Insight Desk
প্রকাশ : Sep 11, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

২০০৯ থেকে ২০২৪: ১৫ বছরের উন্নয়নযাত্রায় যেভাবে বদলে গিয়েছিল বাংলাদেশ

২০০৯ সালের বাংলাদেশ আর ২০২৪ সালের বাংলাদেশকে পাশাপাশি রাখলে পরিবর্তনটি শুধু রাজধানীর আকাশরেখা, নতুন সেতু, উড়ালসড়ক কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যায় ধরা পড়ে না। পরিবর্তন দেখা যায় অর্থনীতির আকারে, মানুষের আয় ও জীবনযাত্রায়, বিদ্যুতের বিস্তারে, যোগাযোগব্যবস্থায়, নারীর অংশগ্রহণে, দারিদ্র্য হ্রাসে এবং রাষ্ট্রের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতায়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার টানা প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ২০২৪ সালে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। এই দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক মূল্যায়ন নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত রূপান্তর ছিল দৃশ্যমান। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যানও সেই পরিবর্তনের একটি বড় অংশকে স্বীকৃতি দেয়।

বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০১৯ সালের সময়টি বাংলাদেশের অর্থনীতির দ্রুত সম্প্রসারণের সময় হিসেবে উঠে এসেছে জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির মূল্যায়নে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, এই দশকে বাংলাদেশের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ ছিল এবং মাথাপিছু আয় ৭৫৪ ডলার থেকে বেড়ে ১,৯০৯ ডলারে পৌঁছায়। 

২০২৪ সালে বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের আকার দাঁড়ায় প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় ২,৫৯৩ ডলার। অর্থাৎ ২০০৯ সালের তুলনায় মাথাপিছু অর্থনৈতিক উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। 

এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে ওঠে দেশের অবকাঠামো।

পদ্মা সেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, কর্ণফুলী নদীর তলদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পায়রা বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, অসংখ্য মহাসড়ক, সেতু ও রেলপথের সম্প্রসারণ বাংলাদেশের উন্নয়ন আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

এর মধ্যে পদ্মা সেতু হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রতীকগুলোর একটি। বহুমুখী এই সেতুর পরিকল্পনা আগের সময় থেকে শুরু হলেও নির্মাণ ও বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি শেখ হাসিনা সরকারের সময়েই সম্পন্ন হয়। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিয়ে জটিলতার পর বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে মূল সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২২ সালে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সরাসরি সড়ক যোগাযোগের নতুন অধ্যায় তৈরি করে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের নথিতেও পদ্মা সেতুকে বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের প্রকল্পগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। 

এরপর আসে মেট্রোরেল। কয়েক দশক ধরে যানজটে বিপর্যস্ত ঢাকার মানুষ প্রথমবারের মতো আধুনিক নগর রেলব্যবস্থার যুগে প্রবেশ করে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মেট্রোরেলের প্রথম অংশ চালু হয়। পরবর্তী সময়ে এর পরিধি বাড়তে থাকে। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ মহানগরে এটি শুধু নতুন একটি যানবাহন ছিল না, বরং গণপরিবহন পরিকল্পনার ধারণাতেই বড় পরিবর্তনের সূচনা করে।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও ঢাকার মেট্রো প্রকল্পের উদ্দেশ্য হিসেবে গণপরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং রাজধানীর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করেছে। 

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল দক্ষিণ এশিয়ার যোগাযোগ অবকাঠামোর আলোচিত প্রকল্পগুলোর একটি হয়ে ওঠে। একই সময়ে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের একটি অংশ চালু হয়। দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক চার ও ছয় লেনে উন্নীত করা, নতুন সেতু ও রেলসংযোগ নির্মাণ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির উদ্যোগও এই সময়ের উন্নয়নচিত্রের অংশ।

কিন্তু বাংলাদেশের পরিবর্তন সম্ভবত সবচেয়ে গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে বিদ্যুৎ খাতে।

২০০৯ সালে বিদ্যুৎ সংকট ছিল দেশের দৈনন্দিন জীবনের পরিচিত বাস্তবতা। শহর থেকে গ্রাম, লোডশেডিং ছিল নিয়মিত। শিল্পকারখানার উৎপাদন থেকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা পর্যন্ত এর প্রভাব ছিল সর্বত্র।

বিশ্বব্যাংকের একটি জ্বালানি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের পরবর্তী দশকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীর হার প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৯০ শতাংশের বেশি হয়েছিল। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৪,৯০০ মেগাওয়াট থেকে প্রায় ২০ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছায়, যেখানে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎও অন্তর্ভুক্ত ছিল। 
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৯৯.৫ শতাংশ মানুষের বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ ছিল। 

অর্থাৎ বিদ্যুৎকে সীমিত নাগরিক সুবিধা থেকে প্রায় সর্বজনীন সেবায় পরিণত করার ক্ষেত্রে এই সময়টি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে ব্যয়, আমদানিনির্ভর জ্বালানি, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং আর্থিক চাপ নিয়েও সমালোচনা তৈরি হয়। ফলে বিদ্যুৎ খাতের মূল্যায়নে একদিকে প্রায় সর্বজনীন সংযোগের অর্জন, অন্যদিকে ব্যয় ও আর্থিক টেকসইতার প্রশ্ন, দুটিই বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

এই সময়েই বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়। পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, রূপপুরের প্রথম ইউনিটের মূল নির্মাণকাজ ২০১৭ এবং দ্বিতীয়টির ২০১৮ সালে শুরু হয়। দুটি ইউনিটই ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। 

অর্থনীতির আরেকটি বড় স্তম্ভ ছিল তৈরি পোশাকশিল্প।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে তৈরি পোশাকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এই শিল্পকে কেন্দ্র করে, যার একটি বড় অংশ নারী। পোশাকশিল্প শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেনি, বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে নারীর অর্থনৈতিক ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটিয়েছে।

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার হিসাবে ২০১০ সালে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৯.২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪ সালে তা প্রায় ৪৭.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে সেবা রপ্তানিও ২০১০ সালের প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালে প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। 

তবে অর্থনীতির এই সাফল্যের সঙ্গে একটি দুর্বলতাও তৈরি হয়। বাংলাদেশের রপ্তানি দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি পোশাক খাতের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল থাকে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে পোশাক খাত একসময় দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮২ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছিল। ফলে রপ্তানি বহুমুখীকরণ একটি অসমাপ্ত চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থেকে যায়। 
দারিদ্র্য হ্রাস ছিল এই সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের বিস্তারিত দারিদ্র্য মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এই সময়ে বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন ও শিক্ষায় প্রবেশাধিকার বাড়ার ফলে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। তবে ২০১৬ সালের পর দারিদ্র্য হ্রাসের গতি কমে আসে এবং জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি আবার দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে ছিল। 

আরেক হিসাবে বিশ্বব্যাংক জানিয়েছিল, আন্তর্জাতিক চরম দারিদ্র্যসীমা অনুসারে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৯ শতাংশ। ২০২২ সালে সেটি ৫ শতাংশে নেমে আসে। একই সঙ্গে শিশুমৃত্যু, খর্বাকৃতি, বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন এবং শিক্ষায়ও উন্নতি হয়েছিল। 

এই পরিবর্তনের অর্থ ছিল গ্রামবাংলার জীবনেও বড় রূপান্তর।

একসময় যে গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না, সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। কাঁচা সড়কের জায়গায় পাকা সড়ক হয়েছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তার হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল সেবা পৌঁছেছে। মোবাইল আর্থিক সেবা গ্রামের মানুষের হাতে ব্যাংকিংয়ের বিকল্প পথ তৈরি করেছে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ, প্রবাসী আয় গ্রহণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং দৈনন্দিন লেনদেনেও প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে।

“ডিজিটাল বাংলাদেশ” ছিল শেখ হাসিনা সরকারের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত রাজনৈতিক ও উন্নয়নমূলক স্লোগানগুলোর একটি। সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সরকারি সেবা ডিজিটাল করা, অনলাইন নিবন্ধন, মোবাইল আর্থিক সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং তরুণদের প্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এই সময়ের পরিবর্তন অস্বীকার করা কঠিন।

স্বাস্থ্য ও সামাজিক সূচকেও বাংলাদেশ এগিয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি সূচকে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর মৃত্যুহার হ্রাস, টিকাদানের বিস্তার এবং দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতিতে সন্তান প্রসবের হার বৃদ্ধির মতো অগ্রগতি দেখা যায়। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের গড় আয়ু প্রায় ৭২ বছর এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেয়েদের অংশ ৫৬.৩ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। 

নারী শিক্ষার বিস্তার বাংলাদেশের সামাজিক পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে ওঠে। বিদ্যালয়ে মেয়েদের উপস্থিতি, উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ, সরকারি চাকরি, চিকিৎসা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রমে নারীর দৃশ্যমানতা বাড়ে। পোশাকশিল্পের লাখ লাখ নারী কর্মী এই অর্থনৈতিক পরিবর্তনের একটি বিশাল সামাজিক ভিত্তি তৈরি করেন।

শিক্ষা খাতেও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে প্রবেশাধিকার বাড়ে। তবে সংখ্যাগত সাফল্যের বিপরীতে শিক্ষার মান, ঝরে পড়া, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান এবং দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। উন্নয়নের পরবর্তী পর্যায়ে এগুলোই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে আসে।

আর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের পরিবর্তনটি সম্ভবত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাংলাদেশ মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ এবং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি, এই তিনটি মানদণ্ডেই পরপর একাধিক ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনায় উত্তরণের প্রয়োজনীয় সীমা অতিক্রম করেছে। ২০২৪ সালের মূল্যায়নেও বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় মানদণ্ডের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধান নিয়ে যোগ্যতা ধরে রাখে। দেশটির স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে আনুষ্ঠানিক উত্তরণ ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত হয়। 

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে দারিদ্র্য, দুর্যোগ ও বৈদেশিক সহায়তানির্ভরতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হতো। সেই দেশই কয়েক দশকের ধারাবাহিক অগ্রগতির পর স্বল্পোন্নত দেশের শ্রেণি ছাড়ার যোগ্যতা অর্জন করে। এই অর্জন কোনো একটি সরকার বা একটি সময়ের একক সৃষ্টি নয়। বাংলাদেশের কৃষক, শ্রমিক, পোশাককর্মী, প্রবাসী, উদ্যোক্তা, নারী, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং ধারাবাহিক বিভিন্ন সরকারের নীতি ও বিনিয়োগ এর ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই এই উত্তরণের শেষ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়।

এই ১৫ বছরের উন্নয়নকে শুধু সাফল্যের গল্প হিসেবে দেখলেও অবশ্য পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না।

দ্রুত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণ, আর্থিক খাতের সুশাসন, দুর্নীতির অভিযোগ, আয় ও সম্পদের বৈষম্য, যুব কর্মসংস্থান, প্রকল্প ব্যয়, মূল্যস্ফীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ ক্রমে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হয়ে ওঠে। বিশ্বব্যাংক ২০২৩ সালেই সতর্ক করেছিল যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মহামারি-পরবর্তী পুনরুদ্ধারকে বাধাগ্রস্ত করছে। 

বিশ্বব্যাংকের পরবর্তী মূল্যায়ন আরও দেখিয়েছে, দারিদ্র্য কমলেও ২০১৬ সালের পর এর গতি ধীর হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ অর্থনৈতিক ধাক্কায় আবার দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়ে গেছে। 

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও এই সময়ের মূল্যায়ন অত্যন্ত বিতর্কিত। আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কাছে শেখ হাসিনার শাসনামল বড় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ, ডিজিটালাইজেশন এবং সামাজিক উন্নয়নের যুগ। অন্যদিকে সমালোচকেরা নির্বাচনব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকার, রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে শেখ হাসিনার পুরো শাসনামলের ইতিহাস লিখতে গেলে উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, দুটি অধ্যায়কেই আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
তবুও ২০০৯ এবং ২০২৪ সালের বাংলাদেশের ভৌত ও অর্থনৈতিক চেহারার মধ্যে ব্যবধান বিশাল।

২০০৯ সালের বিদ্যুৎ সংকটে থাকা বাংলাদেশ ২০২৪ সালে প্রায় সর্বজনীন বিদ্যুৎ সংযোগের দেশে পরিণত হয়েছিল। 

রাজধানীতে মেট্রোরেল চলেছে। পদ্মার দুই পাড় সড়ক ও রেলে যুক্ত হয়েছে। কর্ণফুলীর নিচ দিয়ে যানবাহন চলেছে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের পণ্য রপ্তানি ২০১০ সালের প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৪ সালে ৪৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে।  মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন ২০২৪ সালে প্রায় ২,৫৯৩ ডলারে পৌঁছেছে।  কোটি কোটি মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে।  আর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের পরিচয় পেছনে ফেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। 

এসব অর্জনের কোনটির পেছনে সরকারের নীতি কতটা ভূমিকা রেখেছে, কোনটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতার ফল, কোথায় সাফল্যের পাশাপাশি অতিরিক্ত ব্যয় বা দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে গবেষণা ও রাজনৈতিক বিতর্ক চলতেই পারে।

কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের বাংলাদেশ স্থির ছিল না।
এই ১৫ বছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে, মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে, গ্রাম ও শহরের যোগাযোগ বদলেছে, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আরও গভীরে পৌঁছেছে এবং রাষ্ট্র এমন কিছু বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ করেছে, যেগুলো একসময় বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী বলে মনে করা হতো।
তাই শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে যত বিতর্কই থাকুক, বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাস লিখতে গেলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সময়কালকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে ছুটে চলা গাড়ি, ঢাকার আকাশে মেট্রোরেলের পথ, কর্ণফুলীর তলদেশের টানেল, প্রায় প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যাওয়া বিদ্যুৎ এবং স্বল্পোন্নত দেশের পরিচয় ছাড়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো বাংলাদেশ, সব মিলিয়ে এই সময়ের একটি দৃশ্যমান উত্তরাধিকার রেখে গেছে।

প্রশ্ন তাই শুধু ১৫ বছরে কতগুলো প্রকল্প নির্মিত হয়েছিল, সেটি নয়। বড় প্রশ্ন হলো, ২০০৯ সালে যে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করেছিল, ২০২৪ সালে ফিরে তাকালে সেই দেশটি কতটা বদলে গিয়েছিল?

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ইউনুস সরকারের ব্যর্থতায় ব্যবসা-বাণিজ্যে নেমেছে অনিশ্চয়তার ঘন

1

অষ্টম শ্রেণির ছাত্রকে ‘ছাত্রলীগ নেতা’ বানিয়ে গ্রেপ্তার

2

প্রতি মিনিটে ১২ ভোট? ইসির পরিসংখ্যান ঘিরে প্রশ্ন

3

জাতীয় নাগরিক পার্টির শাপলা প্রতীক নিয়ে ইসি-কে সরোয়ার তুষা

4

ভেনিসে সজীব ওয়াজেদ জয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি নিয়ে তুমুল

5

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিস্তার হলে প্রভাব পড়বে ভারতেও: শেখ হাস

6

একের পর এক শিশু হত্যা-ধর্ষণ, এবার মুখ খুললেন প্রগতিশীল শিক্ষ

7

৬০০ কোটি টাকার হাসপাতাল এখন জুলাই আহতদের ‘আবাসিক হোটেল’

8

খাটের ওপর পড়ে ছিল ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগের নেত্রীর মরদেহ

9

ধানমন্ডিতে মহিলা আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল, আটক ৮

10

নড়াইলে ছয় শিশুছাত্রকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসাশিক্ষক গ্রেপ্ত

11

জামায়াতকে জাতীয় নির্বাচনে জয়ের গ্রিন সিগনাল দিয়ে দিলেন ইউনূস

12

সাজানো–গোছানো কক্ষ, চিকিৎসা সরঞ্জাম নেই, মাঝপথে সমাপ্ত স্বাস

13

ভোটে পুনর্গণনার দাবি এনসিপির

14

কোটা নয়, প্রতারণা! অযোগ্য এনসিপি নেতার লাখ টাকার চাকরি

15

শেখ হাসিনার ‘চক্ষু রাঙানি উপেক্ষা’ বনাম বর্তমান সরকারের ‘অনু

16

দ্যা রিটার্নস অব খাম্বা ক্রনিকলস !

17

চাঁদাবাজ রিয়াদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ছাত্র প্রতিনিধি

18

মার্কিন চুক্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক: এলপিজি আমদানিতে বছরে ১৮ হাজ

19

ভোটার ছিল না ভোটকেন্দ্রে ভোট ছিল গণনার টেবিলে: শেখ হাসিনা

20