নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালের করিডর। সাদা টাইলসের ঠান্ডা মেঝেতে বিছানো পাতলা তোশক। আড়ালে-বাহিরে টহলরত পুলিশ সদস্য। আর তার মাঝখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন এক যুবরাজনীতিক। তার নাম মাকসুদুল আলম মাসুম, ঢাকা মহানগর যুবলীগ উত্তরের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতি। বাম হাতে হাতকড়া, দুই পায়ে ভারী ডান্ডাবেড়ি। দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। যেন কোনো পলাতক যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গে আচরণ করা হচ্ছে। অথচ এই ব্যক্তি আজ হাসপাতালে শুয়ে অচেতন, হার্টে ৬০ শতাংশ ব্লক নিয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
গত ১৫ মাসে তার বিরুদ্ধে ৯টি মামলা হয়েছে। আদালতে সাতটি মামলায় জামিন পেলেও তিনি কারাগারের দরজা পর্যন্তও যেতে পারেননি। প্রতিবারই শ্যোন অ্যারেস্ট করা হয় নতুন একটি অজ্ঞাত মামলা দেখিয়ে, যা পরিবার ও আইনজীবীদের ভাষায় এক ধরনের বৈধতা-লুণ্ঠনকারী কৌশল। তারা বলছেন, এটি শাস্তি নয়, বিচার প্রক্রিয়াকে শাস্তি হিসেবে ব্যবহার করা। আইনগতভাবে মুক্তি পাওয়ার পরও কারাগার থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না।
চিকিৎসকদের বক্তব্য আরও উদ্বেগজনক। হৃদরোগীকে ডান্ডাবেড়ি ও হাতকড়ায় বেঁধে রাখা তার জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। জরুরি অবস্থায় দ্রুত নড়াচড়া করতে না পারলে তার হৃদস্পন্দন থেমে যেতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী, হাসপাতালের চিকিৎসাধীন বন্দিদের ক্ষেত্রে এমন আচরণ মারাত্মক অমানবিক। কিন্তু মাসুমকে বেড পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। তাকে মেঝেতে রাখা হয়েছে, যেন তিনি একজন রোগী নন, বরং রাষ্ট্রের চরম বিপজ্জনক শত্রু।
মাসুমের পরিবারের এক সদস্য বলেন, তিনি বহুদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। একজন অসুস্থ মানুষকে এভাবে বারবার নতুন মামলায় জড়িয়ে আটকে রাখা অন্যায় এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ মানসিকতার পরিচয়। তাদের কণ্ঠে ছিল ভয়, স্থব্ধতা এবং অনিশ্চয়তা। পরিবার আশঙ্কা করছে, দ্রুত চিকিৎসা না পেলে বড় বিপদ ঘটতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, এটি শুধু একটি ব্যক্তিকে আটকে রাখার ঘটনা নয়। এটি একটি ভয়ংকর দৃষ্টান্ত, যেখানে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে ইচ্ছাকৃতভাবে একজন রাজনৈতিক কর্মীকে মানবেতর অবস্থায় রাখা হচ্ছে। বাস্তবে রাষ্ট্রের করিডরে যে মানবাধিকার পরিস্থিতির কথা বলা হচ্ছে, তার সঙ্গে এই আচরণের কোনো মিল নেই।
এই সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক মঞ্চে মানবাধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অথচ রাজধানীর একটি হাসপাতালে একজন গুরুতর হৃদরোগীকে হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়িতে বেঁধে মেঝেতে ফেলে রাখার দৃশ্য সেই বক্তব্যের সঙ্গে গভীর বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছে।
মাসুমের পরিবার, আইনজীবী এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো জরুরি ভিত্তিতে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং গায়েবী মামলার অপব্যবহার বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে। তারা বলছে, একজন মানুষের জীবন নিয়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক খেলা চলতে পারে না। জামিন পাওয়া মামলাগুলোর ভিত্তিতে তার মুক্তি নিশ্চিত করা উচিত। জীবন-মৃত্যুর সীমানায় দাঁড়ানো একজন রোগীর প্রতি অমানবিক আচরণ বন্ধ করা এখন রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
মন্তব্য করুন