সামাজিক মাধ্যমকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনায়, টুইটারে (এক্স) ‘জনতার কণ্ঠ’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে গণভবনে লুটপাট ও ভাঙচুরের ছবি শেয়ার করা হয়, যেখানে জামায়াতের স্থানীয় নেতা মো. রফিকুল ইসলামকে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে দেখা যায়। এই পোস্টটি লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে এবং সহিংসতাকে উৎসাহিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরনের প্রচারণা জামায়াত-শিবিরের জঙ্গি মানসিকতার প্রকাশ এবং তাদের দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের একটি অংশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক অধ্যাপক নাম প্রকাশে না করা শর্তে বলেন, “জামায়াত-শিবির সামাজিক মাধ্যমে ছাত্র-জনতার নাম ব্যবহার করে তাদের জঙ্গি এজেন্ডা প্রচার করছে। এই প্রচারণা তরুণদের বিভ্রান্ত করছে এবং সমাজে বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে। এই ধরনের কার্যক্রম শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, দেশের সামাজিক সম্প্রীতিকেও ধ্বংস করছে।”

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন প্রথম আলোকে বলেন, “জামায়াত-শিবিরের সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা তাদের জঙ্গি কার্যক্রমের একটি নতুন মাত্রা। তারা ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব ও উসকানিমূলক কনটেন্ট ছড়িয়ে জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সরকারের উচিত এই ধরনের প্রচারণার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।”

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির উপর ভিত্তি করে শুরু হলেও, জামায়াত-শিবিরের সুপরিকল্পিত হস্তক্ষেপের ফলে এটি দেশে অস্থিতিশীলতা এবং সহিংসতার বৃহৎ স্রোতে রূপ নেয়। মূলত ছাত্র-জনতার ব্যানারকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তারা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার মঞ্চে পরিণত করেছে। এই ঘটনা শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের লক্ষ্য ব্যাহত করেনি, বরং দেশের উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিতর্কিত রাকসু নির্বাচন: মাসুদ হত্যা মামলার প্রধান আসামি সাল

1

জুলাই: বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের পুনরুত্থানের মাস

2

পুলিশ কন্ট্রোলরুমে বসে হত্যার নির্দেশ দিচ্ছিলেন আসিফ মাহমুদ

3

অক্টোবরে ২৩১ নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার: উদ্বেগজনক চিত্

4

উপদেষ্টা আসিফের মদদে কুমিল্লায় হিন্দু নারী গণধর্ষণের শিকার!

5

পরিবর্তন হলো মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের শপথ

6

⁨সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অভিযোগ: ইসকনের বিরুদ্ধে উগ্র হিন্দুত্ব

7

মব উস্কে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের চেষ্টায় ইউনূস গং

8

সহিংসতা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের জন্য ইউনূস সরকারকে দায়ী করলেন

9

ভাড়া করে লোক দিয়ে জুলাই উদযাপন করবে সরকার, উঠছে সমালোচনার ঝড়

10

এবার দুর্নীতি করে ধরা খেল জুলাই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড মাহফ

11

আমেরিকা থেকে যুদ্ধবিমান কেনাতেই কি এই বিমান বিধ্বস্তের পরিকল

12

অর্থনীতির স্থবিরতায় বেকারত্ব বেড়েছে: নতুন বিনিয়োগ ও দক্ষ মান

13

আওয়ামী লীগের ১১৫ এমপি-মন্ত্রীকে জেল হত্যার ভয়াবহ ষড়যন্ত্র!

14

দেশের সব বিমানবন্দরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি: নিরাপত্তাহীনতা ও

15

হারানো ভূখণ্ড ফেরানোর স্বপ্নে পাকিস্তান,বাংলাদেশ কি আবারও ষড়

16

বিবিসি বাংলার পক্ষপাতমূলক প্রচার: শেখ হাসিনার ভাবমূর্তি নষ্ট

17

জামায়াত-শিবিরের নতুন কৌশল, ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে পুলিশি হয়রানি

18

কারাগারে আরেক মৃত্যু: বিনা চিকিৎসায় আ.লীগ নেতার প্রাণহানি

19

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা: বিএনপি'কে টার্গেট

20