জুলাই সনদের খসড়ায় রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভিশংসন প্রক্রিয়ার নতুন প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে বিদেশে বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক মিশন, দূতাবাস, হাইকমিশন, কনস্যুলেট, কূটনীতিকদের অফিস ও বাসভবন থেকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ছবি সরানোর নির্দেশনাও এসেছে। রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক মহলে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, ছবি সরানোর নির্দেশ এবং জুলাই সনদে অভিশংসন প্রক্রিয়ার প্রস্তাব একই সঙ্গে এসেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে। এটি কেবল প্রটোকল পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রপতির অপসারণের জন্য জনমত তৈরির কৌশল হতে পারে।
জুলাই সনদে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রদ্রোহ, গুরুতর অসদাচরণ বা সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যাবে। এ জন্য নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে অভিশংসন প্রস্তাব পাস করতে হবে, যা পরে উচ্চকক্ষে শুনানির মাধ্যমে দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থনে চূড়ান্ত হবে। এই প্রস্তাবে ২৮টি দল ও জোট একমত হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অভিশংসন প্রক্রিয়া কঠোর হলেও বাস্তবায়ন কঠিন। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন হওয়ায় এটি রাষ্ট্রপতির অপসারণকে প্রায় অসম্ভব করে তুলতে পারে, যা তাকে ক্ষমতার অপব্যবহারে আরও সুরক্ষিত করতে পারে।
বিদেশে রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর নির্দেশ
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন, কনস্যুলেট, কূটনীতিকদের কার্যালয় ও বাসভবন থেকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ছবি সরানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, এই নির্দেশনা আনুষ্ঠানিক চিঠি বা ই-মেইলের মাধ্যমে দেওয়া হয়নি; বরং টেলিফোনে অঞ্চলভিত্তিক রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের মাধ্যমে জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়া, এশিয়া প্যাসিফিক, আফ্রিকা ও ইউরোপের কয়েকটি মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, অনেকে এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাননি। তবে অন্তত দুটি মিশনের প্রধান নিশ্চিত করেছেন, তারা সরকারের কাছ থেকে সরাসরি এই বার্তা পেয়েছেন এবং অন্য মিশনগুলোকে অবহিত করার পাশাপাশি ছবি সরানোর বিষয়টি তদারকি করবেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, “ঢাকা থেকে ফোনে আমাদের জানানো হয়েছে রাষ্ট্রপতির ছবি সরাতে হবে। এটি লিখিতভাবে আসেনি, তবে আমাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অন্য মিশনগুলোতে এটি জানানোর।” এই পদক্ষেপের ফলে বিদেশে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোতে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানের কোনো ছবি থাকছে না।
এই নির্দেশনার কারণ সম্পর্কে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সাধারণত রাষ্ট্রপতির ছবি সরকারি কার্যালয়ে সম্মান ও প্রটোকলের অংশ হিসেবে প্রদর্শিত হয়। ফলে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত অস্বাভাবিক মনে করা হচ্ছে। কূটনৈতিক মহলে এটি সরকারের অভ্যন্তরীণ প্রটোকল পরিবর্তন বা রাষ্ট্রপতির অপসারণের কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইনজীবী ও সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ একজন ব্যারিস্টার বলেন, “জুলাই সনদে অভিশংসন প্রক্রিয়া কঠিন করা হয়েছে, যা রাষ্ট্রপতির পদকে আরও সুরক্ষিত করতে পারে। তবে ছবি সরানোর এই নির্দেশ রাষ্ট্রপতির প্রতীকী সম্মান ক্ষুণ্ন করার লক্ষ্যে নেওয়া হতে পারে, যা জনমনে তার গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেবে। এটি অভিশংসন প্রক্রিয়ার আগে একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।”
একজন সিনিয়র সাংবাদিক মন্তব্য করেন, “ছবি সরানোর নির্দেশ এবং জুলাই সনদে অভিশংসন প্রক্রিয়ার প্রস্তাব একই সঙ্গে এসেছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে। এটি কেবল প্রটোকল পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রপতির অপসারণের জন্য জনমত তৈরির কৌশল হতে পারে।”
কূটনৈতিক মহলে ছবি সরানোর নির্দেশ নিয়ে বিভিন্ন জল্পনা চলছে। কেউ কেউ এটিকে প্রথাগত প্রটোকল পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ এর মধ্যে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক তাৎপর্য খুঁজছেন। লিখিত নির্দেশনার অভাব এবং সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি না আসায় বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
একজন কূটনীতিক বলেন, “এমন বার্তা এখনো আমি পাইনি, তবে আমাদের হাইকমিশনার পেয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত নই।” এই ধরনের অস্পষ্টতা এবং মৌখিক নির্দেশনা কূটনৈতিক মহলে বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের পদক্ষেপ
জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকের মাধ্যমে জুলাই সনদের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। খসড়ার বিষয়ে মতামত জানাতে আগামী ২০ আগস্ট বিকেল ৪টার মধ্যে কমিশনের কার্যালয়ে জমা দেওয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে খসড়ার কপি পাঠানো হয়েছে।
জুলাই সনদের প্রস্তাবনা এবং রাষ্ট্রপতির ছবি সরানোর নির্দেশনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্রপতির অপসারণের কৌশলগত প্রস্তুতি হতে পারে, যা বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামো এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
জাতীয় দৈনিক মানবজমিনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি মহলে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে দৌড়ঝাঁপ চলছে। ৫ আগস্টের কুশীলবরা বরাবরই প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের পক্ষে মত দিয়ে আসছেন।
এমনকি দু-একবার তারা বঙ্গভবন ঘেরাওয়েরও কর্মসূচি দেন। নানাভাবে চাপও সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনঢ় অবস্থানের কারণে তাদের সে প্রচেষ্টা সফল হয়নি। নির্বাচন সামনে রেখে এ ধরনের পরিস্থিতি রাজনীতিকে জটিল করে তুলবে। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টাও প্রবল সদরে-অন্দরে। অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনাও ঘটে যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতেও নিশ্চুপ সেনাবাহিনী
৫ আগস্টের পর সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। স্বাধীনতার পক্ষের বহু মানুষের প্রত্যাশা ছিল— শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হলেও তিনি দেশকে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাতে ছেড়ে দেবেন না। কিন্তু সেনাপ্রধানের সিদ্ধান্তহীনতার কারণে দেশ আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত।
জনগণ এবং বিশ্লেষকদের মতে, তার নেতৃত্বে সেনাবাহিনী আজ কার্যত একটি আনসার বাহিনীর মতো পরিণত হয়েছে। সেনা সদস্যরা ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে গলিতে পাহারা দিচ্ছে—যা বাহিনীর মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
তারা বলছেন, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এমন এক সময় সেনাপ্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন, যখন দেশ রাজনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিকভাবে গভীর সংকটে। এই সময়ে সেনাবাহিনীর ভূমিকা হওয়া উচিত ছিল নিরপেক্ষ, পেশাদার এবং সংবিধানসম্মত। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি— সেনাবাহিনী কখনো চুপচাপ, আবার কখনো পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে, যা গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। বিশেষ করে গোপালগঞ্জের মতো ঘটনায় সেনাবাহিনীর গুলিচালনা জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস মারাত্মকভাবে নষ্ট করেছে। জেনারেল ওয়াকারের সিদ্ধান্তহীনতা এখন শুধু সেনাবাহিনী নয়, গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রের ভারসাম্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
মন্তব্য করুন