নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে অ্যান্টি–টেররিজম অধ্যাদেশ ও আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞা: সংসদের সামনে ৩০ দিনের সাংবিধানিক পরীক্ষা,
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অ্যান্টি–টেররিজম অধ্যাদেশ এখন নতুন সংসদের সামনে একটি বড় সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধন এনে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং সেই ক্ষমতার ভিত্তিতেই একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগকে “সত্তা” হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিলের পদক্ষেপও এই আইনি কাঠামোর ওপর নির্ভর করে নেওয়া হয়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো অধ্যাদেশ জারি হলে নতুন সংসদের প্রথম বৈঠকে সেটি উপস্থাপন করতে হয়। সংসদে উপস্থাপনের পর ৩০ দিনের মধ্যে সেটি আইন হিসেবে অনুমোদিত না হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকারিতা হারায়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার একটি স্পষ্ট সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মুখে পড়েছে। তারা চাইলে অধ্যাদেশটিকে আইন হিসেবে পাস করে স্থায়ী করতে পারে, আবার চাইলে সেটিকে মেয়াদ শেষ হতে দিতে পারে।
এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর। যদি সংসদ অধ্যাদেশটি অনুমোদন করে, তাহলে সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার একটি নজির স্থায়ী আইনি রূপ পাবে। এতে নির্বাহী ক্ষমতার পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। একই সঙ্গে এই ধরনের আইন মৌলিক অধিকার, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না—সেই প্রশ্নও আদালতে উঠতে পারে। কারণ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সহিংস সংগঠন মোকাবিলা করা, রাজনৈতিক দল নিয়ন্ত্রণ করা নয়—এমন যুক্তি আইনি মহলে ইতিমধ্যে আলোচিত।
অন্যদিকে, যদি সরকার অধ্যাদেশটি অনুমোদন না করে এবং এটি মেয়াদ শেষে বাতিল হয়ে যায়, তাহলে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। এতে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোর বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে এবং বিষয়টি বিচারিক পর্যালোচনার দিকে যেতে পারে। সেই ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনার আওতায় আসতে পারে।
এই পুরো প্রক্রিয়া শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎ নয়, বরং বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে কতটা সীমিত ও অধিকার–সঙ্গতভাবে প্রয়োগ করা হবে, নির্বাহী ক্ষমতার সীমা কোথায় টানা হবে, এবং রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র কতটা উন্মুক্ত রাখা হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে দুটি ভিন্ন পথ রয়েছে। একটি পথ হলো অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি অব্যাহত রেখে নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী আইনি রূপ দেওয়া, যা বিরোধী রাজনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে সীমিত করতে পারে। অন্য পথ হলো অধ্যাদেশটিকে অনুমোদন না করে একটি সংকীর্ণ ও অধিকার–সম্মত সন্ত্রাসবিরোধী আইনি কাঠামোয় ফিরে যাওয়া, যেখানে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত ও বিচারিক তত্ত্বাবধানে থাকবে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া নয়, বরং আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি এবং সাংবিধানিক ভারসাম্যের প্রশ্নে একটি নির্ধারক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগামী ৩০ দিনের মধ্যে নেওয়া সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে দেশটি রাজনৈতিক বহুত্ববাদকে পুনরুদ্ধারের পথে এগোবে নাকি কঠোর নিষেধাজ্ঞামূলক কাঠামোকে স্থায়ী করবে।